বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় © সংগৃহীত
শিক্ষক সংকট ও শিক্ষকদের পদোন্নতির দাবিতে কম্পিলিট একাডেমিক শাটডাউনের ঘোষণা দিয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের। সোমবার (২০ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০২ জন শিক্ষক স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে,শিক্ষক সংকট নিরসন ও শিক্ষকদের পদোন্নতির সংকটসমূহ নিরসন না হওয়া পর্যন্ত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ সকল একাডেমিক কার্যক্রম থেকে আজ (মঙ্গলবার) থেকে কর্মবিরতি পালন করবেন এবং কোনো সুরাহা না হলে তার আগামীকাল (বুধবার) থেকে পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক শাটডাউনসহ প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকগণের সকল প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখবেন।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সমসাময়িককালে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান চর্চার ধারায় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েও স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রমে ভর্তি সংক্রান্ত বিধিবিধান ও পরীক্ষা সংক্রান্ত বিধিবিধান: স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি নির্ধারণ বিষয়ক বিধিবিধান: ডিগ্রি ও সার্টিফিকেট পাওয়ার যোগ্যতার শর্তাবলি: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদোন্নতি ও পর্যায়োন্নয়ন বিষয়ক বিধিবিধান বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) ও সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার ভিত্তিতে কার্যকর করা হয়ে থাকে।
উক্তরূপে সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত বিধিবিধানের ভিত্তিতেই আমাদের সকল একাডেমিক ও পদোন্নতি বিষয়ক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। আমাদের জানামতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক কালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই এই সকল বিধিবিধান এভাবে সিন্ডিকেটের অনুমোদনের ভিত্তিতেই কার্যকর রয়েছে। সমসাময়িক কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই এইসকল বিধিবিধানের অনুকূলে আইনের নির্দেশনা অনুযায়ী চ্যান্সেলরের অনুমোদন নেয়া হয়নি এবং সিন্ডিকেটের অনুমোদনের ভিত্তিতেই বিধিবিধানগুলোকে প্রয়োগপূর্বক শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচি নির্ধারিত হচ্ছে, পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে, ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে এবং শিক্ষক কর্মকর্তার পদোন্নতি ও পর্যায়োন্নয়ন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কিন্তু এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় হঠাৎ একটি বড় প্রশ্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে ইউজিসি কর্তৃক জারিকৃত স্মারক নম্বর ৩৭.০১.০০০০.০০০.১৫১.৩২.০০১৩.২১.২ এর মাধ্যমে প্রদত্ত একটি নির্দেশনা। পত্রে লিখিত হয়েছে 'বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী চাকুরি, পেনশন, পদোন্নতি, পর্যায়োন্নয়নসহ সংশ্লিষ্ট সংবিধি, বিধি, প্রবিধি ইত্যাদি সংশোধন ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রণয়ন করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। পরবর্তীতে কেবল অনুমোদিত সংবিধি অনুসারে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যায়োন্নয়ন দেয়া যাবে'। এই নির্দেশনা প্রাপ্তির মাধ্যমে আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করছি যে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম বিশাল সংকটে নিপতিত।
স্বাভাবিকভাবে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ৩৫ ও ৩৭ ধারায় উল্লিখিত কোনো সংবিধি ও বিধিই এই নির্দেশনায় উল্লিখিত 'সংশ্লিষ্ট সংবিধি, বিধি' কথাটির বাইরে নয়। নির্দেশনায় বলা হয়েছে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অর্থাৎ চ্যান্সেলরের অনুমোদিত সংবিধি ছাড়া কোনো পদোন্নতি ও পর্যায়োন্নয়ন দেয়া যাবে না, অর্থাৎ দিলে অবৈধ হবে।
যেহেতু চ্যান্সেলরের অনুমোদিত সংবিধি ছাড়া কোনো পদোন্নতি ও পর্যায়োন্নয়ন দেয়া যাবে না অর্থাৎ সংবিধি ছাড়া পদোন্নতি ও পর্যায়োন্নয়ন বৈধ না, সেহেতু এ বাক্যের নির্দেশনা নিশ্চিত করে যে, আইনের ৩৫ ও ৩৭ ধারায় যেসকল কর্মকাণ্ডের জন্য সংবিধি ও বিধি প্রণয়নের নির্দেশনা রয়েছে তার কোনো কাজই চ্যান্সেলরের অনুমোদিত সংবিধি ও বিধি ছাড়া বৈধ হতে পারে না।
