ঢাবিতে সেমিনারে বক্তারা
সেমিনারে বক্তারা © সংগৃহীত
শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ব্যক্তি হত্যার ঘটনা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ফ্যাসিবাদী ও আধিপত্যবাদী কাঠামোর বহিঃপ্রকাশ। ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত না হলে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি গভীর ক্ষত হয়ে থাকবে। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) বিকাল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার অডিটোরিয়ামে এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
‘শহীদ ওসমান হাদি হত্যা: ন্যায়বিচার, রাষ্ট্রীয় সংকট ও আধিপত্যবাদী কাঠামো’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে সিটিজেন ইনিশিয়েটিভ ও সেন্টার ফর গভর্নেন্স অ্যান্ড সিভিলাইজেশন স্টাডিজ (সিজিসিএস)।
সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শহীদ হাদির শিক্ষিকা ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, হাদি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একজন মানুষ, যিনি অস্বাভাবিকভাবে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে পেরেছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমরা এখনো পরিবর্তন গ্রহণে অভ্যস্ত হতে পারিনি, এক চোখা জাতি হিসেবে হাদিকে পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারিনি। প্রশাসনের কাছে হাদিকে ছোট করে দেখা হত, অথচ তারা ভয় পেত, হাদী সব সত্য প্রকাশ করে দেবে। আর এখনো হত্যার বিচার না হওয়ায় প্রশাসনিক ব্যর্থতা স্পষ্ট। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সকলকে সচেতনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেন আর কখনো ফ্যাসিস্টরা ক্ষমতায় ফিরতে না পারে।
সেমিনারে শহীদ ওসমান হাদির বড় ভাই ওমর হাদি আবেগঘন বক্তব্যে ব্যক্তিগত স্মৃতি, সংগ্রাম ও দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জুলাই পরবর্তী সময়ে ইনকিলাব মঞ্চ কিংবা হাদীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে আয়োজিত প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠান ও সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রত্যক্ষভাবে আয়োজনের একজন হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তিনি দেশজুড়ে ওসমান হাদির প্রতি যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে, তার জন্য সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাও জানান। একইসাথে স্পষ্ট করে বলেন, অনেকেই তাদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহযোগিতা করতে চাইলেও ওসমান হাদির পরিবার, তার স্ত্রী কিংবা সন্তান, কারো জন্য কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা তারা গ্রহণ করেননি এবং ভবিষ্যতেও করবেন না। এ ছাড়া যদি কখনো মনে হয় যে তিনি হাদির আন্দোলন থেকে সরে গেছেন, তাহলে তাকে ছাড়াই হাদির আন্দোলনকে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিপ্লবকে বোকা বানানোর একটি প্রক্রিয়া চলছে উল্লেখ করে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, হাদির উত্থান জুলাই অভ্যুত্থানের ঔরসে জন্ম নেওয়া একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। হাদি জুলাইকে পূর্ণভাবে ধারণ করেছিলেন। তার জানাযার মধ্য দিয়ে জুলাই যেন নতুন করে পুনর্জন্ম লাভ করেছে। এই প্রজন্মের অসংখ্য তরুণ-তরুণী তার জানাযায় এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।
ইতিহাসের উদাহরণ টেনে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, রোমান সাম্রাজ্য যিশুকে হত্যা করেছিল, কিন্তু তার বিচার হয়নি। তবুও যিশু ইতিহাসে মুছে যাননি। আজ হাদিকে নিয়েও নেটিজেনদের মাঝে এক ধরনের রুহানি ও রাজনৈতিক চর্চা গড়ে উঠেছে, যা আপ থেকে ডাউন সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে।
লেখক ও সম্পাদক রেজাউল করিম রনি বলেন, হাদিকে কেন্দ্র করে কিংবা ‘চব্বিশ’কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে, নইলে তা ব্যাকফায়ার করবে। হাদির কর্ম ও চেতনাকে ইনস্টিটিউশনালাইজ করতে হবে। নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রশ্নে হাদি রাজনৈতিকভাবে সঠিক অবস্থানে ছিলেন। আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে হাদি একজন গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার ছিলেন এবং থাকবেন। হাদি অতীত নয়, হাদিই বর্তমান। তাকে ধারণ করেই নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে, নইলে জাতি নতুন করে আবার অভ্যুত্থানের পথে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম বলেন, ওসমান হাদি ছিলেন আমাদের সময়ের একজন মহামানব যারা কখনো কিছু নেন না, শুধুই দিয়ে যান। তিনি বলেন, কবি নজরুল ইসলামের কবরের পাশে হাদীর চিরশায়িত হওয়া যেন বিদ্রোহী কবিতারই পাশে আরেক বিদ্রোহীর শুয়ে পড়া। মহামানবদের বড় বড় পত্রিকা বা বই নাও থাকতে পারে, কিন্তু তাদের জীবনই হয়ে ওঠে পাঠ্য। তিনি হাদিকে নিয়ে উচ্চতর গবেষণা এবং পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
আপ বাংলাদেশের আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ বলেন, শহীদ ওসমান হাদির কোনো বিষয়েই তার মধ্যে হীনমন্যতা কাজ করেনি। তার মতে, হাদীর হত্যার পেছনে কেবল মাঠপর্যায়ের খুনিরা নয়, বরং আরও বড় শক্তি জড়িত রয়েছে, যার সন্ধান দিতে রাষ্ট্র এখনো ব্যর্থ। আলী আহসান জুনায়েদ আরও বলেন, হাদীর শাহাদাত বাংলাদেশের মানুষের মনে গভীর পরিবর্তন এনেছে। অনেক মানুষ শপথ নিয়েছে হাদির লড়াই নিজ নিজ জায়গা থেকে জারি রাখবে, এমনকি নিজেদের সন্তানদের ‘হাদি’ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার শাইখ মাহদী বলেন, হাদি নিজেই বলে গিয়েছিলেন ‘আমার মৃত্যুর বিচারটা কইরেন।’ এই কথাই প্রমাণ করে, সে সময় রাষ্ট্রব্যবস্থা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল। হাদির ক্ষেত্রে আমরা জনতুষ্টিমূলক বা তড়িঘড়ি বিচার চাই না; আমরা ন্যায্য বিচার চাই। হাদি নিজেই বলেছিলেন, শত্রুর সাথেও ইনসাফ করতে হবে। তাই কাউকে হুট করে শাস্তি দিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। হত্যার পেছনে যদি কোনো বড় শক্তি থেকে থাকে, তাকেও সামনে এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার দীর্ঘ ও বিরক্তিকর প্রক্রিয়া হতে পারে, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল শহীদ হাদির চিন্তা ও লড়াইকে মাঠে ও সমাজে কীভাবে জারি রাখা যায়।
লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট মুহাম্মদ সজল বলেন, হাদি চেয়েছিলেন সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণভিত্তিক একটি জাতীয়তাবাদ। তিনি স্পষ্ট করে বলতেন, আমরা ভারতের কোনো ছিটমহল হিসেবে থাকতে চাই না। এই আন্দোলনই হাদি লালন করেছিলেন। তিনি বলেন, হাদির যাত্রা জারি রাখতে হলে আমাদের বুঝতে হবে তিনি কী চাইতেন, বাংলাদেশের পরিচয়কে কীভাবে দেখতেন এবং রাজনীতিকে কীভাবে বিশ্লেষণ করতেন। তিনি হাদির অস্বাভাবিক কর্মশক্তি, সাহসিকতা ও মাঠে উপস্থিত থেকে কাজ করার মানসিকতার কথা তুলে ধরে বলেন, রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, এ ব্যর্থতা স্বীকার করে রাষ্ট্রকেই এর কাফফারা আদায় করতে হবে।
সেমিনারে প্রবন্ধ পাঠ করেনসিজিসিএসের একাডেমিক ডিরেক্টর ড. খালেদ হোসেন। সঞ্চালনায় ছিলেন সিটিজেন ইনিশিয়েটিভের কো-ফাউন্ডার মোহাম্মাদ তালহা।