মায়ের ডাক অনুষ্ঠানে বাবার ফিরে আসার আকুতি জানিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে হৃদি ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তারেক রহমান © টিডিসি সম্পাদিত
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম-খুন-নির্যাতনের শিকার পরিবারের সদস্যদের কান্না, আর্তনাদ ও আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও।
আজ শনিবার (১৭ জানুয়ারি) মায়ের ডাক ও আমরা বিএনপি পরিবার আয়োজিত মতবিনিময়ে শোকাবহ ও আর্তনাদের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
জানা গেছে, গেল ২৫ ডিসেম্বর বিদেশে নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার পর বিগত ফ্যাসীবাদী আওয়ামী সরকারের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারদলীয় লোকজনের হাতে গুম-খুনের শিকার হতভাগ্যদের পরিবার-স্বজনদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সরাসরি মতবিনিময় করলেন তারেক রহমান। মতবিনিময়ের সময় স্বজনদের কান্নায় সংক্রমিত হয়ে বারবার চোখ মুছেন তিনি। মঞ্চেই বসে কাঁদতে দেখা যায় তাকে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এই সভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে একে একে নিজেদের না বলা গল্প, অপূর্ণতা আর বাবাহীন জীবনের বেদনা তুলে ধরেন গুমের শিকারদের সন্তান ও স্বজনরা।
আরও পড়ুন : খালেদা জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চাকারী রাষ্ট্রনায়ক: মঈন খান
২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর রাজধানীর শাহবাগে ফুল কিনতে এসে গুমের শিকার হন ছাত্রদল নেতা পারভেজ। পারভেজের কন্যা ঋদি। বাবার অপেক্ষা থাকা এ কন্যা বলেন, এ বছর যায়, নতুন বছর আসে কিন্তু আমাদের বাবা আর আসে না। ৫ আগস্টের পর একটা বছরের বেশি পার হয়ে গেল কিন্তু আমরা কাউকে ফিরে পেলাম না।
কান্না ভেজা কণ্ঠে নিজের দীর্ঘদিনের চাপা কষ্ট তুলে ধরতে গিয়ে আবেগ সামলাতে পারেনি সে। কাঁদতে কাঁদতে ঋদি বলে, আমার বয়স যখন আড়াই বছর তখন থেকে আম্মুর কোলে চড়ে এখানে আসি। ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন বাবার সঙ্গে স্কুলে যাবো কিন্তু এখন পর্যন্ত আমার স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না।
বাবার ফিরে আসার আকুতি জানিয়ে হৃদি প্রশ্ন রাখে, আমার এ স্বপ্নটা কি আদৌ পূরণ হবে? আমার ভাই কি বাবার মুখটা দেখতে পারবে? এ স্বাধীন দেশে কি বিচার হবে না? আমাদের বাবারা কোথায়... আমাদের বাবাদের কেন গুম করা হয়েছিল?
গুম কমিশনের উদ্দেশে হৃদি বলে, গুম কমিশন আমাদের বলে, ধরে নিন ওরা গুম... ওরা মৃত। কেন এটা কি হাতের অঙ্ক যে আমরা ধরে নেব আমাদের বাবারা আর নেই? একটা দল করা কোনো অপরাধ না। দল সবাই করে। এর জন্য এটা কেমন বিচার এ বাংলাদেশে?
আরও পড়ুন : কৌশলের নামে গুপ্ত বা সুপ্ত রূপ ধারণ করেননি বিএনপির নেতাকর্মীরা: তারেক রহমান
বক্তব্যের একপর্যায়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে বাবাকে খুঁজে দেয়ার আকুতি জানায় হৃদি। সে বলে, বছর যায়, নতুন বছর আসে কিন্তু আমাদের বাবারা আসে না। আমরা এ একটা বছরের বেশি হয়ে গেল ৫ই আগস্টের পর, কিন্তু আমরা একজনকেও ফেরত পেলাম না।
সে আরও বলে, আমি তারেক রহমান চাচ্চুর কাছে আশা করি যে আমাদের বাবাদের খুঁজে দেবেন। এ বাংলাদেশের মাটিতে এ গুমের বিচার করবেন। সমবয়সীদের যখন হাঁটা শেখায় বাবারা, তখন নিজের বাবাকে খুঁজে বেড়ায় ৩ বছর বয়সে বাবাকে হারানো মিম।
২০১৩ সালে ২ ডিসেম্বর গুম হওয়া সোহেল হোসেনের মেয়ে শাফা হোসেন বলেন, ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর শাহবাগ থেকে আমার বাবাকে গুম করা হয়। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। এখন আমার বয়স ১৩ বছর। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাবার অপেক্ষায় আছি, কিন্তু আজও বাবার মুখটা দেখতে পারিনি। বাবার কোনো স্মৃতি নেই আমার। বাবার ছবিটা হাতে নিয়ে কত জায়গায় গেছি কিন্তু বাবার কোনো খোঁজ পাইনি। বাবাকে ছাড়া জীবনটা অসম্পূর্ণ মনে হয়। আমরা আমাদের বাবাকে ফেরত চাই।
একই বছরের ৪ ডিসেম্বর গুম হওয়া কায়সার হোসেনের কন্যা লামিয়া আক্তার মিম বলেন, ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর বাসা থেকে আমার বাবাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন আমার বয়স ছিল তিন বছর। আজ ১৩ বছর হয়ে গেছে, আমি জানি না ‘বাবা’ জিনিসটা আসলে কী। যদি জানতাম, বাবাকে আর কোনোদিন দেখতে পাবো না, তাহলে সেদিন শক্ত করে বাবাকে জড়িয়ে ধরতাম। বাবার ছবিটা বুকে নিয়ে মায়ের হাত ধরে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি কিন্তু বাবাকে কোথাও পাইনি। আমি একবার বাবার হাতটা ধরতে চাই। আমার বাবাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। মাত্র ২ মাস বয়সে সাফার বাবা নিখোঁজ হন। তার আক্ষেপ, কখনো বাবাই ডাকতে না পারার। নেই বাবার সঙ্গে কোনো স্মৃতিও।
কাঁদতে কাঁদতে মিম বলে, একযুগ ধরে বাবার জন্য সবাই অপেক্ষা করছি কিন্তু এখনো পর্যন্ত তাকে দেখতে পারিনি। অনেক জায়গায় গিয়েছি কিন্তু কোনো খোঁজ পাইনি। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর সবার জন্য দেশ স্বাধীন হলেও আমার জন্য হয়নি। আমি এখনো আমার বাবাকে ফেরত পাইনি। যতদিন গুমের শিকার আমার বাবা ও অন্যদের খুঁজে না পাব ততদিন আমাদের জন্য দেশ স্বাধীন হবে না। বাবা ছাড়া আমাদের হাজারো কথা, হাজারো ইচ্ছে মাটিচাপা পড়ে গেছে।
মিম, সাফা, ঋদির মতো গত ১৭ বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুমের শিকার হয়ে স্বজন হারিয়েছে অসংখ্য পরিবার। কেউ বাবা, কেউ সন্তান, কেউ ভাই আবার কেউ বা হারিয়েছেন স্বামীকে। এখন শুধু সুষ্ঠু বিচার দাবি করছেন পরিবারের সদস্যরা। এসময়, ভুক্তভোগীর স্বজনদের কান্না আর আর্তনাদ শুনে কাঁদেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। স্বজনদের এসব আর্তনাদ ছুঁয়ে যায় তারেক রহমানকেও। মঞ্চেই বসে তাকে কাঁদতে দেখা যায়।