উল্লেখ্য, আইনের ৩৫ (ঝ) ধারায় উল্লেখ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি নির্ধারণের জন্য সংবিধি থাকতে হবে, আইনের ৩৫ (চ) ধারায় উল্লেখ রয়েছে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ ও পদোন্নতির নিয়মকানুন বিষয়ে সংবিধি থাকতে হবে, ৩৫ (ফ) ধারায় উল্লেখ রয়েছে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও অন্যান্য পাঠক্রমে ভর্তি ও পরীক্ষার জন্য সংবিধি থাকতে হবে, ৩৭ (গ) ধারায় উল্লেখ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রভর্তি ও তাদের তালিকাভুক্তির জন্য বিধি থাকতে হবে, ৩৭ (৩) ধারায় উল্লেখ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, সার্টিফিকেট ও ডিপ্লোমা পাওয়ার শর্তাবলি নির্ধারণের জন্য বিধি থাকতে হবে। আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, এই সকল সংবিধি ও বিধি চ্যান্সেলর কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো এই যে, ৩৫ (ঝ), ৩৫ (ঢ), ৩৫ (ফ), ৩৭ (গ) ও ৩৭ (৩) ধারায় উল্লিখিত চ্যান্সেলর কর্তৃক অনুমোদিত কোনো সংবিধি ও বিধি আমাদের নেই। ইউজিসির উক্ত পত্রানুযায়ী চ্যান্সেলরের অনুমোদিত সংবিধি ছাড়া পরবর্তীতে শিক্ষক কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পর্যায়োন্নয়ন বৈধ না হলে, এই সকল সংবিধি ও বিধি ছাড়া আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য উক্ত পত্রের পর থেকে প্রদত্ত শিক্ষাক্রম, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা কার্যক্রম ও সবশেষে তাদেরকে প্রদত্ত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সব আইনগতভাবে অবৈধ হতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এই সমস্যার নিরসন না ঘটানো পর্যন্ত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ বিধি-সংবিধিহীন অবৈধ শিক্ষা ও পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে কঠিনতর আইনি সংকটে না ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
বিজ্ঞপ্তি বলা হয়েছে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫টি বিভাগের একটি ব্যতীত প্রত্যেকটিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির অন্তত ৫টি ব্যাচের পাঠদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অথচ এমন অনেক বিভাগ রয়েছে যেখানে মাত্র তিন-চারজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। ৫টি ব্যাচের পাঠদান কার্যক্রম তিনজন শিক্ষকের মাধ্যমে চালিয়ে যাওয়া কতটা দুরূহ তা সহজেই অনুমেয়। অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকের অন্যূন ৫১টি ছাড়কৃত শূন্যপদ রয়েছে যেগুলো গত দুইবছর ধরে নিয়োগবিহীন অবস্থায় পড়ে আছে। আরো উল্লেখ্য যে, অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫টি বিভাগে ৪০১টি শিক্ষকের পদ প্রাপ্য হলেও ছাড়কৃত হয়েছে মাত্র ২৬৬টি। এ অবস্থায় অনেক বিভাগই কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে খণ্ডকালীন শিক্ষকের মাধ্যমে কোর্স সম্পাদন করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় গত প্রায় দেড় বছর ধরে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের ভাতা ও সম্মানি প্রদানও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে বারবার আলোচনা করেও কোনো সমাধান আসেনি। এ অবস্থায় ইউজিসির লোড ক্যালকুলেশন নীতিমালা অনুযায়ী একজন শিক্ষকের সর্বোচ্চ যে ক্লাস গ্রহণের সিদ্ধান্ত রয়েছে তার চেয়ে বেশি কোনো কোর্স ও ক্লাস না গ্রহণের পক্ষে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
বিজ্ঞাপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ইউজিসি কর্তৃক জারিকৃত স্মারক নম্বর ৩৭.০১.০০০০,০০০.১৫১,৩২,০০১৩.২১.২ তারিখ ১/১/২০২৬ পত্রের অন্তত দুইমাস পূর্বে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান নীতিমালায় ২৪জন অধ্যাপকের পদোন্নতির জন্য সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বোর্ডসমূহের বৈঠক ও সুপারিশ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু সেই সুপারিশ এখনো বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং এই মুহূর্তে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী অনেকের পদোন্নতির শর্ত পূরণ হওয়া সত্ত্বেও নিয়োগবোর্ডের সভা আয়োজনের কোনো উদ্যোগ কর্তৃপক্ষ গ্রহণ না করায় এই সংকট সমাধানের দাবিতে মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের একজন শিক্ষক আমরণ অনশনে বসতে বাধ্য হয়েছেন। ন্যায্য পাওনা প্রাপ্তির জন্য একজন সহকর্মী শিক্ষককে এমন আমরণ অনশনে রেখে কোনো শিক্ষক সুস্থ মস্তিষ্কে তার নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে না।
উপরিউক্ত বিষয়গুলো উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০২ শিক্ষক আগামীকাল কর্মবিরতি পালন করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এবং দাবি আদায় না হলে আগামী পরশু থেকে কম্পিলিট অ্যাকাডেমিক শাটডাউন পালন করবেন।