আত্মনির্ভরশীল শিশুর প্রতিকী ছবি © এআই জেনারেটেড ছবি
শিশুকে শুধু পড়াশোনায় ভালো করলেই হবে না, বাস্তব জীবনের নানা পরিস্থিতি সামলানোর জন্যও ছোটবেলা থেকেই প্রস্তুত করতে হবে। কারণ সব সময় মা-বাবা শিশুর পাশে থাকবেন এমন নিশ্চয়তা নেই। কখনো পথ হারানো, বিপদে পড়া কিংবা হঠাৎ একা কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তাই ১০ বছর বয়স হওয়ার আগেই শিশুকে কিছু প্রয়োজনীয় জীবনদক্ষতা শেখানো জরুরি।
এসব শিক্ষা শিশুকে আত্মনির্ভরশীল ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি এসব জীবনমুখী দক্ষতা শেখানোর দায়িত্ব মূলত মা-বাবার। খেলতে খেলতে কিংবা দৈনন্দিন কাজের মধ্য দিয়েই শিশুকে এগুলো শেখানো সম্ভব।
আত্মরক্ষার প্রাথমিক শিক্ষা
শিশুকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোর আগে আত্মবিশ্বাসী করে তোলা জরুরি। কোনো বিপদের মুখে যেন সে আতঙ্কিত না হয়ে পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে, সে শিক্ষা দিতে হবে। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা, দৌড়ানো এবং বিপদে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার অভ্যাসও গড়ে তুলতে পারেন।
শিশুকে বোঝাতে হবে, বিপদে পড়লে মূল লক্ষ্য হবে নিরাপদ জায়গায় পালিয়ে যাওয়া এবং দ্রুত বড়দের সাহায্য নেওয়া। প্রয়োজনে আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কীভাবে নিজেকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হয়, সেটিও শেখানো যেতে পারে।
মানচিত্র ও দিক চেনার অভ্যাস
ছোটবেলা থেকেই শিশুকে দিক চেনানো যায়। ঘরে গ্লোব বা মানচিত্র রাখতে পারেন। ছুটির দিনে তাকে নিয়ে বাড়ির আশপাশের রাস্তা, গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও পরিচিত এলাকার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন।
এতে কোনো কারণে পথ হারিয়ে ফেললে শিশুর পরিচিত স্থান শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি হবে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর কোন দিকে গেলে পরিচিত জায়গায় পৌঁছানো যায়, সে ধারণাও তার মধ্যে তৈরি হবে।
বাড়ির ঠিকানা ও ফোন নম্বর মুখস্থ করান
শিশু কথা বলতে শেখার পর থেকেই তাকে নিজের নাম, মা-বাবার নাম, বাড়ির ঠিকানা এবং অন্তত একজন অভিভাবকের ফোন নম্বর শেখানো উচিত। এগুলো যেন সে প্রয়োজনের সময় স্পষ্টভাবে বলতে পারে, সেভাবেও অনুশীলন করাতে হবে।
কখনো হারিয়ে গেলে বা কোনো বিপদে পড়লে এসব তথ্যই শিশুকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিপদের সময় কার কাছে যেতে হবে, শেখান
শিশুকে বোঝাতে হবে, হারিয়ে গেলে বা কোনো বিপদে পড়লে অপরিচিত সবার কাছে সাহায্য না চেয়ে নির্দিষ্ট নিরাপদ ব্যক্তির কাছে যেতে হবে। পুলিশের পোশাকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চেনানো যেতে পারে।
এ ছাড়া কোথায় নিরাপদে সাহায্য পাওয়া যায়, সে বিষয়েও শিশুকে ধারণা দিতে হবে। ভিড়ের মধ্যে মা-বাবাকে খুঁজে না পেলে যেন আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ কোনো ব্যক্তির কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় ও সমস্যার কথা বলতে পারে, তা অনুশীলন করানো জরুরি।
‘না’ বলতে শেখান
শিশুর নিজের ইচ্ছা ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে শেখানোও জীবনদক্ষতার অংশ। ছোটবেলা থেকেই তাকে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে ‘না’ বলতে শেখাতে হবে।
অন্যের চাপ, ভয় বা সামাজিক সংকোচের কারণে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কিছুতে রাজি হয়ে যাওয়ার অভ্যাস যেন তৈরি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নিজের সিদ্ধান্ত ও সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন হলে বড় হয়েও শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
প্রাথমিক চিকিৎসার ধারণা দিন
খেলতে গিয়ে ছোটখাটো কেটে-ছিঁড়ে গেলে শিশুকে আতঙ্কিত না হয়ে কী করতে হবে, তা শেখানো যেতে পারে। ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা, ব্যান্ডেজ করার মতো সহজ প্রাথমিক চিকিৎসার ধারণা তাকে দেওয়া দরকার।
তবে কোন ধরনের আঘাতে বড়দের সাহায্য নিতে হবে, সেটিও স্পষ্ট করে শেখাতে হবে। গুরুতর আঘাত, অতিরিক্ত রক্তপাত বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নিজে চিকিৎসা না করে দ্রুত অভিভাবক বা চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে এ বিষয়টিও শিশুকে বোঝানো জরুরি।
টাকার মূল্য ও অর্থ ব্যবস্থাপনা শেখান
শিশুকে ছোটবেলা থেকেই অর্থের মূল্য বোঝানো দরকার। হাতখরচ বা ঈদের সালামির টাকা কীভাবে পরিকল্পনা করে খরচ করতে হয়, তা শেখানো যেতে পারে।
অপ্রয়োজনীয় খেলনা বা খাবারের পেছনে সব টাকা খরচ না করে কিছু টাকা সঞ্চয় করা এবং প্রয়োজনীয় বা পছন্দের কোনো জিনিস কেনার জন্য টাকা জমিয়ে রাখার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তার বাস্তব ধারণা তৈরি হবে।
আরও দেখুন: এমটিও পদে চাকরি দেবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড
রান্নাঘরের ছোটখাটো কাজ শেখান
শিশুকে বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী রান্নাঘরের ছোটখাটো কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। যেমন পেঁয়াজ-রসুনের খোসা ছাড়ানো, ফ্রিজ থেকে সবজি বের করে আনা, প্লেট-চামচ গুছিয়ে রাখা কিংবা খাবার টেবিলে পানি দেওয়া।
বয়স ও নিরাপত্তা বিবেচনা করে ধীরে ধীরে সহজ খাবার তৈরির কাজও শেখানো যেতে পারে। সাত বছর বয়সের পর অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে মাইক্রোওয়েভ ওভেন ব্যবহারের মতো বিষয় শেখানো যেতে পারে। তবে ছুরি, আগুন, গরম পানি বা অন্য ঝুঁকিপূর্ণ সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিশুকে একা রাখা উচিত নয়।
দৈনন্দিন জীবনের এসব ছোটখাটো কাজ শিশুকে শুধু নিজের যত্ন নিতে শেখায় না, তার আত্মবিশ্বাসও বাড়ায়। ভবিষ্যতে বাড়ির বাইরে পড়াশোনা বা নতুন পরিবেশে যেতে হলে নিজের প্রয়োজনীয় কাজ নিজে করার অভ্যাস তাকে সহজে মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুকে জীবনমুখী শিক্ষায় গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও মা-বাবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যসূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট।