মাবিয়া আক্তার © টিডিসি ফটো
২০১৬ এসএ গেমসে স্বর্ণ জয়ের পর লাল-সবুজের পতাকা গায়ে জড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে দাঁড়িয়ে থাকা মাবিয়া আক্তারের সেই দৃশ্য বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক অনন্য আবেগের জন্ম দিয়েছিল। তবে বর্তমানে তার ক্যারিয়ার অনিশ্চয়তার মুখে।
গত বছর ইসলামিক সলিডারিটি গেমসের প্রস্তুতিতে ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) ভবনে তার ডোপ পরীক্ষা করা হয়। পরে সেই পরীক্ষায় তার শরীরে ‘ফুরোসেমাইড’ ও ‘ক্যানরেনোন’ নামের নিষিদ্ধ উপাদান পাওয়া যায়, যা সাধারণত শরীর থেকে পানি বের করা বা অন্য নিষিদ্ধ ওষুধের চিহ্ন আড়াল করতে ব্যবহৃত হয়। এজন্য তাকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তবে এই সংকটেও হাল ছাড়েননি তিনি; আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আপিল করার কথা জানিয়েছেন। সম্প্রতি এই ইস্যুতে কথা বলেছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের ক্রীড়া প্রতিবেদক মোহাম্মদ রনি খাঁ’র সঙ্গে। যেখানে তার শারীরিক জটিলতা, পাঠকদের জন্য কথোপকথনের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।
ডোপ টেস্টে আপনি পজিটিভ, এর পেছনের কারণটা আসলে কী...
আমি গত বছর থেকে চিকিৎসার উপর আছি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি বা তারও আগে থেকে আমার হাটুতে ব্যথা ছিল। ব্যথা থেকে আস্তে আস্তে আমার হাটুর পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলাম। তারপর আমি ডাক্তারের কাছে যাই। তারপর আমার হাটুর পেছনের দিকে পানি জমে যায়। তার জন্য আমার ডাক্তার কিছু ঔষধ দেয়। ঔষধ খাওয়াকালীন সময়ে আমি নমুনা পরীক্ষার জন্য দিই ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের ভবনে। নমুনা দেওয়ার সময় আমার চিকিৎসা চলছিল। সেই সময় আমি ডাক্তারকে জানিয়েছিলাম, তার প্রেসক্রিপশনও আমার কাছে আছে। স্যাম্পল দেয়ার পর আমি সলিডারিটি গেমস খেললাম, সেখান থেকে চলে আসলাম। ১৫ জানুয়ারি আমার নমুনার রিপোর্ট পাঠানো হয় যেখানে ডায়োটিকস নামের একটি পদার্থ পাওয়া যায়। ডায়োটিকস একটি ঔষধের ‘র’ প্রোডাক্ট বা মূল উপাদান। আমি যে ঔষধ খেয়েছি তার জন্যই এই নমুনা আসছে। তখন আমি পুরো প্রেসক্রিকশন দেখে ডাক্তারকে জানাই, তিনি আমার কাগজপত্র দেখাতে বলে। জমা দেয়ার পর গত বৃহস্পতিবার আমাকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে।
বিওএ কী সাধারণত আপনাদের মেডিটেশনের বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকে...
প্রতিবার কোনো খেলায় যাওয়ার ১০-১২ দিন আগে বিওএ একটি সেমিনার করে এবং তার দুই-তিনদিন পর নমুনা সংগ্রহ করে। ভারত্তোলনের জন্য কোনোটি খাওয়া যাবে, কোনটি খাওয়া যাবে না, এমন কোনো সেমিনার আমাদের কখনোই হয়নি। তবে আমার যেটা ধরা পড়ছে, সেটা ভারত্তোলনের জন্য খাওয়া নিষেধ। অতিরিক্ত পানি কমানোর জন্য ওই ঔষধ খাওয়া নিষেধ। এটা আমি ব্যক্তিগতভাবে জানতাম না। আমাদের ক্যাম্প চলাকালীন যে ডাক্তাররা যান, তারা কোনোদিন ফিল্ডে এসে আমাদের পরীক্ষা করেন না, তারা আমাদের মেডিকেল ব্যাকগ্রান্ডও জানেন না। আমার ওষুধের পুরো এক বছরের প্রেসক্রিপশন আমার কাছে আছে।
এর পেছনে কী তাহলে অন্য কোনো ড্রাগ আলোচনায়...
আমি আমার পায়ের চিকিৎসার জন্য যে ঔষধটি খাচ্ছিলাম তার জন্যই আমার ডোপ টেস্টে পজিটিভ এসেছে। অন্য কোনো ড্রাগ বা নিয়ম বহির্ভূত কোনো কিছুই না। সেটা লেখা আছে, কোন পদার্থের জন্য আমি নিষিদ্ধ হয়েছি।
ফেডারেশনের সঙ্গে আলাপ হয়েছে কি না... তারা আসলে কী বলছে?
ফেডারেশনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ফেডারেশনের সভাপতি মহোদয়ের সঙ্গে আমার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই একটি ইতিবাচক সম্পর্ক ও পারস্পরিক বোঝাপড়া রয়েছে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমি তার মাধ্যমেই বিভিন্ন সহযোগিতা পেয়ে আসছি। আমি তাকে পুরো বিষয়টি অবগত করেছি। তিনি আমাকে বলেছেন, যদি ফেডারেশনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তাহলে অবশ্যই সহযোগিতা করবেন তিনি।
২০১২ সালে জাতীয় দলে যোগ দিয়ে দ্রুতই দেশের সেরা ভারোত্তোলকদের একজন হয়ে ওঠেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাঁচটি স্বর্ণপদকও জিতেছেন। ২০১৬ ও ২০১৯ সালের এসএ গেমসে টানা দুবার সোনা জয়ের কৃতিত্বও আপনার। সবমিলিয়ে এবারের বিষয়টি আপনার ক্যারিয়ারের জন্য এটা ধাক্কা কিনা...
