এএসপি মুহাম্মদ জাবেদ ওরফে ডা. জাভেদ আহমেদ © টিডিসি সম্পাদিত
টেন্ডারবাজি এবং মানহীন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়া দালালচক্রের হাতে জিম্মি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল। তাদের অন্যায্য দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানানোয় হুমকির শিকার হচ্ছেন খোদ হাসপাতাল পরিচালক-উপপরিচালকও। ৫ আগস্টের পর থেকে চলে আসা এসব ঘটনার নেপথ্যে রয়েছেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার নাম মুহাম্মদ জাবেদ। তিনি ২৯তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি)। একই সাথে তিনি বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তবে দুটি ক্ষেত্রে তার ভিন্ন ভিন্ন নাম ও পরিচয় ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তার নেতৃত্বে বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তারা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এতে জড়িতরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আর প্রকৃত অর্থে হয়রানির শিকার হচ্ছেন গরীব-অসহায় রোগীরা।
টেন্ডারবাজি ও দালালচক্র
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে আওয়ামীপন্থী বেশ কয়েকটি গ্রুপ টেন্ডারবাজিতে জড়িত ছিল। একই সাথে হাসপাতাল ও আশেপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাঁদা তুলত চক্রগুলো। ৫ আগস্টের পর এসবের নিয়ন্ত্রণ নেন ডা. জাবেদ। তার সঙ্গে ছাত্রদলের সাবেক বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীও যুক্ত হন। সরকারের দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও তাদের নাম উঠে এসেছে।
চিকিৎসক-কর্মকর্তারা বলছেন, আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকেই বেশকিছু চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী এবং বহিরাগত একটি সংঘবদ্ধ চক্র যে যার মতো করে অন্যায় সুবিধা নেওয়ার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। আওয়ামী আমলে বঞ্চিতদের সাথে সাথে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ে যুক্ত হয় চক্রটি। এতে ঢাকা মেডিকেলের ব্যবস্থাপনায় ভীষণ চাপ সৃষ্টি হয়। এদের মধ্যে অন্যতম ডা. জাবেদ।
৫ আগস্টের পর থেকে হাসপাতালের সমস্ত টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন ডা. জাবেদ। তার সুবিধার জন্য আমার বিশ্বস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করে যাচ্ছেন। আমি এতে বাধা দেওয়ার কারণে তার অনুসারীরা আমার কক্ষে মব করেছেন— ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামান, পরিচালক, ঢামেক হাসপাতাল (বদলি প্রক্রিয়াধীন)
তাদের অভিযোগ, ডা. জাবেদ নামসর্বস্ব ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অনেকের কাছ থেকেই অগ্রীম অর্থ হাতিয়ে নেন। তবে ঢাকা মেডিকেলে ই-জিপি সিস্টেমে (অনলাইন) টেন্ডার পরিচালিত হওয়ায় এসব সুযোগ হাতছাড়া হয়। বিশেষ করে হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. আসাদুজ্জামান (বর্তমানে যশোর আর্মি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ পদে বদলি প্রক্রিয়াধীন) এতে বাধা দিলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে।
ঢামেকের প্রশাসনিক একটি সূত্র বলছে, ডা. জাবেদ দলবল নিয়ে বিভিন্ন সময় হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষে ‘মব’ সৃষ্টির মাধ্যমে তার সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে শক্তি বৃদ্ধির জন্য দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে নিজের অনুগামী বেশ কিছু চিকিৎসক-কর্মকর্তাকে ঢাকা মেডিকেলের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আসেন। এসব চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন প্যাথলজি এবং ক্লিনিকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন, যা প্রতি মাসে কয়েক লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি মাধ্যম। পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর তার এসব ‘অপকর্মের’ মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
ঢাকা মেডিকেলে টেন্ডারবাজি নিয়ে যা আছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অনিয়ম ও টেন্ডারবাজি নিয়ে তদন্ত করে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এর মধ্যে দুটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্রতিবেদন তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের কাছে উপস্থাপন করা হয়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ডা. জাবেদের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজনের নাম উঠে আসে। তারা হলেন—ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. মাহমুদুল হাসান খান সুমন, ঢামেক ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. বিপ্লব, কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সহ-সভাপতি মারুফ হাসান রনি, তিতুমীর কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মাসুদ এবং চকবাজার থানা জাতীয়তাবাদী তরুণ দলের সাধারণ সম্পাদক মেজবাউদ্দীন সিফাত।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের ১৫ মার্চ দুপুর আড়াইটার দিকে হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষে প্রবেশ করেন ডা. জাবেদ। তার সঙ্গে ছিলেন ডা. সুমন। এ সময় তারা তাদের পছন্দের কোম্পানিগুলোর পক্ষে টেন্ডার দিতে তদবির করেন। পরিচালক তাতে অসম্মত জানান। পরে ২৬ মার্চ উপ-পরিচালক আশরাফুল ইসলামকে হোয়াটসঅ্যাপে নক দেন ডা. জাবেদ। ওই সময়ও তিনি পছন্দের কোম্পানিগুলোকে টেন্ডার দিতে সহায়তা করার দাবি জানান। তবে উপ-পরিচালকও অসম্মতি জানালে তাকে হুমকি দেওয়া হয়।
এতে আরও বলা হয়, নিয়ম অনুযায়ী ই-জিপিতে কোম্পানিগুলো তাদের প্রাইস রেটিং দিয়ে টেন্ডার ড্রপ করবে। কিন্তু নিয়মবহির্ভূত পন্থায় ডা. জাবেদরা পজিশনে অপেক্ষাকৃত দূরে থাকা কোম্পানিগুলোকে টেন্ডার দিতে বারবার হাসপাতাল প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করেন। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২৭ মার্চ ডা. জাবেদ হাসপাতাল উপ-পরিচালককে জোয়ারিয়া ইন্টারন্যাশনাল (সাপ্লাই আইটেম-গল ব্যান্ডেজ, টেন্ডার পজিশন-৭) নামক একটি কোম্পানিকে টেন্ডার পজিশনে দূরে থাকা সত্ত্বেও টেন্ডার দিতে হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি প্রদান করেন।
আরও পড়ুন: রেডিওথেরাপির সিরিয়াল সাড়ে ৭ হাজার, অনেকের চিকিৎসা মিলবে ২০২৮ সালে
ওই সময় ডা. জাবেদ অন্তত ৪টি কোম্পানিকে টেন্ডার আদায়ে তদবির করেন এবং তা না হওয়ায় পরিচালক-উপপরিচালককে হুমকি প্রদান করেন। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—মক্কা ট্রেডার্স (লাইট মেডিকেল ইন্সট্রোমেন্ট, পজিশন-৫), তিশা এন্ট্রারপ্রাইজ (এমএসআর ফার্নিচার, পজিশন-১), মার্ক লিমিটেড (মাল্টি প্যারামিটার প্যাসেন্ট মনিটর, পজিশন-৪), সিসমার্ক লিমিটেড (সাইরিং পাম্প, পজিশন-১৫) এবং সিসমার্ক লিমিটেড (ডিফিব্রিলেটর, পজিশন-৪)।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-২ সংলগ্ন চানখারপুলে ‘প্রাইম টিজি ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামে একটি প্যাথলজি ক্লিনিক গড়ে ওঠে, যার সত্ত্বাধিকারী ডা. জাবেদ, ডা. মনির এবং ডা. সুমন। এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ম্যানেজার ও মার্কেটিং ম্যানেজার তার দালালদের সাহায্যে ঢাকা মেডিকেলকেন্দ্রিক অন্যান্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালদের প্রকাশ্যে মারধর করে এবং অন্য ক্লিনিকে রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করার হুমকি প্রদান করে। এমনকি ঢাকা মেডিকেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও কর্মচারীদেরও প্রকাশ্যে হুমকি প্রদান করা হয়, যেন তারা তাদের রোগী কেবল প্রাইম টিজিতে পাঠান।
জাবেদ ভাই অবশ্যই ড্যাবের একজন লোক। যদিও এখানে একটু বিতর্ক আছে, কারণ জাবেদ ভাই সম্প্রতি পুলিশে জয়েন করছে। পুলিশে জয়েন করলে আর ও ড্যাবে থাকতে পারে কি না তাও আমার জানা নাই, এটা সেন্ট্রাল ঠিক করবে— ডা. মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক, ড্যাব ঢাকা মেডিকেল কলেজ
প্রতিবেদনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসব ‘টেন্ডারবাজ ও আধিপত্য বিস্তারকারীদের’ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনী ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্টদের সাংগঠনিকভাবে দলীয় হাইকমান্ড থেকে সতর্ক ও শোকজ করার সুপারিশ করা হয়।
হাসপাতালের কক্ষে ‘মব’ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ
ডা. জাবেদের মাধ্যমে ঢাকা মেডিকেলের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলিকে ঘিরে প্রতিষ্ঠানটি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গত আগস্টে। সপ্তাহব্যাপী উত্তপ্ত পরিস্থিতির পর ১১ আগস্ট হাসপাতাল পরিচালককে অবরুদ্ধ করেন ডা. জাবেদের অনুসারীরা। পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. আসাদুজ্জামান অন্তত আড়াই ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন সেদিন।
তথ্য বলছে, গত ২৮ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ঢামেক হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রেজাউল ইসলামকে বদলি করা হয়। তার পরিবর্তে এখানে পদায়ন করা হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাম্মেল হককে, যিনি ডা. জাবেদের অনুসারী ছিলেন। অপরদিকে রেজাউল ছিলেন পরিচালকের বিশ্বস্ত কর্মচারী। এ ঘটনায় রেজাউলের বদলি আদেশ স্থগিতে ভূমিকা রাখেন হাসপাতাল পরিচালক। এ নিয়ে দু পক্ষে উত্তেজনা তৈরি হয়।
এর জেরে ১১ আগস্ট ডা. জাবেদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত সার্জারি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. অভি, ডা. নজরুল, ইউরোলজির ডা. আসাদ, ডা. নাহিদ এবং ঢামেকের ৭৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের বর্তমান সদস্য সচিব ডা. মিশকাতের নেতৃত্বে একদল চিকিৎসক প্রশাসনিক ভবনে অবস্থান নেন।
ওই সময় প্রত্যক্ষদর্শীরা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছিলেন, ঘটনার এক পর্যায়ে ওই চিকিৎসকরা প্রশাসনিক কর্মকর্তার কক্ষ তালাবদ্ধ করতে গেলে মো. হানিফ ভূঁইয়া নামে এক কর্মচারীর সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় হানিফকে মারধর করেন তারা। পরে অন্যান্য কর্মচারীরা ঘটনাস্থলে এলে উভয় পক্ষে মারামারি শুরু হয়। এতে ডা. আব্দুর রাজ্জাক, ডা. দিগন্ত হক ও ডা. আলফাজ হোসেন শিহাব মারধরের শিকার হন। পরে তৎকালীন স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর উপস্থিতিতে এর ‘সমাধান’ হয়।
আরও পড়ুন: সারদায় এএসপি, ঢামেকে ড্যাব নেতা—পরিচালকের রুমে অনুসারীদের ‘মব’
এ বিষয়ে ওই সময় হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. আসাদুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেছিলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে হাসপাতালের সমস্ত টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন ডা. জাবেদ। তার সুবিধার জন্য আমার বিশ্বস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করে যাচ্ছেন। আমি এতে বাধা দেওয়ার কারণে তার অনুসারীরা আমার কক্ষে মব করেছেন।’
