পলাশ সরকার © টিডিসি ফটো
কেউ কি কখনো ঘুণাক্ষরে ভেবেছিল ইউরোপকে এক সময় আমেরিকার হুমকি মোকাবিলা করতে হবে? কিংবা একটি ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশকে আরেক সদস্য দেশ দখলের হুমকি দেবে এবং সম্ভাব্য অভিযান মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ডেনমার্কের গ্রিনল্যান্ড দ্বীপ দখলের হুমকি দিলে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। আমেরিকার নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তিনি বলেছেন ওই দ্বীপটি তিনি কিনে নিতে চান। ডেনমার্কের আওতাধীন গ্রিনল্যান্ড দ্বীপটি স্বায়ত্তশাসিত।আমেরিকা ও ডেনমার্কের টানাপড়েনের মধ্যে দ্বীপটির বাসিন্দারা ও সেখানকার সরকার স্পষ্ট করেছে যে তারা আমেরিকার নয়, বরং ডেনমার্কের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে গৌরব বোধ করে।
গ্রিনল্যান্ডের কর্তৃত্ব নিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প মরিয়া। তিনি যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন তখন গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপারে তার নীতি প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় এসে পররাষ্ট্রনীতিতে কিছুটা আগ্রাসী তিনি। ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা হামলা ও ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে বন্দি করে আরো বেশি আত্মবিশাসী হয়ে উঠেছেন তিনি। তার এ আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির সাথে খাপ খাইয়ে উঠতে পারছে না ইউরোপ।
সামরিক সামর্থ্যের দিক দিয়ে আমেরিকার তুলনায় পিছিয়ে ডেনমার্ক। আমেরিকার তরফে যে কোনো সামরিক অভিযান শুরু হলে এর পালটা ব্যবস্থা নিতে ইউরোপের কয়েকটি দেশ ডেনমার্ককে সাহায্য করছে। অপারেশন আর্কটিক এনডিউরেন্স নামে সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়ারর জন্য গত ১৫ জানুয়ারি গ্রিনল্যান্ডে সীমিত সংখ্যক সামরিক সদস্য পাঠিয়েছে দেশগুলো।
এর উদ্দেশ্য ছিল একদিকে আমেরিকাকে সতর্কবার্তা দেওয়া অন্যদিকে এটা বোঝানো যে ডেনমার্কসহ ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের স্বার্বভৌমত্বের ব্যাপারে একাট্টা। ডেনমার্ক এ পর্যন্ত ১২০ জনের মতো সৈন্য মোতায়েন করেছে দ্বীপটিতে। ওদিকে ক্রমাগত আমেরিকার হুমকির প্রেক্ষিতে ডেনমার্কও চায় গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওখানে ন্যাটোর স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি থাকুক।
এদিকে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কৌশল হিসেবে ট্রাম্প ইউরোপের কয়েকটি দেশের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এমন সময় ট্রাম্প এই ঘোষণা দিলেন যখন ইতিপূর্বে ঘোষিত শুল্ক আরোপের কারণে ইউরোপে ব্যবসা- বাণিজ্যে মন্দাভাব চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের উপর শুল্কের চাপ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা বাস্তবতা অনুধাবন করে ডেনমার্কের সঙ্গ ছেড়ে আমেরিকার সাথে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়। এবং এমন একটি পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটানো যাতে গ্রিনল্যান্ড বিক্রি করতে রাজি হয়।
গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান কোথায়?