আমার ক্যারিয়ারে অনেক ধাক্কা এসেছে, বিশেষ করে আমি কখনো প্রতিযোগিতামূলক জীবনে তেমনভাবে জড়িত ছিলাম না। তাই এই প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়াটা আমার জন্য বড় একটা ধাক্কা।
সামনেই বড় বেশ কিছু ইভেন্ট ছিল। আপনাকে ঘিরে সম্ভাবনা দেখছিলেন ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা। কিছুটা হতাশায় পুরছেন কিনা?
বর্তমানে আমার অবস্থাটা কিছুটা অনিশ্চয়তায় আছে—সাসপেনশনে কী কী শর্ত দেওয়া হয়েছে বা সামনে কী হতে যাচ্ছে, সেটাও আমি জানতে চাই। আমি আসলে আগামী বছরের গেমসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এবং সেই লক্ষ্যেই খেলছিলাম। কিন্তু এখন এই অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি এবং আমার ওপর কী ধরনের শাস্তি আসতে পারে, সেটাও বুঝতে চাই। কোনো খেলোয়াড় যদি নিয়মিত প্রতিযোগিতায় অংশ না নেয়, তাহলে তার ক্যারিয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে—শুধু ট্রেনিং করলেই সবসময় ফল পাওয়া যায় না। মিটিংয়ের পরে বিস্তারিত জানার সুযোগ পেলে আমি বিষয়গুলো আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারব এবং প্রয়োজন হলে নিজের অবস্থান প্রমাণ করতে পারব। তবে ইতিবাচক দিকও আছে, আমার পারফরম্যান্স ভালো ছিল এবং আমি একটি গোল্ড মেডেল অর্জন করেছি, যা আমার জন্য বড় একটি সাফল্য। গত দুই দিনে কিছু বিষয় ইচ্ছামতো হয়নি, কিন্তু তবুও...
সবমিলিয়ে এর পেছনে কী কারোর দায় দেখছেন? কিংবা নিজের মধ্যে কোনো অনুশোচনা রয়েছে...
আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, আমি কোনো ক্রীড়া-সম্পর্কিত ডাক্তারের কাছে যায়নি। বাংলাদেশে কোন ক্রীড়া শিক্ষক আছে? কিংবা অনুমতি সাপেক্ষে গিয়েছি, বিষয়টা তেমন না। এখানে কাউকে দোষারোপ করার বিষয় নয়। আমার হাঁটুতে ব্যথা ছিল, কিন্তু আমাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ক্রীড়া চিকিৎসক বা অভিভাবকসুলভ গাইডলাইন ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে আমি বাইরের একজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছি। এখন আমি কি তাকে দোষ দিতে পারি? তিনি কি জানতেন যে ভারোত্তোলনের জন্য কোন ওষুধ গ্রহণযোগ্য বা নিষিদ্ধ? আমি নিজেও এ বিষয়ে পুরোপুরি অবগত ছিলাম না। আমাদের খেলাধুলার ক্ষেত্র আলাদা, তাই অন্য বিভাগের একজন চিকিৎসকের পক্ষে এসব নির্দিষ্ট নিয়ম জানা সবসময় সম্ভব নয়। আমি তার কাছে শুধু হাঁটুর ব্যথার জন্য যাইনি, আমার আগের আঘাতগুলোর চিকিৎসার জন্যও আমি তার রোগী ছিলাম। তাই সবকিছু বিবেচনা করেই আমি চিকিৎসা নিয়েছি। আমি কোনো কিছুই ইচ্ছাকৃতভাবে করিনি, সবকিছুই সচেতনভাবে করার চেষ্টা করেছি। মূল সমস্যা হলো, আমাদের আগে থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি যে কোনো ওষুধ ভারোত্তোলনের জন্য নিষিদ্ধ, বা কোন ধরনের চিকিৎসা গ্রহণ করা যাবে না। যদি আমাকে আগে থেকেই এ বিষয়ে সতর্ক করা হতো, তাহলে আমি অবশ্যই আরও সাবধান থাকতাম। কিন্তু এমন কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা আমরা পাইনি।
আপিলের বিষয়ে কিছু ভেবেছেন কিনা... সহজ করে বললে আপনার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে যাচ্ছে?
আপিলের জন্য অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সাথে আমার বসতে হবে। আপিলের ধারা কোন বিষয়ে, কোন প্রসেসে করতে হবে তার কিছুই আমি জানি না। জানার পর আমার শাস্তির বিষয়ে যদি কোনো সমস্যা হয় তাহলে ওই প্রক্রিয়ায় আমি যাব না। আরেকটি ব্যাপার আছে, মেডিকেল কমিটি যারা আমাকে অবগত করেছে তাদের কাছে একটা আপিল করা আমাকে মাফ করার জন্য। এই একটি প্রক্রিয়া আমার জন্য খোলা আছে। অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সাথে আমার আলোচনার আগে আমি কিছুই বলতে পারছি না।