সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল
ধারণক্ষমতার দুই-তিনগুণ রোগী
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল © সংগৃহীত
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তীব্র সংকট নিয়েই চলছে শিশু ও নবজাতকের চিকিৎসা। দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভেঙে প্রতিষ্ঠানটিতে চার শয্যার শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (পিআইসিইউ) চালু করা হলেও পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে পূর্ণাঙ্গ সুফল মিলছে না। নবজাতকের আইসিইউ সংখ্যা ১২টি হলেও ভেন্টিলেশন সাপোর্ট মেলে মাত্র ৩টিতে। আর দুই বিভাগেই ভর্তি থাকছে ধারণক্ষমতার দুই থেকে তিনগুণ রোগী।
রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটির ১৩৫০ শয্যার। কিন্ত এতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০০ রোগী ভর্তি থাকেন। সবচেয়ে বেশি রোগী দেখা যায় শিশু এবং গাইনি বিভাগে।
চিকিৎসকরা বলছেন, নানা সংকটের মধ্যেও সাধ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করছেন তারা। বলছেন, সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র মূল্যে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় বলেই সাধারণ মানুষ এখানে ভিড় জমায়। সবার ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই যত কষ্টই হোক, এই সীমিত সম্পদের মধ্যেই গাদাগাদি করে সেবা দিয়ে যেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
সীমিত সংখ্যার এনআইসিইউ, তাতেও সংকট ভেন্টিলেটরের
নিওনেটোলজি বিভাগে ১ থেকে ২৮ দিন বয়সী শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট বা স্ক্যানুর ২৪ এবং নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (এনআইসিইউ) ১২টি মিলিয়ে এই বিভাগে মোট শয্যা রয়েছে ৩৬টি। এর মধ্যে ১২ শয্যার আইসিইউতে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট রয়েছে মাত্র তিনটি। এই তিনটি ভেন্টিলেটর মেশিনে সি-প্যাপ যুক্ত থাকায় সব মিলিয়ে ৫টি শয্যায় সি-প্যাপ সেবা দেওয়া যায়।
১২টা রোগীর জন্য ১২টা ভেন্টিলেটরই রেডি থাকার নিয়ম। যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো রোগীর এমার্জেন্সি হতে পারে। কিন্তু সংকট থাকার কারণে তখন আমাদের রিফিউজ করতে হয় এবং আমরা রোগী রেফার করতে বাধ্য হই যে আপনি এখন শিশু হাসপাতালে চলে যান বা ঢাকা মেডিকেলে যান —অধ্যাপক ডা. মো. রকিবুল হক খান, বিভাগীয় প্রধান, নিওনেটোলজি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ
বিভাগের একজন চিকিৎসক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নিওনেটোলজি বিভাগেও সব সময় ধারণক্ষমতার বেশি রোগী থাকে। এখানে ভেন্টিলেটর ও আইসিইউর মারাত্মক সংকট রয়েছে। এনআইসিইউর কথা যদি বলি, খাতায়-কলমে ১০টির ওপর বেড দেখানো হলেও প্রোপারলি কার্যকর এনআইসিইউ বলতে যা বোঝায়, তা আসলে নেই। এখানে মূলত যেসব মেশিন আছে, সেগুলো জন্ডিসে আক্রান্ত বাচ্চাদের ফটোথেরাপির কাজে ব্যবহার করা হয়।
এই চিকিৎসক আরও বলেন, পুরো এনআইসিইউতে বর্তমানে মাত্র দুটি থেকে তিনটি ভেন্টিলেটর মেশিন কার্যকর আছে। অথচ প্রতিদিন আমাদের কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের সাপোর্ট প্রয়োজন এমন বাচ্চার সংখ্যা থাকে গড়ে ৫০টিরও বেশি। মাত্র দু-তিনটি ভেন্টিলেটর দিয়ে তো এত বিশাল চাহিদা মেটানো সম্ভব না। তাই যাদের জরুরি ভেন্টিলেশন প্রয়োজন হয়, তাদের আমাদের কাছে রাখার উপায় থাকে না। বাধ্য হয়ে পেশেন্টদের ঢাকা শিশু হাসপাতাল বা ঢাকা মেডিকেলের মতো অন্যান্য জায়গায় পাঠিয়ে দিতে হয়।
সংকটের কথা জানালেন নিওনেটোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. রকিবুল হক খানও। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, আমাদের বিভাগে খাতায়-কলমে মোট ৩৬টি শয্যা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন গড়ে ৫২ থেকে ৬০ জন রোগী ভর্তি থাকে। স্বাভাবিকভাবেই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী থাকায় বাধ্য হয়ে এক বেডে দুজন করে নবজাতককে রাখতে হচ্ছে।
