৫ বছরের মেডিকেল ডেথ সার্টিফিকেট
৫ বছরে নথিভুক্ত মৃত্যুর ৩৫ শতাংশই হয়েছে হৃদরোগে © টিডিসি সম্পাদিত
দেশের সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে কারণসহ নথিভুক্ত (মেডিকেল সার্টিফিকেট অব কজ অব ডেথ) মোট মৃত্যুর ৫৭ শতাংশই ঘটেছে অসংক্রামক রোগে। এর ৬২ শতাংশ, অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ৩৫.৩৪ শতাংশ মারা গেছেন হৃদরোগ-স্ট্রোক ও রক্তনালীসংক্রান্ত রোগ বা কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজে। সম্প্রতি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) জাতীয় জনস্বাস্থ্য বুলেটিনে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মৃত্যুর প্রতিবেদনের পাঁচ বছরের বিশ্লেষণ (২০১৯-২০২৩)’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন আরও বলছে, হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করা নারীদের মধ্যে শৈশব ও প্রারম্ভিক প্রাপ্তবয়স্ক (early adulthood) বয়সে মারা যাওয়ার হার পুরুষদের তুলনায় বেশি। তবে মোট নথিভুক্তির বিচারে দেশের নারীদের হাসপাতালে নেওয়ার কম প্রবণতার চিত্রও মিলেছে এই প্রতিবেদনে। এ ছাড়া কম বয়সে সংক্রামক এবং বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার বৃদ্ধির কথাও বলা হয়েছে এতে। তবে ২০২৩ সালে মোট অসংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুর ৪০ শতাংশের বেশি ঘটেছে ১৫-৪০ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ডা. তাজরীন আহমেদ, ডা. মো. আদনান খান, মো. রাজি উদ্দিন, অনিমেষ বিশ্বাস, এসএম হাসান মাহমুদ, ফারহানা হাবিব ও সাবেক পরিচালক ডা. শাহ আলী আকবর আশরাফী এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন।
গবেষকরা বলছেন, মেডিকেল সার্টিফিকেট অব কজ অব ডেথ (এমসিসিডি) ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত মৃত্যুর কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করে নথিভুক্ত করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য ডিস্ট্রিক্ট হেলথ ইনফরমেশন সফটওয়্যার, ভার্সন ২ (ডিএইচআইএস২)-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে চারটি হাসপাতাল নিয়ে পাইলট কার্যক্রম শুরু হলেও ২০২৩ সালের মার্চ নাগাদ এটি ৫৩২টি সরকারি ও ৬২টি বেসরকারি হাসপাতালে সম্প্রসারিত হয়েছে, যা দেশের স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থার উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এসব প্রতিষ্ঠানে ২০১৯-২০২৩ সময়কালে সংঘটিত মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক মৃত্যুর ধরণ বর্ণনা করা হয়েছে এবং ডব্লিউএইচও গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ (জিবিডি) শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী মৃত্যুর প্রধান কারণসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের স্থায়ী চ্যালেঞ্জ, এপিডেমিওলজিক্যাল ট্রাঞ্জিশন (রোগ ও মৃত্যুর ধরনের পরিবর্তন) এবং অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান প্রাধান্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
হাসপাতালে কি নারী কম যাচ্ছে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সময়কালে মোট ৫ লক্ষ ৭৬ হাজার ৯৩৫টি সার্টিফিকেটভুক্ত মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। মোট মৃত্যুর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৩ লক্ষ ৪৫ হাজার ৬২১, যা ৬০ শতাংশ। এর বিপরীতে নারীর সংখ্যা ২ লক্ষ ২৭ হাজার ৪৯০, যা ৩৯ শতাংশ। প্রায় ১% ক্ষেত্রে লিঙ্গ নথিভুক্ত ছিল না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শৈশব ও প্রারম্ভিক প্রাপ্তবয়স্ক (early adulthood) বয়সে নারীদের মৃত্যুর সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় বেশি। তবে সামগ্রিকভাবে নারীদের নথিভুক্তি কম। বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে নারীদের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে মৃত্যু তুলনামূলক অনেক কম। বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে এই চিত্র পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মত গবেষকদের। তারা বলছেন, এটি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের আচরণ, নারীদের স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা অথবা বয়স্ক নারীদের স্বাস্থ্যসেবা-প্রতিষ্ঠানের বাইরে মৃত্যুবরণের সম্ভাব্য ইঙ্গিত বহন করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই স্থিতিশীল লিঙ্গবৈষম্য স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি, ব্যবহার ও প্রতিবেদন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্যের প্রতিফলন হতে পারে। একই সঙ্গে এটি অপেক্ষাকৃত কমবয়সী নারীদের মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকি, বিশেষত মাতৃস্বাস্থ্যজনিত কারণসমূহ চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তাও নির্দেশ করে।
মৃত্যুর শীর্ষে হৃদরোগ, ‘চ্যালেঞ্জ’ মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্যসেবায়
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তুলনামূলক উচ্চ মৃত্যুহার এবং অন্যদিকে মধ্য ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীতে মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিবেদন বলছে, বয়স ৪০ বছর অতিক্রম করার পর মৃত্যুর হার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। বিশেষ করে ৫০-৭৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি, যা অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং জনসংখ্যার বার্ধক্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আগে হৃদরোগ কিংবা হার্ট অ্যাটাককে শুধুমাত্র বয়স্কদের রোগ হিসেবেই চিন্তা করা হতো। কিন্তু অতি সম্প্রতি আমরা যে প্রবণতা লক্ষ্য করছি, এটা শুধুমাত্র যে বয়স্কদের আক্রান্ত করছে এরকম না। যারা তুলনামূলক তরুণ—বয়স ৪০ কিংবা ৪৫—বিশেষ করে আমাদের এই ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের দেশগুলোতে তরুণরাও বেশ ব্যাপকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমআইএসের প্রতিবেদনেও এই চিত্র দেখা গেছে—ডা. মো. মেহেদী হাসান, সহকারী অধ্যাপক (কার্ডিওলজি), জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০২৩ সময়কালে মোট মৃত্যুর মধ্যে অসংক্রামক রোগ ছিল ৫৭%, সংক্রামক, মাতৃ, নবজাতক ও অপুষ্টিজনিত রোগ ছিল ২৭% এবং আঘাতজনিত কারণ ছিল ৬%। অবশিষ্ট ৯% মৃত্যুর ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে রয়েছে অস্পষ্ট (৫%) অথবা অকার্যকর আইসিডি কোডের (৪%) ব্যবহার। ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংক্রামক এবং অসংক্রামক মৃত্যুর অনুপাত ২০১৯ সালে ২.৩ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ২.৬-এ উন্নীত হয়েছে, যা অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান প্রাধান্য নির্দেশ করে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতি বছর স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ৪৫ শতাংশেরও বেশি মৃত্যুকে শীর্ষ ১০টি কারণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। এর মধ্যে হৃৎপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়াজনিত রোগ (হৃদরোগ) এবং মস্তিষ্কের রক্তনালিজনিত রোগ (স্ট্রোক) বরাবরই মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে অবস্থান করছে। আঘাতজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। মহামারিকাল ব্যতীত অন্যান্য বছরগুলোতে অসংক্রামক রোগজনিত মৃত্যু মোট মৃত্যুর ৬০ শতাংশেরও বেশি ছিল, যা দেশের রোগপ্রবণতার ধরণে সুস্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষত, ২০২৩ সালে ১৫-৪০ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর অকাল অসংক্রামক রোগজনিত মৃত্যু মোট অসংক্রামক রোগজনিত মৃত্যুর ৪০ শতাংশেরও বেশি ছিল, যা তুলনামূলক বেশি এবং উদ্বেগজনক।
তথ্য বলছে, চিকিৎসক কর্তৃক প্রত্যয়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মোট মৃত্যুর ৫৫ শতাংশেরও বেশি অসংক্রামক রোগজনিত, যার মধ্যে আবার ৬২ শতাংশ (২ লক্ষ ৫ হাজার ৪০৩) মৃত্যুর জন্য হৃদরোগ ও রক্তনালিজনিত রোগ দায়ী। এর পরেই রয়েছে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ১১ শতাংশ দখল করে আছে। এছাড়া মূত্র ও প্রজননতন্ত্রের রোগে মারা যান প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ। পাচনতন্ত্রের রোগ, ডায়াবেটিস এবং ক্যানসার বা ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের প্রতিটিতে পৃথকভাবে প্রায় ৫ শতাংশ করে মানুষের মৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে এন্ডোক্রাইন বা হরমোনজনিত ব্যাধি এবং স্নায়ু-মানসিক রোগের কারণে প্রতিটিতে ২ শতাংশ করে রোগী মারা যান। এছাড়া জন্মগত ত্রুটির কারণে মৃত্যুর হার প্রায় ১ শতাংশ।
এদিকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যু স্বাস্থ্যসেবা-প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মোট মৃত্যুর ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে বিশাল একটি অংশ (মোট মৃত্যুর ১৭ শতাংশ) ঘটেছে এক বছরের কম বয়সে। গবেষণা প্রতিবেদনে এর প্রধান কারণ হিসেবে প্রসবকালীন ও জন্ম-পরবর্তী সময়ের জটিলতাগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে জন্মকালীন শ্বাসকষ্ট ও জন্মজনিত আঘাত, নির্ধারিত সময়ের আগে শিশুর জন্ম ও জন্মের সময় ওজন কম হওয়া এবং অন্যান্য প্রসবকালীন অবস্থা বরাবরের মত প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষ করে ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে আঘাত একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারীদের সামগ্রিক নথিভুক্তি কম হলেও ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত ডেটা দেখলে বোঝা যায় এই বয়সে ‘ফিমেল ডেথ’ কিছুটা বেশি। কারণ, রিপ্রোডাক্টিভ এজ বা বয়সে যখন মেয়েরা থাকে, তখন ডেলিভারির সময় তাদের হাসপাতালে বেশি নেওয়া হয়। হাসপাতালে বেশি যাওয়ার কারণে ওই সময়ে তাদের ডেটা ও রিপোর্টিংটা বেশি আসছে। কিন্তু যেসব বয়স্ক মহিলা আছেন, তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার হার কম। তারা যে কম মারা যাচ্ছেন তা না, কিন্তু হাসপাতালে না নেওয়ার ফলে রিপোর্টিং কম হচ্ছে, তাই খাতায়-কলমে মৃত্যুর সংখ্যাও কম দেখাচ্ছে— ডা. তাজরীন আহমেদ, এমআইএস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
অপরদিকে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মৃত্যুর তুলনায় মাতৃমৃত্যুর অনুপাত ১৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একে একটি একটি ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত হিসেবে মনে করছেন গবেষকরা। তবে বলছেন, ২০২০ সালের পর এ অনুপাত মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মাতৃমৃত্যুর সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা বা হাইপারটেনসিভ ডিসঅর্ডার। এর ফলে প্রায় ২৯ শতাংশ গর্ভবতী বা প্রসূতি নারীর মৃত্যু ঘটে। এর পরেই রয়েছে মাতৃত্বকালীন রক্তক্ষরণ (১৪ শতাংশ), গর্ভপাতজনিত জটিলতা (৪ শতাংশ), মাতৃত্বকালীন সেপসিস বা সংক্রামক ব্যাধি (২ শতাংশ) এবং বাধাগ্রস্ত প্রসব বা জটিল প্রসববেদনা (২ শতাংশ)। বাকি ৪৯ শতাংশ মাতৃমৃত্যুই তালিকাভুক্ত হয়েছে ‘অন্যান্য মাতৃজনিত অবস্থা’ হিসেবে। ফলে নির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিতকরণ ও লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে বলে মত গবেষকদের।
যা বলছেন গবেষক-বিশেষজ্ঞরা
প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস শাখার কর্মকর্তা ডা. তাজরীন আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হাসপাতালের ডেটা অনুযায়ী দেখা গেছে নারীরা কম মারা যাচ্ছে, আর পুরুষরা বেশি মারা যাচ্ছে। তবে এমন কোনো বায়োলজিক্যাল কারণ তো নাই যে নারীরা কম মারা যাবে আর পুরুষরা বেশি। মূলত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া বা ভর্তি হওয়ার প্রবণতা মহিলাদের ক্ষেত্রে কম, পুরুষদের বেশি।
তিনি বলেন, নারীদের সামগ্রিক নথিভুক্তি কম হলেও ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত ডেটা দেখলে বোঝা যায় এই বয়সে ‘ফিমেল ডেথ’ কিছুটা বেশি। কারণ, রিপ্রোডাক্টিভ এজ বা বয়সে যখন মেয়েরা থাকে, তখন ডেলিভারির সময় তাদের হাসপাতালে বেশি নেওয়া হয়। হাসপাতালে বেশি যাওয়ার কারণে ওই সময়ে তাদের ডেটা ও রিপোর্টিংটা বেশি আসছে। কিন্তু যেসব বয়স্ক মহিলা আছেন, তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার হার কম। তারা যে কম মারা যাচ্ছেন তা না, কিন্তু হাসপাতালে না নেওয়ার ফলে রিপোর্টিং কম হচ্ছে, তাই খাতায়-কলমে মৃত্যুর সংখ্যাও কম দেখাচ্ছে। মূলত মহিলাদের যাদের বয়স বেশি, তাদের তো আসলে ‘ডিপেন্ডেন্সি’ বেশি। তাদেরকে হয়তো সেভাবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না। বাড়িতেই মৃত্যু হচ্ছে এবং নথিভুক্তির বাইরে থাকছে।
ডা. তাজরীন আহমেদ আরও বলেন, অসংক্রামক রোগের উচ্চহার দেখা গেলেও কমিউনিকেবল ডিজিজ (সংক্রামক রোগ) কিন্তু বাংলাদেশ থেকে এখনো একদম কমে যায়নি। বাংলাদেশ এখনো ডাবল বার্ডেনেই আছে। সংক্রামক ও অসংক্রামক—দুই ধরনের রোগই বেশি, শুধু বয়সভেদে পার্থক্যটা তৈরি হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে কমিউনিকেবল ডিজিজে বেশি মারা যাচ্ছে বাচ্চারা, আর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজে মারা যাচ্ছে বয়স্ক বা এডাল্টরা।
কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদরোগ ও রক্তনালিজনিত রোগে মৃত্যুর উচ্চহার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (কার্ডিওলজি) ডা. মো. মেহেদী হাসান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হৃদরোগে এখন সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে এর অন্যতম প্রধান কারণ অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। তরুণ থেকে বৃদ্ধ—সবার লাইফস্টাইল বদলে গেছে। এজন্য হৃদরোগ থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বিকল্প নেই। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, মানসিক চাপ—এসবও হৃদরোগের বড় কারণ।
লাইফস্টাইল বদলে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তরুণ বয়সে যে পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম করার কথা, ঠিক সে পরিমাণ পরিশ্রম তারা করছে না। পাশাপাশি একটা খাদ্যাভ্যাস বড় ভূমিকা রাখছে। এখনকার তরুণ প্রজন্ম প্রচুর পরিমাণে ফাস্টফুড, জাঙ্ক ফুড, কোমল পানীয়, বিরিয়ানি বা তৈলাক্ত খাবারের দিকে বেশি ঝুঁকছে; বাসায় তৈরি শাকসবজি, মাছ, ডাল বা সুষম খাবারের প্রবণতা কমে গেছে। এছাড়া ধূমপান, অ্যালকোহল বা বিভিন্ন ক্ষতিকর ট্যাবলেটের আসক্তি এবং শারীরিক পরিশ্রম না করার অভ্যাস—সবগুলো মিলেই ঝুঁকি বাড়াচ্ছি।
এই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, আগে হৃদরোগ কিংবা হার্ট অ্যাটাককে শুধুমাত্র বয়স্কদের রোগ হিসেবেই চিন্তা করা হতো। কিন্তু অতি সম্প্রতি আমরা যে প্রবণতা লক্ষ্য করছি, এটা শুধুমাত্র যে বয়স্কদের আক্রান্ত করছে এরকম না। যারা তুলনামূলক তরুণ—বয়স ৪০ কিংবা ৪৫—বিশেষ করে আমাদের এই ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের দেশগুলোতে তরুণরাও বেশ ব্যাপকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমআইএসের প্রতিবেদনেও এই চিত্র দেখা গেছে।
একগুচ্ছ সুপারিশ
গবেষকণা প্রতিবেদনে মৃত্যু হ্রাসের জন্য বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে অসংক্রামক রোগের বোঝা মোকাবিলায় হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ প্রতিরোধে লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং, রোগনির্ণয় ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধি, হঠাৎ সংঘটিত হৃদযন্ত্র ও রক্তনালিজনিত গুরুতর জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে দ্রুত সাড়া প্রদানের ব্যবস্থা শক্তিশালী করে মৃত্যুহার কমানো এবং কৃষি, শিক্ষা ও নগর পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন খাতের সমন্বয়ে বহুখাতভিত্তিক অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ নীতি বাস্তবায়ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে জন্মকালীন শ্বাসরোধ ও জন্মজনিত আঘাত প্রতিরোধে প্রসবকালীন ও প্রসবোত্তর সেবার মান উন্নয়ন, অপরিপক্ব জন্মজনিত জটিলতা মোকাবিলায় নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা (এনআইসিইউ) সেবার সম্প্রসারণ, গর্ভাবস্থাজনিত উচ্চ রক্তচাপসহ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা শনাক্তকরণে প্রসবপূর্ব স্ক্রিনিং জোরদার এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রক্তব্যাংক সেবা এবং জরুরি প্রসূতি সেবা আরও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।
একইভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক শক্তিশালীকরণের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। সুপারিশে বলা হয়েছে, নারীদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাসমূহ চিহ্নিত ও দূরীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মৃত্যুর তথ্যের প্রতিনিধিত্বশীলতা বৃদ্ধির জন্য এমসিসিডি ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ, মৃত্যুর তথ্য ও রোগতাত্ত্বিক তথ্য সমন্বিত করে একটি সমন্বিত রোগ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ ছাড়া তথ্যের গুণগত মান উন্নয়নেও বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।