সলিমুল্লাহ মেডিকেলের হৃদরোগ বিভাগ
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল © সংগৃহীত
পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের হৃদরোগ (কার্ডিওলজি) বিভাগে তীব্র শিক্ষক ও চিকিৎসক সংকট দেখা দিয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে অধ্যাপক ছাড়াই চলছে বিভাগটি। সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক আছেন একজন করে। এ ছাড়া সংকট রয়েছে মেডিকেল অফিসারেরও। দুই বছরে দুজন অধ্যাপক পদায়ন করা হলেও ‘অজ্ঞাত কারণে’ তারা যোগদান করেননি। এ অবস্থায় রোগী থেকে নিয়ে শিক্ষার্থী ও প্রশিক্ষণার্থীরাও পড়েছেন ভোগান্তিতে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পরপরই বিভাগের একমাত্র অধ্যাপক ডা. মো. খালেকুজ্জামানকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (এনআইসিভিডি) বদলি করা হয়। তখন থেকে কোনো অধ্যাপক ছাড়াই চলছে বিভাগটি।
একই সঙ্গে শূন্য ছিল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদও। সম্প্রতি তিনজন সহকারী অধ্যাপককে পদোন্নতি দেওয়া হলেও দুজনকে বদলি করা হয়েছে হৃদরোগ হাসপাতালে। ফলে এখন একজন সহযোগী অধ্যাপক দিয়েই চলছে বিভাগটি। সাথে সম্প্রতি যোগ দিয়েছেন একজন সহকারী অধ্যাপক।
এ ছাড়া বিভাগের আউটডোর, ক্যাথল্যাব এবং ইকো রুমে মেডিকেল অফিসার সংকটও রয়েছে। প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকরা বলছেন, বিভাগে মেডিকেল অফিসারের পদ কার্যত ‘শূন্য’। ফলে সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) থেকে সহকারী সার্জন এবং বিভাগের প্রশিক্ষণার্থীদের দিয়েই এই সংকট ‘মোকাবেলা’ করা হয়।
মূলত বিদ্যমান শিক্ষকরা অবারিত প্র্যাকটিসের সুবিধা পেতে অধ্যাপক যোগদানে সংকট সৃষ্টি করেন। কারণ অধ্যাপক খালেকুজ্জামান থাকতে এখানে সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে থাকত এবং একটি ভারসাম্য ছিল— নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পোস্টগ্রাজুয়েট প্রশিক্ষণার্থী
এদিকে গত ২ বছরে বেশ কয়েকবার অধ্যাপক পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। তথ্য বলছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পর অধ্যাপক খালেকুজ্জামান হৃদরোগ হাসপাতালে চলে যাওয়ার পরের মাসেই অধ্যাপক ডা. মহসিন আহমেদকে বিভাগটিতে পদায়ন করা হয়। কিন্তু তিনি যোগদান করেননি। এ ছাড়া গত ১৭ আগস্ট হৃদরোগ হাসপাতালে সংযুক্ত অধ্যাপক ডা. আব্দুল মোমেনকে এখানে পদায়ন করা হলে তিনিও ‘অজ্ঞাত’ কারণে যোগদান করেননি।
সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের একটি সূত্র বলছে, বদলি ও পদায়নের পরও বিভাগে দুই অধ্যাপকের যোগদান না করার নেপথ্যে রয়েছেন একমাত্র সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবরার কায়সার। আওয়ামীপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) এই লাইফ মেম্বার বর্তমানে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) পরিচয়ে চলছেন। অভিযোগ, তিনি পদায়ন পাওয়া চিকিৎসকদের বিভাগে যোগদান করতে বাধা প্রদান করেছেন।
তথ্য বলছে, সলিমুল্লাহ মেডিকেলে বর্তমানে কার্ডিওলজির ওপর দুটি উচ্চতর কোর্স চালু রয়েছে। এগুলো হচ্ছে এমডি কার্ডিওলজি ও ডি-কার্ড। চিকিৎসাশাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগে এমন দুটি কোর্স চালু থাকার পরও বিভাগে কোনো অধ্যাপক না থাকায় প্রশিক্ষণের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। একই সঙ্গে কলেজ ও হাসপাতাল প্রশাসনের সদিচ্ছার ঘাটতিও দেখছেন তারা।
যানজটের কারণে আসলে পুরান ঢাকায় লোকজন একটু কমও আসতে চায়, এটাও একটা ব্যাপার। সবাই চেষ্টা করে এনআইসিভিডি অথবা ঢাকা মেডিকেল অথবা সোহরাওয়ার্দীতে যেতে। গত দুই মাসের অভিজ্ঞতায় এরকমটাই মনে হয়েছে আমার কাছে— ডা. শাহীন রেজা, উপাধ্যক্ষ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমডি কার্ডিওলজি কোর্সের একজন প্রশিক্ষণার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিভাগে একজনও অধ্যাপক না থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি বিষয়। যেখানে পোস্ট-গ্রাজুয়েট চিকিৎসকদের সঠিক গাইডেন্স, থিসিস ও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত প্রফেসরের তত্ত্বাবধান বাধ্যতামূলক, সেখানে বিভাগটি চলছে মাত্র দুজন জুনিয়র ফ্যাকাল্টি দিয়ে। প্রকৃতপক্ষে বিভাগ পুরো নিয়ন্ত্রণ করছেন ডা. আবরার কায়সার।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষক সংকট বড় সমস্যা হলেও আউটডোর, ক্যাথল্যাব এবং ইকোরুমে মেডিকেল অফিসারও নেই; পোস্টগ্রাজুয়েট প্রশিক্ষণার্থী এবং সিসিইউ থেকে সহকারী সার্জনদের নিয়ে এসে এগুলো চালানো লাগে। এতে প্রশিক্ষণার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপও তৈরি হয়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শিক্ষক সংকট।
