নতুন দিনের আশা জাগাচ্ছে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৬ PM
মো. তানভীর হাসান

মো. তানভীর হাসান © সংগৃহীত

কথা বলা বা মনের ভাব প্রকাশ করা মানুষের অন্যতম প্রধান শক্তি। কিন্তু জন্মগত সমস্যা, দুর্ঘটনা কিংবা স্ট্রোকের কারণে অনেকেই এই শক্তি হারিয়ে ফেলেন বা বাধার সম্মুখীন হন। বর্তমান সময়ে অটিজম, স্ট্রোক এবং অন্যান্য স্নায়ুবিক সমস্যার প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি (Speech and Language Therapy) একটি অপরিহার্য চিকিৎসা সেবা হিসেবে সামনে এসেছে। রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসন চিকিৎসার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এই সেবা এখন বাংলাদেশেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি কী?

স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি (SLT) হলো এক ধরনের বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, যা মানুষের কথা বলা, ভাষা বোঝা ও ব্যবহারের সমস্যা এবং খাবার গিলতে পারার অসুবিধা দূর করতে সাহায্য করে। একজন দক্ষ থেরাপিস্ট রোগীর সমস্যা নির্ণয় করে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চিকিৎসা প্রদান করেন, যা রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, স্পিচ থেরাপির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শিশুদের মধ্যে। আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, গড়ে ৭% শিশুর ভাষা ও যোগাযোগজনিত সমস্যা থাকে, যাদের স্পিচ থেরাপি প্রয়োজন। বাংলাদেশেও এই হার প্রায় একই। বাংলাদেশে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের (অটিজম, সেরিব্রাল পলসি) সংখ্যা বাড়ছে। একটি ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, সেবা নিতে আসা শিশুদের প্রায় ৮১%-এর কোনো না কোনো ধরনের 'স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ডিসঅর্ডার' বা কথা বলার সমস্যা রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রতি হাজারে প্রায় ১১ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। স্ট্রোকের পর প্রায় ৩০-৪০% রোগী 'অ্যাফাসিয়া' (Aphasia) বা কথা বোঝা বা বলার ক্ষমতা হারানোর সমস্যায় ভোগেন। তাদের পুনর্বাসনে স্পিচ থেরাপি অপরিহার্য। এছাড়াও ডিমেনশিয়া বা পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত বয়স্কদের জন্যও এটি জরুরি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জনসংখ্যার প্রায় ১০-১৫% মানুষ কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগের সমস্যায় ভুগতে পারেন। সেই হিসেবে বাংলাদেশে কয়েক কোটি মানুষের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে স্পিচ থেরাপির প্রয়োজন হতে পারে।
সরকারিভাবে ২.৮% মানুষকে প্রতিবন্ধী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, প্রকৃতপক্ষে শিশু ও বয়স্ক মিলিয়ে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫-৭% মানুষের (মৃদু থেকে তীব্র সমস্যাসহ) স্পিচ থেরাপি সেবার প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন। কিন্তু দক্ষ থেরাপিস্টের অভাবে এর খুব সামান্য অংশই (শহরাঞ্চলে) এই সেবাটি পাচ্ছেন।

বাংলাদেশে কেন এর প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে?

বাংলাদেশে স্পিচ থেরাপির প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ হলো

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সংখ্যা বৃদ্ধি: বাংলাদেশে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD), সেরিব্রাল পলসি (CP), এবং ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। এই শিশুদের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো দেরিতে কথা বলা বা যোগাযোগের অক্ষমতা। সঠিক সময়ে স্পিচ থেরাপি পেলে এই শিশুরা সমাজের মূলধারায় মিশতে পারে। 

স্ট্রোক ও বয়স্ক রোগীদের পুনর্বাসন: বর্তমানে দেশে স্ট্রোকের রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। স্ট্রোকের পর অনেক রোগী 'আফাসিয়া' (Aphasia) বা কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার সমস্যায় ভোগেন। এদের পুনর্বাসনে স্পিচ থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। 

তোতলামি ও উচ্চারণগত সমস্যা: অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী বা কর্মজীবী মানুষ কেবল তোতলামি বা অস্পষ্ট উচ্চারণের কারণে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগেন। এটি তাদের ক্যারিয়ার এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। থেরাপির মাধ্যমে এই জড়তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

শ্রবণ প্রতিবন্ধকতা: যেসব শিশু কানে শোনে না, তারা কথাও বলতে পারে না। কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট বা হিয়ারিং এইড ব্যবহারের পাশাপাশি তাদের কথা বলা শেখানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী স্পিচ থেরাপির প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও সেবাপ্রাপ্তির স্থান

বাংলাদেশে এখন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই সেবার প্রসার ঘটছে। সিআরপি (CRP), প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র, বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত স্কুলগুলোতে এখন দক্ষ স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টরা সেবা প্রদান করছেন। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বিশেষজ্ঞের সংখ্যা এখনও অপ্রতুল।

সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ

প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বাংলাদেশে এই সেবার প্রসার ঘটাতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে:-

সচেতনতার অভাব: গ্রামের অনেক মানুষ এখনো মনে করেন, শিশু কথা না বললে তা 'সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যাবে' বা এটি কোনো 'বাতাসের দোষ। ফলে চিকিৎসার "গোল্ডেন পিরিয়ড" (সাধারণত ৫ বছরের নিচে) পার হয়ে যায়।

দক্ষ পেশাজীবীর সংকট: প্রয়োজনের তুলনায় দেশে দক্ষ ও স্বীকৃত স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের (SLT) সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও এই পদের সংখ্যা অপ্রতুল।

খরচ ও সহজলভ্যতা: বেশিরভাগ থেরাপি সেন্টার ঢাকা বা বড় শহরকেন্দ্রিক। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এই দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া ব্যয়সাপেক্ষ ও কষ্টকর।

উত্তরণের উপায়

একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে যোগাযোগের অক্ষমতা দূর করা জরুরি। এজন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন

সরকারি উদ্যোগ: প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে স্পিচ থেরাপি ইউনিট চালু করা এবং থেরাপিস্ট নিয়োগ দেওয়া।

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং মানসম্মত থেরাপিস্ট তৈরি করা।

সামাজিক সচেতনতা: মিডিয়া এবং সমাজকর্মীদের মাধ্যমে প্রচার করা যে, দেরিতে কথা বলা কোনো লজ্জা বা অভিশাপ নয়, এটি চিকিৎসাযোগ্য।
কথা বলতে পারা মানুষের অন্যতম মৌলিক শক্তি।

বাংলাদেশে স্পিচ থেরাপি এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি হাজারো শিশু ও বয়স্ক মানুষের জীবনে আশার আলো। সঠিক সময়ে সঠিক থেরাপি কেবল একজন রোগীকে নয়, বরং একটি পুরো পরিবারকে হতাশা থেকে মুক্তি দিতে পারে। তাই রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্পিচ থেরাপিকে একটি সহজলভ্য সেবায় পরিণত করা জরুরি।

লেখক : মো. তানভীর হাসান
লেকচারার, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি বিভাগ, ময়মনসিংহ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি এন্ড হেলথ সায়েন্সেস

জাল সনদধারীর এমপিও বন্ধসহ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ এনটিআরসিএর
  • ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
  • ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিশ্বকাপ মিস করে কোমায় গিয়েছিলেন কিনা, জানালেন সাইফ 
  • ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কিশোরগঞ্জে সৌদি প্রবাসীদের উদ্যোগে ৬০০ পরিবারকে ইফতার সহায়তা
  • ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সংসদ বসছে কবে, জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
  • ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
এপ্রিলেই বাংলাদেশিদের জন্য সব ধরণের ভারতীয় ভিসা সচল হচ্ছে
  • ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