গ্রিনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ। এর আয়তন প্রায় ২২ লাখ বর্গকিলোমিটার এবং বিশ্বের সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। গ্রিনল্যান্ডের মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ৫৬ হাজার, যাদের বেশিরভাগই আদিবাসী ইনুইট জনগোষ্ঠীর সদস্য। গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা বরফে ঢাকা, ফলে অধিকাংশ মানুষ দ্বীপটির দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে রাজধানী নুক এর আশপাশে বসবাস করে। গ্রিনল্যান্ডের অর্থনীতি মূলত মৎস্যখাতের ওপর নির্ভরশীল এবং দেশটি ডেনমার্ক সরকারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি পেয়ে থাকে।
গ্রিনল্যান্ড কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিকের মাঝামাঝিতে অবস্থান গ্রিনল্যান্ডের। ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং মহাকাশ-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিক স্পেস বেস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত পিটুফিক ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো ব্যবহার করে আসছে। এ ছাড়া দ্বীপটি এই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজ পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত উপযোগী । স্নায়ুযুদ্ধের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটিতে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছিল। তবে প্রকৌশলগত জটিলতা এবং ডেনমার্কের আপত্তির কারণে সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ পরাশক্তি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মনোযোগ আকর্ষণ করছে। গ্রিনল্যান্ডের বরফের রাজ্যের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে রেয়ার আর্থ খনিজ, ইউরেনিয়াম ও লৌহ আকরিক। পাশাপাশি এখানে তেল ও গ্যাসের উল্লেখযোগ্য মজুত থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে দ্বীপটিকে ঢেকে রাখা বরফস্তর গলতে থাকায়, এসব সম্পদ ভবিষ্যতে আরও সহজলভ্য হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ) মজুদের দিক থেকে বিশ্বে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান অষ্টম; এখানে আনুমানিক ১৫ লাখ টন রেয়ার আর্থ মজুত রয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত রেয়ার আর্থ উত্তোলন শুরু হয়নি, কারণ অঞ্চলটি অত্যন্ত দুর্গম। গ্রিনল্যান্ডের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা বরফমুক্ত, আর বছরের দীর্ঘ সময়জুড়ে দ্বীপটির বড় অংশই যাতায়াতের অযোগ্য থাকে।
গ্রিনল্যান্ডের পাশ দিয়ে গেছে সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নর্দার্ন সি রুট। যদি বরফ আরো গলতে শুরু করে নৌপথ আরও উন্মুক্ত হয়, তাহলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আটলান্টিক মহাসাগরে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ ব্যবহার করে চলাচল করতে পারবে। মেরু অঞ্চলের সাগরগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠছে। একসময় যেসব নৌপথ শুধু আইসব্রেকারের জন্য সীমিত ছিল, সেসব এখন ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক নৌপথে পরিণত হচ্ছে।
নৌখাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নর্দান সি রুট বৈশ্বিক বাণিজ্যের মানচিত্র নতুনভাবে আঁকছে। এটি এমন সব নতুন রুট যুক্ত করছে, যা সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে এবং পশ্চিম ইউরোপ থেকে পূর্ব এশিয়ায় যাত্রার সময় প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দিতে সক্ষম।
গত বছর প্রথম বারের মতো কনটেইনার জাহাজ ইস্তাম্বুল ব্রিজ চীন থেকে ইউরোপে গিয়েছিল নর্দান সি রুট ব্যবহার করে। জাহাজটি চীনের নিংবো বন্দর থেকে রওনা দিয়ে যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো বন্দর পর্যন্ত পৌঁছেছে মাত্র ২০ দিনে। আলাস্কার মেরিন এক্সচেঞ্জ নামের একটি সামুদ্রিক নজরদারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে পৃথককারী বেরিং প্রণালী দিয়ে মোট ৬৬৫টি জাহাজ চলাচল করেছে। এটি ২০১০ সালের ২৪২টি যাত্রার তুলনায় প্রায় ১৭৫ গুণ বেশি।
ট্রাম্পের হুমকি কেন?
কিছুদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, 'আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য, খনিজের জন্য নয়।" তিনি আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর হুমকির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, "আমরা যদি গ্রিনল্যান্ড না নিই, তাহলে রাশিয়া বা চীন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নেবে।' মোদ্দাকথা যুক্তরাষ্ট্রের চোখে গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব সামরিক ও ভূ-কৌশলগত অবস্থানের কারণে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, আর্কটিক অঞ্চলে চীন ও রাশিয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
প্রসংগত: ডেনমার্কের সঙ্গে ১৯৫১ সালে করা আমেরিকার একটি চুক্তি আছে। সেই চুক্তির অধীনে আমেরিকা তার নিজের নিরাপত্তায় সেখানে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর অধিকার রাখে এবং আমেরিকা দ্বীপটিতে তা করে আসছেও। তারপরেও এই দ্বীপের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, কেনার প্রস্তাব ও দখলের হুমকিকে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের নিজেদের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হিসেবে দেখছে।
খোদ আমেরিকান রাজনীতিকরাও ট্রাম্পের সমালোচনা করছেন
নেব্রাসকার রিপাবলিকান প্রতিনিধি ডন বেকন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে ট্রাম্পের পদক্ষেপকে বোকামিপূর্ণ নীতি বলে মন্তব্য করেছেন এবং এটিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের করা কোনো কাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কোনো মিত্র দেশের বিরুদ্ধে হুমকি ধমকি দেওয়া একেবারে ঠিক হচ্ছে না। বেশির ভাগ রিপাবলিকানই জানেন, এটি অনৈতিক ও ভুল। আমরা এর বিরুদ্ধে দাঁড়াব।
রাশিয়া ও চীন আসলেই গ্রিনল্যান্ড দখল নেবে?
আর্কটিক অঞ্চল ঘিরে চীন ও রাশিয়ার সহযোগিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এই সম্পর্ককে কোনো শক্তিশালী, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো প্রয়োজননির্ভর ও কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে সীমাবদ্ধ। চীন ও রাশিয়ার কার্যক্রম বা পারস্পরিক সহযোগিতা রাশিয়ার আর্কটিকেই সীমাবদ্ধ। রুশ আর্কটিকের তেল–গ্যাস প্রকল্প কিংবা সামরিক মহড়া—সবই রাশিয়ার উপকূলঘেঁষা এলাকায় ঘটছে। রাশিয়ার ভূখণ্ডের প্রায় ২০ শতাংশ অংশ আর্কটিক এলাকার মধ্যে পড়ে। আর্কটিক মহাসাগরের উপকূলরেখার প্রায় ৫০-৫৩% রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে আছে।
কানাডা বা গ্রিনল্যান্ডের আর্কটিক অঞ্চলে চীন–রাশিয়ার কোনো বাস্তব সামরিক উপস্থিতি দেখা যায়নি। এ ধরনের বিস্তার হলে ন্যাটো দেশগুলোর তীব্র প্রতিক্রিয়া আসত যা এখনো ঘটেনি।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেনে অভিযান চালানোর পর থেকে রাশিয়ার ব্যাপারে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের সন্দেহ ও অবিশ্বাস কাজ করে। ইউরোপ মনে করে রাশিয়া নিজ স্বার্থে ইউরোপের অন্য দেশে আগ্রাসন চালাতে পারে।ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকার সাথে সাথে ইউরোপীয় ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো রাশিয়ার উপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ওই অবস্থায় ২০২২ সালে রাশিয়া–চীন "নো-লিমিটস" অংশীদারিত্ব ঘোষণা করে। রাশিয়া ও চীনের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংযোগ এবং সমন্বয় হয়, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা নীতি-বিরোধী।
আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি ও বাণিজ্যিক নীতির প্রেক্ষিতে চীন চায় নিজের স্বাধীন নীতি এবং কৌশলগত বিকল্প বজায় রাখতে। তাই চীন শুধু রাশিয়ার ক্ষেত্রেই নয় অন্য কোনো দেশকেও কোনো নীতিতে পূর্ণ সমর্থন দেওয়া থেকে বিরত থাকে , যাতে তার পশ্চিমের সঙ্গে সংঘর্ষ বা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি বাড়বে। চীন শুধুমাত্র সীমিত ও সংরক্ষিত সহযোগিতা করে, যাতে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আর্কটিক অঞ্চলের ক্ষেত্রেও তাই।
অন্যদিকে রাশিয়া বেইজিংকে তার সেনাবাহিনীর শক্তি বাড়ানো ও আধুনিকীকরণের জন্য অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবারহ করে আসছে। সোভিয়েত আমল থেকে বিশাল ও জটিল সামরিক-শিল্প গড়ে তুলেছে রাশিয়া। রাশিয়ার টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন ছিল ক্রমাগত চাহিদা আসতে থাকা সামরিক সরঞ্জামের বাজার।চীনের বিশেষ চাহিদা ছিল রাশিয়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের বিমান বাহিনী, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং নৌবাহিনী আধুনিকীকরণ। চীন রাশিয়ার কাছ থেকে এসব প্রযুক্তি সুবিধা পেয়ে আসছে। চীন ধীরে-সুস্থে আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে, যদিও তাদের জরুরি ও মূল স্বার্থ এখনো অন্য অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, আর্কটিকের আন্তর্জাতিক জলসীমায় চীনের নৌযান চলাচল, সম্পদ আহরণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা করার অধিকার রয়েছে। তবে আহরণযোগ্য অধিকাংশ সম্পদ এবং অবকাঠামো—যেমন বন্দর, সড়ক ও গবেষণা কেন্দ্র অবস্থিত আর্কটিকের আটটি ‘আর্কটিক রাষ্ট্রের’ জাতীয় ভূখণ্ডে বা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায়। এই আটটি রাষ্ট্র হলো: কানাডা, ডেনমার্ক (গ্রিনল্যান্ডের মাধ্যমে), ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে, রাশিয়া, সুইডেন এবং যুক্তরাষ্ট্র। ফলে আর্কটিক যে সুবিধাগুলো দেয়, তার বড় অংশে প্রবেশাধিকার পেতে চীনকে এসব দেশের সঙ্গে সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হবে।
২০২২ সালের পর থেকে চীন-রাশিয়া আর্কটিক সহযোগিতা এমন কিছু ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে, যেখানে আগে মস্কো কোনোভাবেই চীনা উপস্থিতি মেনে নিতে রাজি ছিল না—যেমন সামরিক ও কোস্টগার্ড সহযোগিতা। তবে ভবিষ্যতে চীন নিজেকে একটি 'পোলার গ্রেট পাওয়ার' হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাশিয়ার জন্যই উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ, আর্কটিকে চীনের প্রভাব যত বাড়বে, রাশিয়া ততই নিজেকে কোণঠাসা মনে করতে পারে। ফলে বর্তমান সহযোগিতা ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় রূপ নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ডেনমার্ক ও ইউরোপের প্রতিক্রিয়া
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের যেকোনো চেষ্টা ন্যাটোর অবসান ডেকে আনতে পারে। তিনি এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ন্যাটোর অন্যান্য সদস্য দেশ—ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড ও স্পেনের নেতাদের সঙ্গে যৌথভাবে একটি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। সেখানে বলা হয়: 'গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডের জনগণেরই। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড ছাড়া আর কেউ তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।' গত ১৪ জানুয়ারি মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হোয়াইট হাউসে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন, যেখানে ভূখণ্ডটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। এদিকে নতুন করে শুল্ক আরোপ করায় যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের ব্যবসায়ীরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
ন্যাটো কি ভূমিকা রাখবে?
নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন—সংক্ষেপে ন্যাটোর মূল লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকানো এবং সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ন্যাটোর ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির ওপর—অনুচ্ছেদ ৫। এর অর্থ, ন্যাটোর কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে তা সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। এই নীতিই ন্যাটোকে অন্য যেকোনো সামরিক জোটের চেয়ে আলাদা করেছে এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা গড়ে তুলেছে। এখন ডেনমার্কের পাশে যে ইউরোপের দেশগুলো দাঁড়িয়েছে এটি মূলত ন্যাটো চুক্তিতেই বলা ছিল। যদিও সোভিয়েত রাশিয়ার বদলে দেশগুলোকে এখন তাদের এক সময়ের মিত্র আমেরিকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
লেখক: দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক