ঢাকায় ১ মাস থেকে ১২ বছর বয়সী মুমূর্ষু শিশুদের জন্য পেডিয়াট্রিক আইসিইউ সংখ্যা সামান্য © টিডিসি সম্পাদিত
৬ মাস বয়সি শিশু আফিয়া হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ৯ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। মৃত্যুর আগে তার প্রয়োজন ছিল শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (পিআইসিইউ) একটি শয্যা। দুই দিন ধরে ৪ মেডিকেল কলেজসহ রাজধানীর ৬টি সরকারি হাসপাতাল ঘুরেও একটি শয্যা মেলেনি শিশুটির জন্য। বেসরকারি হাসপাতালে উচ্চমূল্যের পিআইসিইউ সেবা নেওয়ার সামর্থ্য ছিল না বাবা-মার। ফলে শেষ পরিণতি হয় মৃত্যু।
শুধু শিশু আফিয়াই নয়, প্রতিনিয়ত এমন পরিণতি ঘটছে শেষ মুহূর্তের নিবিড় পরিচর্যার জন্য রাজধানীতে আসা শিশুদের। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হেলথে প্রকাশিত ‘বিয়ন্ড ইমিউনিটি গ্যাপস: হেলথ-সিস্টেম কনস্ট্রেইন্টস অ্যান্ড মিজলস মর্টালিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, হামে প্রাণ হারানো ৭১ শতাংশ শিশুরই শেষ মুহূর্তে জীবন রক্ষাকারী আইসিইউ সুবিধা মেলেনি। তাদের হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে।
রাজধানীতে সরকারি পিআইসিইউ মাত্র ৪৩টি
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশু জন্মের পর ২৮ দিন বয়সি শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রকে বলা হয় নিওনেটাল ইনসেনটিভ কেয়ার বা এনআইসিইউ। আর ১ মাস থেকে সাধারণত ১২ বছর বয়সি বা ৫০ কেজির কম ওজনের শিশুদের জন্য প্রয়োজন হয় পেডিয়াট্রিক আইসিইউ বা পিআইসিইউ।
রাজধানীসহ দেশে কতটি পিআিইসিইউ রয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস থেকে পাওয়া যায়নি। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ইলেক্ট্রো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশের সরকারি হাসপাতালে মাত্র এক হাজার ৬২০টি আইসিইউ বেড রয়েছে। এ ছাড়া ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড ক্যাপাসিটি অব বাংলাদেশ: আ প্রি অ্যান্ড পোস্ট কোভিড-১৯ প্যানডেমিক সার্ভে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেডের সংখ্যা ২ হাজার ৮৫৬টি।
পিআইসিইউতে এক মাস থেকে ১২ বছর পর্যন্ত শিশুদের রাখা হয়। তো এই পর্যায়ের রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। সে তুলনায় আসলে পিআইসিইউ নাই। আর অনেকগুলো হাসপাতালে তো একেবারেই নাই। যার ফলে এ ধরনের রোগী ম্যানেজমেন্ট অনেক বেশি কষ্টসাধ্য হয়ে যায়— ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামান, পরিচালক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি আইসিইউ শয্যার সংখ্যা বর্তমানে বেড়ে ৩ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে। আর এসব শয্যার প্রায় ২৫ শতাংশ এনআইসিইউ হলেও পিআইসিউ শয্যা মাত্র ৩ শতাংশ। বাকি শয্যা পূর্ণবয়স্কদের জন্য।
রাজধানী ঢাকায় চারটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় ২৫টি বড় জেনারেল ও বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কয়টিতে শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র আছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য এমআইএসে নেই। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মধ্যে মাত্র তিনটি সরকারি হাসপাতালে পিআইসিইউ রয়েছে—ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। তবে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটটি পুরোপুরি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সরকারি বিধিবদ্ধ, তবে সায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান।
আরও পড়ুন: কান্না করায় সন্তানকে হত্যাচেষ্টা বাবার, ৭০০ টাকা নিয়ে ঢামেকে আইসিইউর সামনে কাঁদছেন মা
পিআইসিইউ সেবা থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শয্যা সংখ্যা অতি সামান্য। তথ্য বলছে, ঢামেক হাসপাতালে ১৭টি, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ১৬টি এবং মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পিআইসিইউ শয্যা রয়েছে ১০টি।
এর বাইরে পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে অননুমোদিত ৫টি পিআইসিইউ শয্যা সচল থাকলেও সেখানে নেই পর্যাপ্ত জনবল। এ হিসেবে ঢাকা শহরে ৪টি বড় সরকারি-আধা সরকারি হাসপাতালে অনুমোদিত এবং অনুমোদন ছাড়া পিআইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ৪৩টি।
এদিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ‘পিজি হাসপাতাল’ নামে পরিচিত বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েও কোনো পিআইসিইউ নেই। দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের জন্য এই নিবিড় পরিষেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যত তা আলোর মুখ দেখেনি। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক যেকোনো মূল্যে পিআইসিইউ চালুর ঘোষণা দেন।
ওই সময় তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিইউ বিভাগ, শিশু সার্জারি বিভাগ, শিশু কার্ডিওলজি বিভাগ, শিশু গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও নিউট্রিশন বিভাগ, শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, শিশু বিভাগ, শিশু নিউরোলজি বিভাগ, শিশু হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগ, নিওনেটোলজি বিভাগ, পেডোডন্টিকস বিভাগ রয়েছে। এসব বিভাগের শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ বিদ্যমান জনবল দিয়েই পিআইসিইউ চালু করা হবে।
শুধু পিআইসিইউ নয়, সব ধরনের উদ্যোগের জন্য অবকাঠামো এবং জনবল প্রয়োজন। মূলত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বিবেচনায় হাসপাতাল এবং অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। তবে এটি মন্ত্রণালয়ের বিষয়। অবকাঠামো ও জনবল আসে মন্ত্রণালয় থেকে। উদ্যোগ নিলেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব— ডা. জয়নাল আবেদীন টিটো, সাবেক লাইন ডিরেক্টর, হাসপাতাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
কিন্তু এই ঘোষণার ২ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো পিআইসিইউ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি প্রতিষ্ঠানটিতে। সর্বশেষ গত ২৩ আগস্ট ২২টি এজেন্ডা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটির ১২১তম সভায় পিআইসিউ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে পিআইসিইউ চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায়নি।
এর বাইরে মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড এবং স্নায়ুতন্ত্র সংক্রান্ত সব ধরনের জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে ৪ শয্যার একটি পিআইসিইউ প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
রোগীদের হয়রানি, হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোও
চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকার ৩ কোটি ৬৬ লাখ জনগোষ্ঠী তো রয়েছেই, সারাদেশ থেকেও মুমূর্ষু রোগীদের গন্তব্য হয় রাজধানীর হাসপাতালগুলো। সন্তানের প্রাণ রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে হন্যে হয়ে রাজধানীমুখি হন তারা। কিন্তু রাজধানীতে এসে পিআইসিইউ সংকটের কারণে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হয় তাদের। তবে শেষ পর্যন্ত মেলে না পিআইসিইউ।
আরও পড়ুন: দেড় দশক ধরে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ১২০ বছরের পুরোনো ভবন, রোগীর সাথে চাপ অতিরিক্ত চিকিৎসকেরও
একই সাথে গুরুতর রোগীদের পিআইসিইউ নিশ্চিতে হিমশিম খেতে হয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও। এদিকে আইসিইউ সংকটের সুযোগে দরিদ্র রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে ভাগিয়ে নেওয়ার ঘটনাও কম নয়। মোটা অংকের কমিশনের বিনিময়ে সরকারি হাসপাতালগুলোর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রোগীদের পাঠিয়ে দেয় বেসরকারি হাসপাতালে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের এখানে ১৭টি পিআইসিইউ আছে। তবে স্পেস আরও অনেক বেশি দরকার। কারণ পিআইসিইউতে এক মাস থেকে ১২ বছর পর্যন্ত শিশুদের রাখা হয়। তো এই পর্যায়ের রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। সে তুলনায় আসলে পিআইসিইউ নাই। আর অনেকগুলো হাসপাতালে তো একেবারেই নাই। যার ফলে এ ধরনের রোগী ম্যানেজমেন্ট অনেক বেশি কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।
ঢাকা শহরে শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি পর্যায়েও পিআইসিইউ সংকট রয়েছে। এ ছাড়া সারাদেশেই সার্বিক আইসিইউ স্বল্পতা আছে— অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম পামী, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
ঢামেক পরিচালক বলেন, আমাদের কাছে অনেক অনুরোধ আসে। কিন্তু আমাদের পিআইসিইউ শয্যা আর বাড়ানোর সুযোগ নাই। কারণ এখানে আর স্পেস নাই, থাকলে আমরা হয়তো আরও বাড়াতাম। মাঝখানে এরকম একটা প্রজেক্ট নিয়েছিলাম, কিন্তু জায়গা পাওয়া গেল না। তবে সব হাসপাতালেই পিআইসিইউ থাকা উচিত বলে আমি মনে করি, বিশেষ করে এই ধরনের টারশিয়ারি লেভেলের হাসপাতালগুলোতে। যেগুলোতে সম্প্রসারণের সুযোগ আছে, সেগুলোতে একটু বেশি সংখ্যক বেড করা উচিত।
গুরুতর শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিতে পিআইসিইউ স্থাপনে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক লাইন ডিরেক্টর ডা. জয়নাল আবেদীন টিটো। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, শুধু পিআইসিইউ নয়, সব ধরনের উদ্যোগের জন্য অবকাঠামো এবং জনবল প্রয়োজন। মূলত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বিবেচনায় হাসপাতাল এবং অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। তবে এটি মন্ত্রণালয়ের বিষয়। অবকাঠামো ও জনবল আসে মন্ত্রণালয় থেকে। উদ্যোগ নিলেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
তবে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাই শুধু নয়, সবার আগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগের কথা জানালেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম পামী। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, ঢাকা শহরে শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি পর্যায়েও পিআইসিইউ সংকট রয়েছে। এ ছাড়া সারাদেশেই সার্বিক আইসিইউ স্বল্পতা আছে। সারাদেশে মেডিকেল কলেজ এবং জেলা পর্যায়ে আইসিইউ উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে সেখানে পেডিয়াট্রিক শয্যা কতটি থাকবে তা এখনও নির্ধারণ হয়নি।
আরও পড়ুন: ৪ বছরের প্রকল্পের ৩ বছর শেষ, ‘সিস্টেম লসে’ অগ্রগতি মাত্র ৬ শতাংশ
তিনি বলেন, একদম ইউনিয়ন পরিষদ লেভেল সাব-সেন্টার এবং উপজেলা লেভেলের হেলথ কমপ্লেক্স—অর্থাৎ প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নিয়ে আমাদের কনসার্নটা বেশি। আমরা চাচ্ছি যে প্রিভেনশনটা (প্রতিরোধ) বাড়ুক। মানে প্রাথমিকভাবেই আমরা প্রতিরোধ করব এবং সেখান থেকে রেফারাল হয়ে টারশিয়ারি লেভেলে আসবে—এইভাবে। অর্থাৎ আইসিইউ পর্যন্ত যাওয়ার আগেই যেন জিনিসটা প্রতিরোধ করা যায়।
সারাদেশের মতো রাজধানীতেও পিআইসিইউ শয্যা চাহিদার তুলনায় কম উল্লেখ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা আরও সম্প্রসারণ করছি। প্রতিটি হাসপাতালে এনআইসিইউ ভবন করছি। এসব ভবনের প্রত্যেকটাতে পিআইসিইউ থাকবে। এটি দ্রুত টেন্ডারে যাবে ইনশাআল্লাহ।