ছিলেন ভিসার অপেক্ষায়

হাসপাতালের ভুল রিপোর্টে চিকিৎসায় বিলম্ব, নিভে গেল সাকিবের জীবন

০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩৪ PM , আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৪ PM
মারা যাওয়া রাকিবুল হাসান সাকিব, ইনসেটে এসএমকে হাসপাতাল

মারা যাওয়া রাকিবুল হাসান সাকিব, ইনসেটে এসএমকে হাসপাতাল © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

পরিবারের হাল ধরতে আর কিছুদিন পরই বিদেশ যাওয়ার কথা ছিল রাকিবুল হাসান সাকিবের (২০)। জোগাড় হয়েছিল ভিসাও। কিন্তু এপেন্ডিসাইটিসের জটিলতায় তার মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, একটি হাসপাতালের ভুল রিপোর্ট ও চিকিৎসায় অবহেলার কারণে সঠিক রোগ নির্ণয় না হওয়ায় পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে তার মৃত্যু ঘটেছে।

সাকিব লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানার উত্তর জয়পুর গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলমের ছেলে। দুই ছেলের মধ্যে সাকিব বড় ছেলে। তার বড় বোনে বিয়ে হয়েছে। ২০২২ সালে এসএসসি পাস করার পর পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে আর পড়াশোনা আর এগিয়ে নিতে পারেননি সাকিব। পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ছোটখাটো কাজে যোগ দেন। গত ২ এপ্রিল বিকেলে নোয়াখালীর মাইজদি শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

পরিবারের অভিযোগ, চন্দ্রগঞ্জের শহীদ মোস্তফা কামাল (এসএমকে) হাসপাতালের ভুল প্রতিবেদন ও চিকিৎসায় অবহেলার কারণে সঠিক রোগ নির্ণয় সম্ভব হয়নি। ফলে যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে পড়ে। চিকিৎসায় দেরি হয়ে যাওয়ার কারণে অপর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

রাকিবুল হাসান সাকিবের বাবা শাহ আলম ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমার ছেলেটা ঈদের পর বুধবারে (২৫ মার্চ) বলে তার বুক ব্যাথা। রাতে স্থানীয় মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যাই। একজন ডিউটি ডাক্তার ছিল, উনি বললেন যে এটা হয়ত গ্যাসের ব্যথা, খাওয়া-দাওয়া উল্টাপাল্টা হয়েছে রোজার মাসে। তিনি ওষুধ লিখে দিয়েছেন। সাধারন গ্যাসের ওষুধ দিয়েছেন আর এলার্জির ইনজেকশন একটা দিয়েছেন। কিন্তু পরের দিন (২৬ মার্চ) আবার বলছে ভাল লাগে না, পুরা শরীর ব্যথা, পায়খানা-প্রস্রাব হচ্ছে না। পরে আমাদের পরিচিত এসএমকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে ডিউটি ডাক্তার বললেন যে পরীক্ষা করাতে হবে এবং রোগী ভর্তি করে ট্রিটমেন্ট করা লাগবে। আমি বললাম, সমস্যা নাই, যা যা করার দরকার আপনারা করেন।

পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোগী তো একদিন আগে থেকে খানা খেতে পারে না। সাগুসহ নরমজাতীয় খাবার খাওয়াই। ডাক্তাররা ট্রিটমেন্ট করেছে, সেলাইন দিয়েছে। বললেন যে রাতে ট্রিটমেন্ট চলুক, সকালে খালি পেটে পরীক্ষা আছে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি, এক্সরে, রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা— এরকম চার-পাঁচটা পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষা করানোর পরে ডাক্তাররা বলল যে প্রস্রাবে ইনফেকশন আছে, আর রক্তে একটু সমস্যা আছে। এরপর ওষুধ দিয়েছে, ডোজ (সাপোজিটরি) দিয়ে প্রস্রাব-পায়খানা স্বাভাবিক করেছে। ডাক্তারদের পরামর্শে রোগী বাড়ি নিয়ে চলে আসছি। কিন্তু বাড়িতে নিয়ে আসার পরও তিন-চারদিনেও রোগীর কোন পরিবর্তন নাই যত ওষুধই খায়। মঙ্গলবারে (৩১ মার্চ) যখন দেখছি যে রোগীর অবস্থা ভাল না, তখন আমরা বেহুঁশ হয়ে মাইজদির প্রাইম হাসপাতালে নিয়ে গেছি। প্রাইমে লিভারের একজন ডাক্তার দেখাই। উনি আবারও টেস্টগুলা দিয়েছেন। টেস্টের রিপোর্ট আসছে মাগরিবের পরে, ডাক্তার পেয়ে আমাদের বলেন যে রোগীর অবস্থা তো ভাল না, তার এপেন্ডিসাইটিস। দ্রুত সার্জারির ডাক্তার দেখিয়ে অপারেশনের ব্যবস্থা করেন।

শাহ আলম বলেন, তখন নিরাময় হাসপাতালে আমার এক ভাই ছিল, তাকে ফোন দিয়েছি যে ভাই এই অবস্থা আমার ছেলের। রাত ৯টা-সাড়ে ৯টা বেজে গেছে। পরে ওখানে নিয়ে যাওয়ার পর ব্যবস্থা করতে করতে পরের দিন (১ মার্চ)। পরীক্ষাগুলো আবার করানো হল। রিপোর্টে দেখা গেল প্রাইমের পরীক্ষার সাথে মিল আছে। ডাক্তার বললেন দ্রুত অপারেশন করতে হবে। বুধবার (১ মার্চ) বিকাল ৪টার দিকে অপারেশন করানো হল। আমার ছেলে রাত ৯টার দিকে সবার সাথে কথাবার্তা বলেছে। কিন্তু রাত ৩টার দিকে ফের ভীষণ জ্বর। আমি ডিউটি ডাক্তারকে বললাম, তারা আমাদেরকে যা যা করতে বলল, আমরা করলাম। ছেলে এই ভাল হয়, এই অসুস্থ। এরকম করতে করতে সকাল ৯টার দিকে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। পরে অক্সিজেন লাগানো হয়েছে। বমি শুরু করলে ডাক্তারে বলল যে আইসিইউতে নিতে হবে, পরিস্থিতি ভাল না। অপারেশনের আগেই তারা বলছিলেন যে বেশি দেরি হয়ে গেছে। এপেন্ডিসাইটের ব্যাথা তো এতদিন রাখা ঠিক না।

সাকিবের বাবা আরও বলেন, আমি প্রবাসে ছিলাম, করোনায় এসে আটকে গিয়েছিলাম। ওই সময় আমি প্রায় ৩০-৪০ লাখ টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। ছেলেমেয়েদের পাঁচ বছর ধরে হয়ত খাওয়াতে পেরেছি, কিন্তু ভালভাবে রাখতে পারিনি। এজন্য পড়ালেখা করাতে পারিনি। এখন আমার আর্থিক অবস্থা এমন যে আমার বোনেরা-ভাগ্নেরা দিলে আমি খাই। আমার ছেলের অসুস্থতায় যত টাকা খরচ হয়েছে সব আমার মেয়ে জামাই আর বোনেরা দিয়েছে। এমন অবস্থায় ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য পাসপোর্ট করেছি। এসএসসির পরে পড়াতে পারিনি, দেশের কন্ডিশনের কথা চিন্তা করে কাজে লাগিয়েছেলাম। ঈদের চার-পাঁচদিন পরে আমার এক বন্ধু ভিসার ব্যবস্থা করেছে। এ সময় অসুস্থ হয়ে গেল।

ভুল রিপোর্ট ও চিকিৎসায় অবহেলা নিয়ে শাহ আলম আরও বলেন, আমার ছেলে মরে গেছে, এটা আল্লাহর ইচ্ছা। কিন্তু এদের ভুল পরীক্ষাগুলোর কারণে আমার ছেলেটার জীবন গেল। যদি এসএমকেতে বলত যে এপেন্ডিসাইট, আমি পাঁচ দিন আগে বুঝতে পারতাম, পাঁচ দিন আগে তার অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতাম। এসএমকের এই ভুল ট্রিটমেন্ট, পরীক্ষাগুলার কারণে আমার ছেলের জীবন গেছে। হয়ত আরো মানুষের জীবন যাবে। এজন্য তার বন্ধু-বান্ধবরা প্রতিবাদ করছে, আমাকে বলছে মামলা করতে। কিন্তু বাবা আমি মামলা করতে চাই না, আমার ছেলের মত ভুল রিপোর্ট আর ভুল চিকিৎসার কারণে যেন কারো মৃত্যু না হয়, এটাই চাই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসএমকে হাসপাতালে সাকিবের চিকিৎসা করেছিলেন ডা. সাইফুর রহমান খান। এ বিষয়ে হাসপাতালের হটলাইন নম্বরে কল দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, এমন কিছু তার মনে নেই। তাকে রিপোর্টগুলো দেখানোর উপায় জানতে চাইলে তিনি ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতিবেদককে নক দিবেন বলে জানান। কিন্তু দুদিনেই তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

ডেভিড ওয়ার্নার গ্রেপ্তার
  • ০৭ এপ্রিল ২০২৬
ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য জরুরি নির্দেশনা দিল জাতীয় বিশ্ববি…
  • ০৭ এপ্রিল ২০২৬
একনজরে বিসিবির অ্যাডহক কমিটি: কার কী পরিচয়?
  • ০৭ এপ্রিল ২০২৬
শিক্ষকদের মার্চের বেতন নিয়ে বড় দুঃসংবাদ দিল মাউশি
  • ০৭ এপ্রিল ২০২৬
বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে রাইস কুকার-বৈদ্যুতিক চুলা জব্দ, ছাত…
  • ০৭ এপ্রিল ২০২৬
নতুন কেনা বাড়িতে ফেরা হল না ড্যাফোডিলের সাবেক ছাত্রের, নিউই…
  • ০৭ এপ্রিল ২০২৬
close