নতুন বিজ্ঞানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা

০৫ মার্চ ২০২৬, ০৪:০৯ PM
মো. আরিফ খান

মো. আরিফ খান © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, খাদ্যনিরাপত্তার চাপ, বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা; অন্যদিকে তরুণ জনগোষ্ঠীর বিপুল সম্ভাবনা। এমন সময় বর্তমান সরকার জনাব ফকির মাহবুব আনাম, এমপিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেছে। নতুন বাংলাদেশে বিজ্ঞানমন্ত্রীকে হতে হবে জাতীয় উদ্ভাবন স্থাপত্যের প্রধান স্থপতি। কারণ বিজ্ঞান এখন আর শুধু ল্যাবরেটরির ভেতরের বিষয় নয়। এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা, কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও কূটনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি।

প্রশ্ন হল— আমরা কি বিজ্ঞানের শক্তিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছি কিংবা করতে চাই? নাকি এখনও বিজ্ঞানকে একটি সীমিত মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম হিসেবে দেখছি? নতুন বিজ্ঞানমন্ত্রীর কাছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত তালিকা আকারে তুলে ধরতে চাই।

১. গবেষণায় বিনিয়োগ
বিজ্ঞানে বাজেট দেওয়ার সময় আশা করি আপনি সুদূরপ্রসারী চিন্তা করবেন এবং এটাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখবেন। আমাদের প্রথম মানসিক পরিবর্তন দরকার এখানেই। গবেষণায় ব্যয়কে অনুদান নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রিটার্নের বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। যে দেশ গবেষণা ও উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করে, সে দেশই উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি তৈরি করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায়। বিজ্ঞানমন্ত্রীর কাছে তাই আমরা স্পষ্ট রোডম্যাপ চাই— তিনি গবেষণায় বিনিয়োগ কীভাবে ধাপে ধাপে বাড়াবেন এবং তার ফলাফল কীভাবে পরিমাপ করবেন।

২. ল্যাব বেঞ্চ থেকে বাজার
বাংলাদেশে মেধাবী গবেষকের অভাব নেই। কিন্তু এত মেধাবী গবেষক ও এতগুলো সরকারি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও গবেষণার ফল কতটা শিল্পে, কৃষিতে বা স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োগ হচ্ছে? আমাদেরকে বুঝতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে কাঠামোগত সংযোগ ছাড়া উদ্ভাবন অর্থনীতিতে রূপ নেয় না। প্রয়োজন প্রযুক্তি স্থানান্তর, অফিস, স্টার্টআপ ইনকিউবেশন এবং উদ্ভাবন তহবিল— যাতে একটি গবেষণা ধারণা উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে বাজারে পৌঁছাতে পারে। আমাদের সব স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমগুলোকে আপনি ঢেলে সাজাবেন যাতে করে এর সুফল আমরা ভোগ করতে শুরু করি।

৩. অগ্রাধিকার নির্ধারণ
একজন কার্যকর বিজ্ঞানমন্ত্রী সব ক্ষেত্রে সমান বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় না; বরং জাতীয় বাস্তবতার আলোকে কিছু ‘গ্র‍্যান্ড চ্যালেঞ্জ’ নির্ধারণ করেন। যেমন— লবণাক্ততা-সহনশীল ফসল, সাশ্রয়ী ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সাশ্রয়ী সংরক্ষণ, জলবায়ু অভিযোজন প্রযুক্তি। আপনার উচিত হবে সীমিত সম্পদকে কিভাবে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে বড় অগ্রগতি সম্ভব করা যায়।

৪. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিজ্ঞান কূটনীতি
আধুনিক বিজ্ঞান সীমান্ত মানে না। বৈশ্বিক গবেষণা নেটওয়ার্কে সক্রিয় অংশগ্রহণ, যৌথ গবেষণা প্রকল্প এবং প্রযুক্তি সহযোগিতা ছাড়া অগ্রগতি সম্ভব নয়। আপনাকে তাই হতে হবে দক্ষ বিজ্ঞান-কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির হাতিয়ার বানাতে আপনি আপনার মতো করে চেষ্টা করবেন এই প্রতিশ্রুতি দিবেন।

৫. নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জনআস্থা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক গবেষণা, ডেটা ব্যবস্থাপনা— এসব ক্ষেত্রে শক্ত নৈতিক কাঠামো ও জবাবদিহি না থাকলে প্রযুক্তি আস্থাহীনতা তৈরি করে। আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছ অনুদান প্রক্রিয়া, পিয়ার-রিভিউ ভিত্তিক মূল্যায়ন এবং ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহিতা।

৬. বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ
তরুণদের গবেষণায় আগ্রহী করা, ভ্রান্ত ধারণা দূর করা এবং যুক্তিবাদী চিন্তাকে উৎসাহ দেওয়া— এসবের মাধ্যমে বিজ্ঞানকে মানুষের ভাষায় পৌঁছে দেওয়া জরুরি। আপনাকে কেবল নীতিনির্ধারক নয়, অনুপ্রেরণাদায়ী জননেতাও হতে হবে। এটাই হবে সর্বোত্তম আগামী প্রজন্মের বিনিয়োগ।

সম্ভাব্য অগ্রাধিকার ক্ষেত্র
অতীতে যারা কাজ করেছেন এই মন্ত্রনালয়ে, তারা তাদের ভিশন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কিন্তু আপনি দেশ ও বিদেশের বিজ্ঞানীদেরকে নিয়ে একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতি তৈরির রোডম্যাপ প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারেন এবং সম্ভাব্য অগ্রাধিকার ক্ষেত্র নির্ণয়ে আপনি উনাদের সহযোগিতাও নিতে পারেন। এক্ষেত্রে কিছু অগ্রাধিকার ক্ষেত্র আমি উল্লেখ করতে চাই।

১. বায়োটেকনোলজি (জীবপ্রযুক্তি)
খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই কৃষি উৎপাদনের জন্য জিনগত উন্নয়ন, রোগপ্রতিরোধী ফসল এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসার আরও বাড়াতে হবে। দেশের বায়োটেকনোলজি গ্র‍্যাজুয়েটদের প্রাধান্য দিয়ে নতুন নতুন পলিসি গ্রহন করলে দেশ দ্রুত আগাবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

২. নবায়নযোগ্য জ্বালানি
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও জ্বালানি স্বনির্ভরতার জন্য সৌর, বায়ু ও অন্যান্য সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

৩. ডিজিটাল শিক্ষা ও দক্ষতা
তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা বিজ্ঞানে প্রশিক্ষণ, এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা সংস্কারে জোর দিতে পারেন।

৪. স্বাস্থ্য জীবপ্রযুক্তি
সাশ্রয়ী চিকিৎসা প্রযুক্তি, জেনেটিক গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে স্বাস্থ্যনিরাপত্তা আরো শক্তিশালী হয়। দেশে স্বাস্থ্য জীবপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। এজন্য বায়োটেকনোলজি গ্র‍্যাজুয়েটদের সুযোগ দিলে আমরা এই ধরনের প্রযুক্তি দেশ থেকে বিদেশেও রপ্তানি করতে পারব।

৫. বিজ্ঞান যোগাযোগ
জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানকে সহজ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করে তুলার উদ্যোগ নিতে পারেন।

৬. ব্রেইন গেইন
বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর ও কাঠামোবদ্ধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। উপযুক্ত প্রণোদনা ও গবেষণা-সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তাঁদের অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

বিশেষত প্রযুক্তিখাতে জাতীয় চাহিদাভিত্তিক গবেষণা ও উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করতে প্রবাসী বিজ্ঞানীদের সম্পৃক্ততা করে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও প্রযুক্তি স্থানান্তর সম্ভব হতে পারে। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে চায়, তবে প্রবাসী বিজ্ঞানীদের সম্পৃক্ততা অন্যতম কৌশলগত স্তম্ভ হতে পারে আপনার জন্য। এ লক্ষ্যে নিচের পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে—

১. রিটার্নিং সায়েন্টিস্ট স্কিম
২. হাই-ইমপ্যাক্ট রিসার্চ গ্রান্ট
৩. স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা পরিবেশ তৈরি
৪. প্রযুক্তি স্থানান্তর ও স্টার্টআপ সহায়তা
৫. যৌথ নিয়োগ

বিজ্ঞানকে যদি প্রশাসনিক খাত নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি হিসেবে যদি দেখতে পারেন— তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় হতে পারে নতুন বাংলাদেশের রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু এবং আপনি হবেন এই যাত্রার সিপাহসালার। নতুন বিজ্ঞানমন্ত্রী  হিসেবে আপনি হবেন দূরদর্শী কৌশলবিদ, কঠোর জবাবদিহিমুখী নীতিনির্ধারক এবং উদ্ভাবন-সমর্থক মানুষ। আশাকরি আপনি বিজ্ঞানকে কোনো বিলাসিতা হিসেবে না দেখে; এটিকে অর্থনৈতিক শক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক অগ্রগতির মূল চালিকা হিসেবে বিবেচনা করবেন। পরিশেষে মাথায় যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হল, আমরা কি এমন নেতৃত্ব বেছে নিয়েছি কিনা কিংবা জাতি হিসেবে প্রস্তুত কিনা, যে নেতৃত্ব বিজ্ঞানকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করবে?

লেখক: গবেষণা কর্মকতা, জুনোটিক ডিজিজ রিসার্চ প্রোগ্রাম, আইইডিসিআর, মহাখালী, ঢাকা।

হোয়াইট হাউসে ফোন করলেই ভেসে উঠছে ‘এপস্টেইন আইল্যান্ড’
  • ২৯ মার্চ ২০২৬
‘ভয়ংকর অপরাধে’ গ্রেপ্তার ১০ বাংলাদেশির ছবিসহ পরিচয় প্রকাশ য…
  • ২৯ মার্চ ২০২৬
‘চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে আত্মহত্যা করব’— বিএনপি…
  • ২৯ মার্চ ২০২৬
রাজধানীতে কলেজ শিক্ষার্থীকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ৪
  • ২৯ মার্চ ২০২৬
সমস্যা সমাধানে জনগনের পাশে দাঁড়াতে নেতা-কর্মীদের নির্দেশ বি…
  • ২৮ মার্চ ২০২৬
স্বাধীনতার ঘোষণা: রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান
  • ২৮ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence