অখ্যাত প্রতিষ্ঠান থেকে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য: এক আলোকযাত্রার মহাকাব্য

১৪ মার্চ ২০২৬, ১০:৩৭ PM
অধ্যাপক ড. হাছানাত আলী

অধ্যাপক ড. হাছানাত আলী © ফাইল ছবি

মানুষের জীবনের ইতিহাস কখনো কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; কখনো তা হয়ে ওঠে সময়ের এক গভীর উপাখ্যান। সেই উপাখ্যানে থাকে মাটির গন্ধ, থাকে সংগ্রামের ঘাম, থাকে স্বপ্নের দীপ্তি। সমাজের প্রান্তিক কোনো বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসে যে কিশোর প্রথম অক্ষর শিখেছিল, একদিন সেই কিশোরই যদি হয়ে ওঠে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য—তবে সেটি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, সেটি এক সমাজের আত্মবিশ্বাসের পুনর্জন্ম। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহা: হাছানাত আলীর জীবনকাহিনি ঠিক তেমনই এক আলোকময় যাত্রা। যেখানে শুরু ছিল অখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বিনয়ী উঠোনে, আর পরিণতি দাঁড়িয়েছে জ্ঞান নেতৃত্বের সর্বোচ্চ আসনে। নন্দীগ্রাম উপজেলার মাটির মাদরাসা থেকে তার স্বপ্নের শুরু।

বাংলাদেশের গ্রামবাংলা শুধু কৃষির নয়, স্বপ্নেরও জন্মভূমি। কাঁচা রাস্তার ধুলো, টিনের চালের স্কুলঘর, আর পুরোনো বেঞ্চের ওপর খোলা বই—এসবের মধ্যেই বহু প্রতিভার জন্ম হয়। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের শৈশব কেটেছে এমনই এক সাধারণ বাস্তবতায়। তার বিদ্যালয়/ মাদরাসা ছিল না কোনো নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান; ছিল না আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া কিংবা সুবিশাল লাইব্রেরি। কিন্তু সেখানে ছিল এক অন্যরকম আলো—শিক্ষকদের আন্তরিকতা এবং একজন ছাত্রের অদম্য জানার ইচ্ছা। শৈশবেই তিনি বুঝেছিলেন, শিক্ষা কেবল পরীক্ষার খাতা পূরণের বিষয় নয়; শিক্ষা হলো মানুষের ভিতর আলো জ্বালানোর প্রক্রিয়া। সেই আলোই ধীরে ধীরে তাকে এগিয়ে নেয় এক দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রার পথে।

গ্রামের ছোট পরিসর থেকে বেরিয়ে যখন তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য পা রাখেন স্বাধিন বাংলাদের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়) এর বিস্তৃত প্রাঙ্গণে, তখন যেন তার সামনে খুলে যায় এক নতুন দিগন্ত। দেশের এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি বহু স্বপ্নবাজ তরুণের আত্মপ্রকাশের জায়গা। সেই ক্যাম্পাসের গ্রন্থাগার, শ্রেণিকক্ষ এবং মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তার চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি কেবল একজন মেধাবী শিক্ষার্থীই ছিলেন না; ছিলেন অনুসন্ধিৎসু এক মন। পাঠ্যবইয়ের সীমা ছাড়িয়ে ইতিহাস, দর্শন, সমাজ এবং মানবিকতার প্রশ্ন তাকে ভাবিয়ে তুলত। তার কাছে শিক্ষা ছিল জ্ঞানের সঙ্গে মানবতার মিলনস্থল। শিক্ষা জীবনে প্রতিটি স্তরে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। প্রতিটি পারলিক পরীক্ষার প্রথম শ্রেনীতে উর্তীর্ণ হয়েছেন। বিজনেজ ফ্যাকাল্টিতে ১ম স্থান অর্জন করে প্রেসিডেন্ট/ চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল লাভ করা ছিলো তাঁর শিক্ষা জীবনে বড় কৃতিত্ব। তিনি মাইক্রেডিট নিয়ে পিএইচডি করেছেন।  

উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি ১৯৯৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী যুক্ত হন শিক্ষকতা পেশায়, এবং যোগ দেন তারই প্রিয় বিদ্যাপীঠ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক  হিসেবে। দীর্ঘ আট বছুর একই বিভাগে অধ্যাপনা শেষে ২০০৪ সালের ১ আগষ্ট উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ বিদ্যাপিঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ তে। একজন প্রকৃত শিক্ষক কখনো কেবল পাঠদান করেন না; তিনি ভবিষ্যতের সমাজ নির্মাণ করেন। শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য শেখাননি—শিখিয়েছেন চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং সত্যের সন্ধান করতে।
তার বক্তৃতা ছিল যুক্তিনির্ভর, মানবিক এবং অনুপ্রেরণাদায়ী। শিক্ষার্থীরা তাকে দেখতেন একজন শিক্ষকের চেয়েও বেশি কিছু হিসেবে—একজন পথপ্রদর্শক, একজন চিন্তার উদ্দীপক। গবেষণা, প্রবন্ধ রচনা এবং একাডেমিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন একজন স্বীকৃত শিক্ষাবিদ। জ্ঞানচর্চার প্রতি তার এই নিষ্ঠা তাকে এনে দেয় এক বিশেষ মর্যাদা।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে নানা বঞ্চনার কথা বলে এসেছে। এই অঞ্চলের মানুষের বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়—যেখানে প্রান্তিক শিক্ষার্থীরাও পাবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ।

নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার উত্তর। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা মানে শুধু ভবন নির্মাণ নয়; তার জন্য প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গি, নেতৃত্ব এবং একাডেমিক সাহস। প্রয়োজন এমন একজন শিক্ষানেতা, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দেখবেন না—বরং একটি জ্ঞানসমাজ গড়ে তোলার কেন্দ্র হিসেবে ভাববেন। এই দায়িত্বই এসে পড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাজ্ঞ শিক্ষকের ওপর।

উপাচার্যের আসনে: দায়িত্বের নতুন অধ্যায়
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এটি শুধু একটি পদ নয়; এটি এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় মানে নতুন স্বপ্ন। সেখানে শিক্ষার মান নির্ধারণ করতে হয়, গবেষণার ভিত্তি গড়ে তুলতে হয়, শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মানবিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয়। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন—যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে তিনটি বিষয়:মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণাভিত্তিক জ্ঞানচর্চা, স্থানীয় সমাজ ও উন্নয়নের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ। তার নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেছে জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র।

তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের প্রকৃত সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে গ্রাম ও মফস্বলের তরুণদের মধ্যে। সেই কারণেই নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি গড়ে তুলতে চান প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের স্বপ্নপূরণের কেন্দ্র হিসেবে। তার নীতির মূল দর্শন ছিল—শিক্ষা হবে মানুষের মুক্তির পথ, আর বিশ্ববিদ্যালয় হবে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি। এই দর্শনের ভিত্তিতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা উৎসাহ এবং শিক্ষার্থীদের মানবিক বিকাশের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। 

অখ্যাত প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের আসনে পৌঁছানো কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতীক। এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রতিভা কোনো বড় শহরের একচেটিয়া সম্পদ নয়। গ্রামের মাটিতেও জন্ম নেয় ভবিষ্যতের চিন্তাবিদ, শিক্ষক এবং নেতা।

তরুণদের জন্য প্রেরণার আলো আজ বাংলাদেশের কোনো গ্রামের ছাত্র যখন টিনের ছাউনি দেওয়া স্কুলে বসে বই খুলে, তখন হয়তো সে জানে না—তার ভবিষ্যৎ কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের জীবন তাকে সেই সাহস দেয়। বলে—শুরুটা ছোট হলেও লক্ষ্য হতে পারে আকাশসম। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে— মাটির কাছ থেকেই আকাশের দিকে উড়াল শুরু হয়। একটি অখ্যাত বিদ্যালয়ের উঠোনে শুরু হওয়া শিক্ষাযাত্রা যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে পরিণতি পায় নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের আসনে, তখন সেটি হয়ে ওঠে এক অনন্য আলোকযাত্রা। এই গল্প কেবল একজন মানুষের নয়; এটি একটি অঞ্চলের আশা, একটি সমাজের স্বপ্ন এবং একটি জাতির সম্ভাবনার গল্প। যে মাটিতে স্বপ্ন বোনা হয়, সেই মাটিই একদিন ইতিহাসের বৃক্ষ হয়ে ওঠে। আর সেই বৃক্ষের ছায়ায় দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্ম শেখে—স্বপ্ন দেখার সাহসই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।


লেখক: উপ-নির্বাহী পরিচালক, টিএমএসএস

দুর্নীতির মামলায় কাস্টমসের ১১ কর্মকর্তার জামিন বাতিল, কারাগ…
  • ১২ জুলাই ২০২৬
বিএসবির খায়রুল বাশারের ৩৩ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক করল সিআইডি
  • ১২ জুলাই ২০২৬
প্রতারণা মামলায় সময় টিভির সাবেক এমডি জোবায়েরের জামিন হয়নি 
  • ১২ জুলাই ২০২৬
প্রাথমিক বৃত্তির টাকা দ্বিগুণ হচ্ছে
  • ১২ জুলাই ২০২৬
দীর্ঘ আট বছর পর গতি পেল চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল…
  • ১২ জুলাই ২০২৬
সেপ্টেম্বরের মধ্যে পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির দাবি, বিলম্ব …
  • ১২ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence