উৎপাদনের সাফল্য থেকে লোকসানের বেদনা

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৫৭ PM
টিডিসি সম্পাদিত

টিডিসি সম্পাদিত © টিডিসি

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ, যেখানে মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু জীবিকার নয়, অস্তিত্বেরও। গত কয়েক বছরে আলু উৎপাদনে দেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ উৎপাদক হিসেবে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত। উত্তরাঞ্চলের রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, নওগাঁ—এসব জেলায় শীত মৌসুমে মাঠগুলো আলুর সবুজ গাছে ভরে ওঠে। কৃষকেরা অনেক আশা নিয়ে চাষাবাদ করেন। তারা মনে করেন ভালো ফলন মানেই ভালো দাম, আর ভালো দাম মানেই সারা বছরের নিশ্চিন্ত জীবন। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই সেই আশার সঙ্গে প্রতারণা করে।

২০২৫-২৬ মৌসুমে ৮৪ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও মৌসুমের শুরুতেই অতিরিক্ত সরবরাহে দাম পড়ে যায়। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে আলু বিক্রি হওয়ায় কৃষকদের লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যেখানে কিছু অঞ্চলে দাম ১০ টাকার নিচেও নেমেছিল।

গত ২০২৪ ও ২০২৫ মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, উৎপাদন বেড়েছে, মাঠে ফলন ভালো হয়েছে, রোগবালাই তুলনামূলক কম ছিল। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর মাঠপর্যায়ের তৎপরতা, উন্নত বীজ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের এই সাফল্য বাজারে গিয়ে কৃষকের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৌসুমের শুরুতেই বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম হঠাৎ করেই নেমে যায়। বহু অঞ্চলে কৃষকরা প্রতি কেজি আলু ৮ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন, যেখানে উৎপাদন খরচই ১২ থেকে ১৫ টাকা বা তারও বেশি। ফলস্বরূপ, লাভ তো দূরের কথা, মূলধনও তুলতে পারেননি অনেকেই।

কৃষকের এই লোকসানের পেছনে প্রধান কারণ সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতা। আলু এমন একটি পণ্য যার চাহিদা তুলনামূলক স্থিতিশীল। মানুষ প্রতিদিন যতটুকু খায়, তার বেশি খাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ফলন বেশি হলে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়। সংরক্ষণব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকায় কৃষক দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন। দেশে বহু হিমাগার থাকলেও সেগুলোর ধারণক্ষমতা সীমিত, আর ভাড়াও অনেক সময় কৃষকের নাগালের বাইরে। সরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও বেসরকারি হিমাগারের ওপর নির্ভরশীলতাই বেশি। ফলে ছোট কৃষকরা প্রায়ই সংরক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। আলু রপ্তানির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ এখনো চ্যালেঞ্জপূর্ণ। মান নিয়ন্ত্রণ, কোয়ারেন্টাইন বিধি ও বাজারসংযোগের ঘাটতি রপ্তানি সম্প্রসারণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বাজার ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবও কম নয়। কৃষক সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারেন না। আড়তদার ও পাইকারদের মাধ্যমে পণ্য বাজারে যায়। আর সেই পর্যায়েই দামের বড় অংশ নির্ধারিত হয়। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকলেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর মূল্যনিয়ন্ত্রণ সব সময় নিশ্চিত হয় না। সরকার মাঝেমধ্যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করে, কিন্তু বাস্তবে সেই দামে কৃষকের পণ্য ক্রয়ের উদ্যোগ সীমিত থাকায় ঘোষণার সুফল অনেক সময় মাঠে পৌঁছায় না।

দামের পতনের সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের ব্যক্তিগত জীবনে। অধিকাংশ কৃষক মৌসুম শুরুর আগে এনজিও, সমবায় বা ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। উৎপাদন খরচ মেটাতে গিয়ে তারা দেনার বোঝা কাঁধে তুলে নেন। যখন বাজারমূল্য খরচের নিচে নেমে যায়, তখন ঋণ শোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিবার চালানো, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসাসহ সবকিছু মিলিয়ে চাপ বাড়তে থাকে। এ অর্থনৈতিক সংকট থেকে জন্ম নেয় মানসিক অস্থিরতা ও হতাশা। আর এখান থেকে অত্মহত্যা করেন অনেক কৃষক।

গত দুই বছরে বিভিন্ন জেলায় কৃষকদের ক্ষোভ ও হতাশার খবর সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। কোথাও কৃষকরা রাস্তায় আলু ফেলে প্রতিবাদ করেছেন। আবার কোথাও ন্যায্যমূল্যের দাবিতে মানববন্ধন হয়েছে। ফসলের দাম কমে যাওয়ার কারণে মাঝে মাঝে ঋণ ও লোকসানের চাপে কৃষকের আত্মহত্যার খবর পাওয়া যায়। বাস্তবতা হলো অর্থনৈতিক চাপ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলে, আর সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা জরুরি।

এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং প্রয়োজনে সরকারি ক্রয় বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগারের সংখ্যা ও ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি না করেন। তৃতীয়ত, আলুভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, স্টার্চ, রপ্তানিযোগ্য প্রস্তুত পণ্য উন্নয়ন করা গেলে অতিরিক্ত উৎপাদন শিল্পে ব্যবহৃত হতে পারে। চতুর্থত, কৃষকদের সংগঠিত সমবায় গড়ে তুলে সরাসরি বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিদিনের বাজারদর সহজলভ্য করা গেলে দরকষাকষির সক্ষমতাও বাড়বে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও সহজ শর্তে কৃষিঋণ নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশে আলু উৎপাদনের সাফল্য নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। কিন্তু সেই সাফল্যের সুফল যদি উৎপাদকই না পান, তবে তা টেকসই হতে পারে না। উৎপাদন বাড়ানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাজারব্যবস্থা, সংরক্ষণ ও মূল্য সংযোজন শিল্প উন্নয়নও সমান জরুরি। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা কেবল অর্থনৈতিক নীতি নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক দায়িত্বের প্রশ্ন। আলুর মাঠে যখন সবুজ চারা দুলে ওঠে, তখন কৃষক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। সেই স্বপ্ন যেন লোকসান ও হতাশায় ভেঙে না পড়ে—সেই দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ ও বাজারব্যবস্থার সবার। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলে বাঁচবে দেশ।

লেখক: শিক্ষার্থী, জয়পুরহাট সরকারি কলেজ

ইসরায়েলি হামলায় ইরানের পাঁচ শিক্ষার্থী নিহত
  • ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ক্যাম্পাসজুড়ে মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক…
  • ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
‘বাংলাদেশের প্রথম একাদশে থাকার যোগ্য সাকিব’
  • ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নিরাপত্তা মানছে না কিছু গ্যাস ও পেট্রোলপাম্প
  • ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ইরানের হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১ জন নিহত 
  • ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচ দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
  • ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