কোলাজ ছবি © টিডিসি সম্পাদিত
নতুন সূর্যের লাল আভায় উদ্ভাসিত হয়েছে বঙ্গাব্দের নতুন বছর ১৪৩৩। বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণের মাঝে পহেলা বৈশাখ কেবল একটি দিন নয়, বরং এটি আমাদের আত্মপরিচয় ও সম্প্রীতির অবিনাশী এক মেলবন্ধন। জরাজীর্ণ অতীতকে ধুয়ে-মুছে নতুন স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার নবীন আশ্বাস নিয়ে প্রতিবারই আসে বৈশাখ। উৎসবের এই চিরায়ত আবহে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে বইছে আনন্দের হিল্লোল।প্রাণের এই উৎসবকে ঘিরে তাঁদের নিজস্ব ভাবনা, স্মৃতি আর আগামীর প্রত্যাশা নিয়ে এই আয়োজন।
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী হালিমা খাতুন কেয়া বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিমূর্তি। এই দিনে পুরনো সব দুঃখ- কষ্ট ভুলে নতুনত্বের বীজ বপন হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক স্মৃতি অঙ্কিত চিত্র। পরিবার, বন্ধুদের সাথে কাটানো এই মুহূর্ত যেন শিকড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। পহেলা বৈশাখ সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমার কাছে পহেলা বৈশাখ মানে আনন্দ, উল্লাস, ঐক্যের মেল বন্ধন।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিন আব্দুল্লাহ বলেন, ‘নববর্ষ শুধু উৎসব নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কৃষিজীবনের প্রতিচ্ছবি। নববর্ষ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক, যা প্রতি বছর নানা উৎসাহ-উদ্দীপনায় পালিত হয়। তবে এটি উদযাপনের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে কিছু মতভিন্নতা রয়েছে—ঐতিহ্যগতভাবে সূর্যোদয় থেকে দিন গণনা শুরু হলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে রাত ১২টা থেকে উদযাপন করা হয়। নববর্ষ মূলত ফসলি সনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে কৃষকের জীবনযাত্রার প্রতিফলন দেখা যায়। ঐতিহাসিকভাবে মোগল সম্রাট আকবর রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ১৫৫৬ সালে ফসলি সাল চালু হয়ে পরে আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। তাই নববর্ষ শুধু উৎসব নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কৃষিজীবনের প্রতিচ্ছবি।’
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী গালিব বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ আমাদের জীবনে আনন্দ ও প্রেরণার উৎস। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উৎসব। এটা আমাদের শেকড়।প্রতিটি শিক্ষার্থীদের কাছে এই দিনটি আনন্দ, উৎসব ও নতুন আশার প্রতীক। এ দিনে আমরা নতুন পোশাক পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি, ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পান্তা-ইলিশ, মেলা ও মঙ্গল শোভাযাত্রা এ দিনের বিশেষ আকর্ষণ। এই উৎসব আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সকল শিক্ষার্থী নতুন বছরে নতুন উদ্যমে পড়াশোনা করার অনুপ্রেরণা পায়। তাই পহেলা বৈশাখ আমাদের জীবনে আনন্দ ও প্রেরণার উৎস।’
সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাত জাহান বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ আমাদের জীবনে নতুন আলো ও আনন্দের বার্তা নিয়ে। এটি আমার কাছে শুধু একটি দিন নয়, এটি একটি অনুভূতি, একটি নতুন শুরুর প্রতীক।বাংলা নতুন বছরের প্রথম সকাল যেন নতুন আশা আর স্বপ্ন নিয়ে আসে।এই দিনে শহর থেকে গ্রাম—সবখানে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।’
‘সকালের প্রথম আলোয় চারদিকে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। লাল-সাদা শাড়িতে সেজে ওঠে নারীরা, যা বৈশাখের সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। পুরুষদের পাঞ্জাবি আর মুখভরা হাসি—সব মিলিয়ে এক বর্ণিল পরিবেশ তৈরি হয়। পহেলা বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের জাতিসত্তার প্রতিচ্ছবি। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নতুনভাবে শুরু করার সাহসই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। এইভাবেই প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ আসে, আমাদের জীবনে নতুন আলো ও আনন্দের বার্তা নিয়ে।’
ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী শেখর জয়ধর বলেন, ‘আমার কাছে পহেলা বৈশাখ মানে নতুন একটা দিনের শুরু। নতুন একটা মাসের শুরু। নতুন একটা বছরের শুরু। সাথে সাথেই নতুন করে স্বপ্ন দেখার শুরু। পহেলা বৈশাখের কথা মনে আসলে, মাথায় আসে সেই অমঙ্গল, অশুভশক্তির পরাজয় ঘটিয়ে মঙ্গল শোভা যাত্রার কথা। পহেলা বৈশাখ মানে বাঙালির ইলিশ ভাজার সাথে পান্তাভাতের কথা। যদিও এখন ইলিশ পান্তা আমাদের মতো ছাত্র-ছাত্রীদের নাগালের বাইরে। কারণ আমাদের এখন আর চাইলেই বাড়িতে যাওয়া হয়ে ওঠে না।’
‘তবুও, পহেলা বৈশাখ মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার প্রেরণা দেয়। আজকের এই পহেলা বৈশাখে সকলের একটা প্রতিজ্ঞা করা উচিত বলে আমি মনে করি - সবাই মিলেমিশে দেশ গড়ার কাজ করবো, নিজের মধ্যে মানবতা জাগ্রত করে সবার মঙ্গলের জন্য কাজ করবো। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার বড় পরিচয়, আমরা সবাই মানুষ, আমরা সবাই বাঙালি, আমরা সবাই বাংলাদেশী।’