অপর এক প্রশিক্ষণার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, মূলত বিদ্যমান শিক্ষকরা অবারিত প্র্যাকটিসের সুবিধা পেতে অধ্যাপক যোগদানে সংকট সৃষ্টি করেন। কারণ অধ্যাপক খালেকুজ্জামান থাকতে এখানে সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে থাকত এবং একটি ভারসাম্য ছিল। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পরে সবকিছুর একক কর্তৃত্ব চলে আসে ডা. আবরার কায়সারের হাতে।
তিনি বলেন, এক সময় তিনি (ডা. আবরার কায়সার) এবং অপর দুই সহকারী অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশিদ সিকদার ও ডা. সাইফুল ইসলাম বিভাগের তিনটি ইউনিট দেখাশোনা করতেন। ওই সময়ে তারা সপ্তাহে তিনদিন রাত ১০-১১টা পর্যন্ত রোগীদের হার্টের রিং পরাতেন। মূলত নিজেদের ‘হাত পাঁকা’ করতেই এভাবে রাফ প্র্যাকটিস করেন। অধ্যাপক থাকলে এতে বাধা দেওয়া হতে পারে। এ কারণে ডা. আবরার কায়সার বিভিন্নভাবে অধ্যাপক যোগদানে বাধা দিচ্ছেন। কিন্তু এর ফলে তো রোগীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। উনি ভুল করলে গাইড করবে কে? বিভাগে তো কোনো অধ্যাপক নেই!
এ বিষয়ে মুঠোফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার কল দিয়েও সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবরার কায়সারকে পাওয়া যায়নি। তিনি বর্তমানে ছুটিতে দেশের বাইরে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি।
যা আছে সেটা দিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে। ডেফিনেটলি, বেশি থাকলে সার্ভিসটা আরও ভালো, আরও বেটার হতো। সরকারও হয়তো চেষ্টা করছে দেওয়ার জন্য। আমরা তো ডিমান্ড দিয়ে রেখেছি। কলেজ প্রশাসনও যোগাযোগ করছে, আমিও যোগাযোগ করে আসছি— ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএমএ রুস্তম, পরিচালক, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল
অধ্যাপক শূন্যতার বিষয়ে জানতে চাইলে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মো. শাহীন রেজা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা তো আসলে চাই যে অধ্যাপক আসুক। পদ খালি আছে। কিন্তু পদায়ন হচ্ছে না কেন এটা তো আমরা বলতে পারবো না।
দুজন অধ্যাপকের যোগদান করতে না দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা যোগদান করতে পারেনি কথাটা ঠিক না, তারা যোগদান করেইনি। নিজেরা আবার নতুন করে অর্ডার চেইঞ্জ করে অন্য জায়গায় চলে গেছে। এই ব্যাপারে আমরা কিছু জানি না। আর ডিপার্টমেন্ট থেকে কোনো ইস্যু হবে কেন? ওনারা পদায়নের পর ডিপার্টমেন্টে যাবে কেন? নতুন কেউ আসলে তা হয় প্রিন্সিপাল অথবা ভাইস প্রিন্সিপালের কাছে আসবে, তাই না? ডিপার্টমেন্টে তো প্রশ্নই ওঠে না।
তবে পুরান ঢাকার যানজটের কারণে অনেকে সলিমুল্লাহ মেডিকেলে আসতে চান না বলে মনে করেন ডা. শাহীন রেজা। তিনি বলেন, ‘যানজটের কারণে আসলে পুরান ঢাকায় লোকজন একটু কমও আসতে চায়, এটাও একটা ব্যাপার। সবাই চেষ্টা করে এনআইসিভিডি অথবা ঢাকা মেডিকেল অথবা সোহরাওয়ার্দীতে যেতে। গত দুই মাসের অভিজ্ঞতায় এরকমটাই মনে হয়েছে আমার কাছে।’
কার্ডিওলজি বিভাগে মেডিকেল অফিসার সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএমএ রুস্তম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের মেডিকেল অফিসার কম আছে, এতে কোনো সন্দেহ নাই। তবে একেবারে নাই, এটি সঠিক তথ্য নয়। আমাদের ফুল প্রফেসরও অনেক দিন ধরে নাই। অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ছিলেন তিনজন, কমতে কমতে এখন একজন আছেন।
তিনি বলেন, যা আছে সেটা দিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে। ডেফিনেটলি, বেশি থাকলে সার্ভিসটা আরও ভালো, আরও বেটার হতো। সরকারও হয়তো চেষ্টা করছে দেওয়ার জন্য। আমরা তো ডিমান্ড দিয়ে রেখেছি। কলেজ প্রশাসনও যোগাযোগ করছে, আমিও যোগাযোগ করে আসছি।