গাজীপুরের শ্রীপুর থানা ও ইনসাইটে জামায়াতের লোগো © টিডিসি সম্পাদিত
গাজীপুরের শ্রীপুরে সেই মাদরাসাছাত্রীকে উদ্ধারের খবর আসার পরপরই ওই তরুণীর উদ্ধার ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আজ ১৮ এপ্রিল (শনিবার) দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানান। তার আগে দুপুর ১টায় ওই তরুণীকে উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করে পুলিশ।
জামায়াতের বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় গত বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকেলে মসজিদের ইমাম বাবার গলায় পিস্তল ঠেকিয়ে সন্ত্রাসীরা ১৫ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রীকে অপহরণ করেছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও পুলিশ প্রশাসন অপহৃত মেয়েটিকে উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় আনতে না পারার ঘটনার আমি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
জামায়াত সেক্রেটারি আরও উল্লেখ করেন, এই অপহরণের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির বহিঃপ্রকাশ। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার দেশের মা-বোনদের ইজ্জতের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিতার কারণে দিনে দুপুরে সন্ত্রাসীরা বাবার কাছ থেকে মেয়েকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটাতে সাহস পেয়েছে। আমি দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপহৃত মেয়েটিকে উদ্ধার করে তার বাবা-মায়ের কাছে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা এবং জড়িত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের জোর দাবি জানাচ্ছি।’
এর আগে, দুপুর ১টার দিকে ওই মাদ্রাসা ছাত্রীকে (১৫) উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছে পুলিশ। শ্রীপুর থানা এস আই সঞ্জয় সাহা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আমরা ওই তরুণী এবং তরুণকে আটক করে থানায় নিয়ে এসেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আদালতে প্রেরণ করা হবে।
আরও পড়ুন: গাজীপুরের ইমামের সেই মেয়ে উদ্ধার
তারও আগে, বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকেলে গাজীপুরের শ্রীপুরে বাবার গলায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ওই মাদ্রাসা ছাত্রীকে (১৫) অপহরণের অভিযোগ করেছে ওই মেয়ের বাবা। যদিও পুলিশ বলছে প্রেমের পর বিয়ে করে পালিয়েছে ওই তরুণী। পরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে শ্রীপুর থানার পুলিশ।
জানা গেছে, ওই কিশোরী শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পশ্চিমখণ্ড গ্রামের প্রশিখা মোড় এলাকার বাসিন্দা হাদিউল ইসলামের মেয়ে। তিনি মাওনা বাজারের পাশে বায়তুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম খতিব।
বাবা হাদিউল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, বুধবার বিকেল ৩টায় স্থানীয় বখাটে আবিদ, তার সহযোগী সুমিত, তার বাবা, তার জেঠা বাচ্চু এবং ফুফা খলিল, সাইফুল, তার বাসার ভাড়াটিয়া উজ্জ্বলসহ আরও অনেকে এসে আমার মেয়েকে জোর করে নিয়ে যেতে চায়। তারা আমার বারান্দার গেটের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। আমার স্ত্রী এবং আমার শ্বশুড় আমাকে ঘরের ভেতর নিয়ে যায়। তারা ৪৫ মিনিটের চেষ্টায় তালা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে। এ সময়ে আমি প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ফোন দেই।
অপহরণকারীরা তালা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করার পর আবিদ আমার মেয়ে এবং সুমিত আমার গলায় পিস্তল ঠেকায়। তারা জোর করে আমার মেয়েকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। মেয়ের আত্মচিৎকারের পরও আমি মেয়েকে রক্ষা করতে পারিনি।
তবে এই অভিযোগ সত্য নয় বলে জানিয়েছেন শ্রীপুর থানার ওসি নাছির আহমেদ। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সেইগুলো স্থানীয়ভাবে কোন সত্যতা পাইনি। আমরা প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যে জেনেছি এটি প্রেমের বিয়ে ছিল। যদিও মেয়েটির বয়স কম বলেছেন ওই মেয়ের বাবা। তিনি বলেন, ‘তার মেয়ের বয়স প্রায় ১৬-১৭ বছর এবং ছেলের বয়স ২০-২১ বছর।’ কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো জন্মনিবন্ধন বা প্রমাণপত্র দেখায়নি।
ওসি বলেন, ঘটনার আগের দিন ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গে চলে যায়। পরবর্তীতে দুই পরিবার স্থানীয়ভাবে আলোচনা করে তাদের ফিরিয়ে আনে, তবে বিষয়টি প্রথমদিকে পুলিশকে জানানো হয়নি। এরপর সারাদিন বৈঠক চলে। এক পর্যায়ে মেয়েটির বাবা, ওই মেয়েটিকে জোরপূর্বক ঘরের ভেতরে নিয়ে তালাবদ্ধ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে মেয়ের কাছ থেকে জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয় যে তাকে অপহরণ করা হয়েছে।
ওসি বলেন, স্থানীয়ভাবে আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে পরিস্থিতি বেশি জটিল হয়ে ওঠে। ছেলের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ছেলে ও মেয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে, তাই মেয়েকে ঘরে আটকে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে তালা ভেঙে মেয়েটিকে নিয়ে যায় ছেলের পক্ষের লোকজন। এই ঘটনায় ছেলের মা, চাচা, ফুপা ও কাজিনসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই তাদের আটক করা হয়।
আরও পড়ুন: গলায় পিস্তল ঠেকিয়ে আবিদ-সুমিতের হুঙ্কার, ‘চুপ থাক, নইলে গুলি করে দেব’
স্থানীয় বৈঠকের সালিশদার ও শ্রীপুর পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শাহজাহান সজল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ঘটনার দিনের আগে ছেলেটি এবং মেয়েটি পালিয়ে যায়। পরে বিষয়টি নিয়ে এলাকার আলেম ও মুরব্বিদের উদ্যোগে সামাজিকভাবে বসে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। মূলত দুই পক্ষের মধ্যে মিল-মীমাংসার জন্যই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
শাহজাহান সজল বলেন, বৈঠকে ছেলের পক্ষ থেকে বিয়ের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। এ কারণে তাদের কিছু সময় দেওয়া হয়েছিল বিষয়টি যাচাই করার জন্য। কিন্তু পরে ছেলের বাবা ও তার সঙ্গে থাকা আরেকজন হঠাৎ করে এসে মেয়েটিকে নিয়ে যান বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ছেলে ও মেয়ের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন—যেহেতু তারা আগে একবার পালিয়ে গেছে নিশ্চয়ই কোন না কোন সম্পর্ক তো ছিল। তবে মেয়েটির বাবার কাছ থেকে শুনেছি কোন সম্পর্ক ছিল না।
তিনি আরও বলেন, সালিশি বৈঠকের দিন ছেলের পরিবার মেয়ের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। তবে অস্ত্র ঠেকিয়ে মেয়েকে নিয়েছে কি না সেই বিষয়েও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না।