সম্প্রতি অপর এক ঘটনা প্রসঙ্গে পরিচালক একই দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘টেন্ডারবাজি করতে না পেরে ডা. জাবেদের অনুসারীরা আমার সম্মানহানির চেষ্টা করছেন।’
একই অভিযোগ ঢাকা মেডিকেল কলেজ ড্যাবের সভাপতি ডা. রেজোয়ানুর রহমান সোহেলের। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর ঢাকা মেডিকেলে টেন্ডার বাণিজ্যের সাথে ডা. জাবেদের জড়িত থাকার তথ্য বেশ কয়েকবার পেয়েছি। টেন্ডার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং রোগী ভাগানো নিয়ে যত গোয়েন্দা প্রতিবেদন, পেপার-পত্রিকার প্রতিবেদন, সবগুলোতে ঘুরেফিরে জাবেদ, অভি, রিয়াদদের নাম। এটা নিয়ে আমরা বিব্রত।
হাসপাতালের কক্ষে মবের প্রসঙ্গ তুলে তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল পরিচালক মাঝে মাঝে দালালবিরোধী অভিযান চালান। তিনি টেন্ডারবাণিজ্য এবং চাঁদাবাজি নিয়েও কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। এসব কারণে তার বিরুদ্ধে ডা. জাবেদ তৎপর হয়েছেন। তা না হলে ডাক্তাররা ডাক্তারদের বদলি নিয়ে কনসার্ন থাকবে, একজন ডাক্তার চতুর্থ শ্রেণীর একজন কর্মচারীর বদলি নিয়ে কেন মারামারি করতে যাবে?
নাম নিয়ে আয়নাবাজি, চিকিৎসক পরিচয় দিলেও নেই বিএমডিসি নম্বর
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডা. জাবেদ ১৯৯৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। পরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতিও নির্বাচিত হন। একই সাথে যুক্ত হন ছাত্রদলের রাজনীতিতেও। ছাত্রদলের ঢাকা মেডিকেল কলেজ সভাপতি ও পরে কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি পদেও ছিলেন তিনি।
ড্যাব একটি পেশাজীবী সংগঠন। এখানে যে কেউ আসতে পারেন। যদি পুলিশে এমন কোনো বিধি থাকে যে তারা এরকম কোনো সংগঠনে যুক্ত হতে পারবে না, সেটি একটি বিষয়। তবে আমার জানা নেই যে পুলিশে এমন কোনো নিয়ম আছে কিনা— ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, মহাসচিব, ড্যাব
ঢাকা মেডিকেল কলেজের রেজিস্ট্রেশন বহি যাচাই করে দেখা গেছে, ভর্তির সময় তার নাম লেখা ছিল মুহাম্মদ জাবেদ। পিএসসির বিজ্ঞপ্তি এবং পুলিশ রেকর্ডেও তার নাম মুহাম্মদ জাবেদ লেখা। কিন্তু বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের রেকর্ডে তার নাম ডা. জাভেদ আহমেদ। তবে পুলিশের অফিসার্স ডিরেক্টরিতে আবার ‘মুহাম্মদ জাবেদ আহমেদ’ উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া চলতি বছরের ২৭ আগস্ট হালনাগাদকৃত ঢাকা মেডিকেল কলেজ ড্যাবের সদস্য তালিকা যাচাই করে দেখা গেছে, এই তালিকার ৫৭৮ জন সাধারণ ও আজীবন সদস্যের সবার নামের পাশে বিএমডিসির (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ থাকলেও একমাত্র ব্যতিক্রম ডা. জাবেদ, তার নামের পাশে বিএমডিসির কোনো রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ নেই। ড্যাবের ডিরেক্টরিতেও একই চিত্র দেখা গেছে। অথচ বিএমডিসি আইন অনুযায়ী, চিকিৎসক পরিচয় কিংবা নামের আগে ডা. প্রিফিক্স ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। রেজিস্ট্রেশন না থাকলে ডাক্তার পদবী ব্যবহার আইনত দণ্ডণীয়।
পুলিশে থেকেও রাজনীতিঘেঁষা পেশাজাবী সংগঠনে ডা. জাবেদ
নথিপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, ২০১১ সালের ২১ মার্চ ২৭তম বিসিএসে এএসপি হিসেবে ডা. জাবেদের নামে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। ওই সময় তিনি বিসিএসে যোগ দিলেও নিয়মানুযায়ী প্রশিক্ষণে যোগ দেননি। পরে তার নামে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা দায়ের হয়। তবে ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর জারি করা এক গেজেটে এই বিভাগীয় মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
পরে তিনি এএসপি হিসেবে পুনরায় যোগদান করেন এবং সারদায় প্রশিক্ষণে অংশ নেন। গত আগস্টে তার প্রশিক্ষণ শেষ হয়। তবে এরই মধ্যে গত বছরের অক্টোবরে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পান তিনি। বর্তমানে সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) পদে রয়েছেন। প্রশিক্ষণে থাকা অবস্থায় গত ৮ আগস্ট ড্যাবের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। এদিকে ড্যাব কাগজে-কলমে বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন না হলেও এর সকল নির্দেশনা আসে বিএনপির হাইকমান্ড থেকে।
এ অবস্থায় ডা. জাবেদের ড্যাব পরিচয় এবং পুলিশ ক্যাডারে থাকা নিয়ে বিভ্রান্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ ড্যাবের সাধারণ সম্পাদক। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘জাবেদ ভাই অবশ্যই ড্যাবের একজন লোক। যদিও এখানে একটু বিতর্ক আছে, কারণ জাবেদ ভাই সম্প্রতি পুলিশে জয়েন করছে। পুলিশে জয়েন করলে আর ড্যাবে থাকতে পারে কি না তাও আমার জানা নাই, এটা সেন্ট্রাল ঠিক করবে।’
সকল অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তা অস্বীকার করেন এএসপি ডা. মুহাম্মদ জাবেদ। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ইনফরমেশনগুলো সবই অসত্য এবং ভুয়া।’ একই সাথে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব দেননি। এ ছাড়া সংবাদ প্রকাশ হলে এই প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে কল কেটে দেন তিনি।
জানতে চাইলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ডা. জাবেদের বিষয়ে এসব অভিযোগের কথা শুনেছি। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। পাওয়া গেলে আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিব।
পুলিশ কর্মকর্তা হয়েও ড্যাবের সঙ্গে যুক্ত কীভাবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ড্যাব একটি পেশাজীবী সংগঠন। এখানে যে কেউ আসতে পারেন। যদি পুলিশে এমন কোনো বিধি থাকে যে তারা এরকম কোনো সংগঠনে যুক্ত হতে পারবে না, সেটি একটি বিষয়। তবে আমার জানা নেই যে পুলিশে এমন কোনো নিয়ম আছে কিনা। একই সাথে ড্যাব একটি অরাজনৈতিক পেশাজীবী সংগঠন বলেও দাবি করেন মহাসচিব।
এদিকে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ২৫(১) অনুযায়ী, কোন সরকারি কর্মচারী কোন রাজনৈতিক দলের বা রাজনৈতিক দলের কোন অঙ্গ সংগঠনের সদস্য হতে অথবা অন্য কোনভাবে তার সাথে যুক্ত হতে পারবেন না, অথবা বাংলাদেশ বা বিদেশে কোন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে বা কোন প্রকারে সহায়তা করতে পারবেন না।
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পিআর বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী কোন সরকারি কর্মকর্তা কোন রাজনৈতিক সংগঠন অথবা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে থাকতে পারবে না। এটি কেউ ভঙ্গ করলে অবশ্যই বিভাগীয় বিধি মোতাবেক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা মেডিকেলে টেন্ডারবাজি ও ডা. জাবেদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল এবং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তারা কল রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের অপর এক এআইজি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সুনিদিষ্ট অভিযোগ পেলে বিভাগীয় বিধি মোতাবেক তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।