আইসিইউতে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট এবং সি-প্যাপ সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ভেন্টিলেটরগুলোতে সি-প্যাপ মোড ব্যবহার করার সুযোগ থাকায় আমরা একসাথে ৫টি রোগীকে সি-প্যাপ সাপোর্ট এবং ৩টিকে পূর্ণাঙ্গ ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দিতে পারি। তবে মাঝে মাঝে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে যন্ত্র মেরামত করে নিতে হয়। সব মিলিয়ে একটু ক্রাইসিস হয়ই, কারণ আমার ১২টা রোগীর জন্য ১২টা ভেন্টিলেটরই রেডি থাকার নিয়ম।
যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো রোগীর এমার্জেন্সি হতে পারে। কিন্তু সংকট থাকার কারণে তখন আমাদের রিফিউজ করতে হয় এবং আমরা রোগী রেফার করতে বাধ্য হই যে আপনি এখন শিশু হাসপাতালে চলে যান বা ঢাকা মেডিকেলে যান। মানে ভেন্টিলেটর লাগছে কিন্তু এখন আমার এভেলেবল নাই, তখন পাঠাতে বাধ্য হই।
এক শয্যায় তিন শিশু, উদ্বোধন হলেও ‘অর্ধেক’ কার্যকর পিআইসিইউ
পেডিয়াট্রিক্স বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে অনুমোদিত শয্যা সংখ্যা ১০০টি। তবে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ শিশু এখানে ভর্তি থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কম বয়সী শিশুদের একেক বেডে দুই থেকে তিনজনকে রাখা হয়। এর বাইরে ফ্লোর এবং বারান্দাতেও ভর্তি থাকে শিশুরা। সম্প্রতি শিশু বিভাগে ৪ শয্যার একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (পিআইসিইউ) স্থাপন করা হয়েছে। তবে জনবল সংকটের কারণে মাত্র দুটি শয্যা সচল করা সম্ভব হয়েছে।
এটা সত্য যে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, বিশেষ করে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট বা সিভিয়ার কেসের ক্ষেত্রে রোগীদের অন্য হাসপাতালে রেফার করার প্রয়োজন পড়ে। তবে এই সীমাবদ্ধতাগুলো আমরা আস্তে আস্তে ওভারকাম করার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া একটি বেডে একাধিক শিশুকে রাখতে হচ্ছে। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হলেও তারা যেন চিকিৎসাটা ঠিকমতো পায়, আমরা সেদিকে প্রাধান্য দিচ্ছি। আমরা যদি কঠোরভাবে এক বেডে একজন নীতি মেনে চলি, তবে বিপুল সংখ্যক নতুন রোগীকে ভর্তি নেওয়া একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে —ডা. নন্দদুলাল সাহা, উপ-পরিচালক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, পেডিয়াট্রিক্স বিভাগে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগীর চাপ থাকে। বিভিন্ন ওয়ার্ড মিলিয়ে প্রায় দেড়শটির মতো বেড রয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা এত বেশি থাকে যে, প্রায়ই একটা বেডে তিনজন করে বাচ্চাকে রাখতে হয়। বিশেষ করে এক বছর বয়সী ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়; পাশাপাশি তিনজনকে শুইয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, বয়স একটু বেশি হলে এক বেডে একজনকেই রাখা সম্ভব হয়। সাধারণ বেডের জায়গা না কুলালে ফ্লোরে বা বারান্দাতেও রোগীর জন্য ব্যবস্থা করতে হয়। পেডিয়াট্রিক আইসিইউ (পিআইসিইউ) একেবারেই নতুন, গত দুই মাসের মতো হলো উদ্বোধন করা হয়েছে।
শিশু বিভাগে ভর্তি থাকা এক রোগীর স্বজনের ভাষ্য, এক বেডে দুজন-তিনজন করে বাচ্চাকে রাখা হচ্ছে। এতে তাদের যেমন অসুবিধা হচ্ছে, পর্যাপ্ত স্পেস পাচ্ছে না, তেমনি ভোগান্তি হচ্ছে মায়েদেরও। কারণ একটি বেডে দুই থেকে তিনজন মাকে উপস্থিত থাকতে হচ্ছে। এ ছাড়া জরুরি আইসিইউ প্রয়োজন এমন রোগীদের ভোগান্তি বেশি। আইসিইউর জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে, না হলে অন্য কোনো হাসপাতালে চলে যেতে হচ্ছে।
শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আঈনুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমাদের এই ১৩৫০ বেডের হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ২৫০০ থেকে ৩০০০ রোগী ভর্তি থাকে। এত রোগীর চাপ সামলে জায়গা দেওয়া সত্যিই কঠিন, তাই এক শয্যায় একাধিক রোগীকে চিকিৎসা নিতে হয়। পেডিয়াট্রিক্সেও শয্যা সংখ্যার তুলনায় রোগী অনেক বেশি। ১০০ বেডের বিপরীতে প্রায় ৩০০ জন রোগী ভর্তি থাকে।’
তিনি বলেন, কিছুদিন আগে যখন হামের প্রকোপ ছিল, তখন বাধ্য হয়ে ৩টি ভিন্ন ইউনিটের ওয়ার্ড মিলিয়ে ২০০ বেডের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। অন্য কাজের নির্ধারিত বেড কেটে এনে রোগী সামলাতে হয়েছে, যা পরবর্তীতে আবার অন্যান্য চিকিৎসায় সংকট তৈরি করে। এখন আমরা সেটা কমিয়ে এনেছি।
আরও খবর: ইবিতে অস্ত্র-রামদা হাতে মহড়া, শনাক্ত ১৯ জনই বিএনপি-ছাত্রদল-যুবদলের
অধ্যক্ষ বলেন, শিশু বিভাগের আইসিইউ বা ভেন্টিলেশনের যে সংকটের কথা বলছেন, সেটা একদম সত্যি। প্রকৃতপক্ষে আগে আমাদের ডিপার্টমেন্টেই এই সুবিধাটি ছিল না, আমরা মাত্র গত মাসে এটি চালু করেছি। বলা যায়, আমরা একদম প্রাইমারি লেভেলে সূচনা করেছি। বর্তমানে মাত্র ২টি ভেন্টিলেশন মেশিন দিয়ে কোনোমতে কাজ চালাচ্ছি। আমাদের ৪টি বেড প্রস্তুত থাকলেও মেশিন রয়েছে ২টি। ম্যানপাওয়ার এবং বাড়তি মেশিনের জন্য ইতোমধ্যে আবেদন করা হয়েছে, তবে এটি সময়ের ব্যাপার।
শুধু শিশু বিভাগ নয়, বরং হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক আঈনুল ইসলাম। বলেন, তবে আমরা চাইলেও হঠাৎ করে জায়গা বাড়াতে পারি না, কারণ ভবনটি ৬ তলার ওপরে আর সম্প্রসারণ করা সম্ভব নয় বলে পিডব্লিউডি (গণপূর্ত অধিদপ্তর) এবং বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছে। নতুন ভবন করতে গেলেও সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রায় ৫ বছরের মতো দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। এর স্থায়ী সমাধান হতে পারে যদি গাবতলী বা অন্য কোনো স্থানে নতুন হাসপাতাল নির্মাণ বা বিকল্প ব্যবস্থা দ্রুত করা যায়।
পুরো এনআইসিইউতে বর্তমানে মাত্র দুটি থেকে তিনটি ভেন্টিলেটর মেশিন কার্যকর আছে। অথচ প্রতিদিন আমাদের কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের সাপোর্ট প্রয়োজন এমন বাচ্চার সংখ্যা থাকে গড়ে ৫০টিরও বেশি। মাত্র দু-তিনটি ভেন্টিলেটর দিয়ে তো এত বিশাল চাহিদা মেটানো সম্ভব না। তাই যাদের জরুরি ভেন্টিলেশন প্রয়োজন হয়, তাদের আমাদের কাছে রাখার উপায় থাকে না —নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক
সার্বিক বিষয়ে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. নন্দদুলাল সাহা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এনআইসিইউতে বেড চালু আছে। তবে এটা সত্য যে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, বিশেষ করে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট বা সিভিয়ার কেসের ক্ষেত্রে রোগীদের অন্য হাসপাতালে রেফার করার প্রয়োজন পড়ে। তবে এই সীমাবদ্ধতাগুলো আমরা আস্তে আস্তে ওভারকাম করার চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, একটি বেডে একাধিক শিশুকে রাখতে হচ্ছে। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হলেও তারা যেন চিকিৎসাটা ঠিকমতো পায়, আমরা সেদিকে প্রাধান্য দিচ্ছি। আমরা যদি কঠোরভাবে এক বেডে একজন নীতি মেনে চলি, তবে বিপুল সংখ্যক নতুন রোগীকে ভর্তি নেওয়া একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে।
শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে উপ-পরিচালক বলেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল-২ নামে আরেকটি কমপ্লেক্স বা নতুন বিল্ডিং নির্মাণের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখেছি। তবে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। তা ছাড়া আমাদের বর্তমান অবকাঠামোতে নতুন করে স্পেস বা ফাঁকা জায়গারও বেশ সংকট রয়েছে। এ সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।