পোস্টাল বিডি অ্যাপের লোগো ও সংবাদ সংগ্রহ পদ্ধতির প্রতীকী রূপ © টিডিসি সম্পাদিত
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশী ভোটার ও নিজ ভোটার এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী,ব্যাংকার, নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত এবং আইনী হেফাজতে থাকা ভোটারের জন্য আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। পোস্টাল বিডি অ্যাপের মাধ্যমে অনেককে এ সুযোগ দেওয়া হলেও নিজ এলাকার বাইরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করা গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে গণমাধ্যমকর্মীদের বিরাট একটা অংশ এ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন।
গণমাধ্যমকর্মীরা বলছেন, অন্যান্য উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের মত বাংলাদেশে পোস্টাল ব্যালট চালুর বিষয়টি ইতিবাচক। এ পদ্ধতির সুবিধা নির্দিষ্টসংখ্যক পেশাজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিজ এলাকার বাইরে অবস্থান করা সব পেশার মানুষের জন্য করা হোক, বিশেষ করে গণমাধ্যমে যারা কর্মরত আছেন, তাদের জন্য। কারণ, তাদের অধিকাংশই পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকায় ভোট দিতে পারেন না। এতে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
তারা আরও বলছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের কয়েক দফার প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে দেশের মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিলেও এবাবের গণঅভ্যুত্থাণ পরবর্তী নির্বাচন ঘিরে সবার মাঝে উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা বিরাজ করছে। সুতরাং অন্য নাগরিকদের মতো গণমাধ্যমকর্মীরাও উচ্ছ্বসিত এবং ভোট প্রদানে উৎসুক। যার কারণে, বিলম্ব হলেও তাদের জন্য বিশেষ বিবেচনায় পোস্টাল ভোটিংয়ের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে প্রয়োজনীয ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছেন তারা।
“যারা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র জব করেন, সাংবাদিকরা এর বাইরে নন। তারা নির্বাচনের দিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভোট দিতে পারেন না। সুতরাং তাদের পোর্টাল ব্যালটে ভোটদানের সুযোগ থাকা উচিৎ। অন্য পেশাজীবীদের সুযোগ থাকলে সাংবাদিকদের কেন থাকবে না?” - ইলিয়াস খান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাব।
জানা গেছে, গত বছরের ২১ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে চিঠি দিয়ে নিজ এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিবন্ধন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ নির্দেশনার কথা সব মন্ত্রণালয়, সব বিভাগীয় কমিশনার ও সব জেলা প্রশাসককে জানানো হয়।
পোস্টাল বিডি অ্যাপের তথ্যানুযায়ী, এবার নিবন্ধন করেছেন মোট ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৬ জন। তাদের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী ৫ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ জন। নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪২ জন। আনসার ও ভিডিপি ১০ হাজার ১০ জন। কারাবন্দি ও আইনি হেফাজতে রয়েছেন এমন ব্যক্তি ৬ হাজার ২৮৪ জন।
আরও জানা যায়, ৩০০ সংসদীয় আসনে নির্বাচনের জন্য ১৫ লাখ ২৭ হাজার ১৫৫ ভোটারের পোস্টাল ভোটে নিবন্ধন অনুমোদন করা হয়েছে। প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা ৭ লাখ ৬০ হাজারের কিছু বেশি। বাকিরা দেশের ভেতরেই নিবন্ধন করেছেন; তাদের পৌনে ছয় লাখ সরকারি চাকরিজীবী, ১ লাখ ৬০ হাজার নির্বাচনী কর্মকর্তা, প্রায় ১০ হাজার আনসার-ভিডিপির সদস্য এবং ছয় হাজারের কিছু বেশি কারাবন্দি ব্যক্তি।
’নির্বাচনে ভোটাধিকার সবার জন্যই মৌলিক অধিকার। এর বাইরে আমরা গণমাধ্যমকর্মী নই। আর এবারের নির্বাচনের বিশেষত্ত্ব রয়েছে। সুতরাং অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো আমাদেরও পোস্টাল ভোটিংয়ের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।’- মেহেদী মামুন, সভাপতি, জাবি সাংবাদিক সমিতি।
পোস্টাল ব্যালটে ভোটের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে স্টার নিউজের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ও বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির নির্বাহী সদস্য লিটন ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রবাসী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংকার, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনরত ব্যক্তিবর্গসহ অনেকেই পোস্টাল ভোটিং সিস্টেমের মাধ্যমে আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু গণমাধ্যমকর্মী যারা নিজ এলাকার বাইরে অবস্থান করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন, তাদের কথা বিবেচনায় নেওয়ার কথা ভাবা হয়নি। এটা দুঃখজনক।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, যে সাংবাদিক যেখানেই থাকুক না কেন, ভোট যেন দিতে পারে সবাই। অর্থাৎ, প্রবাসী কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের মতো সাংবাদিকদের জন্যও কোনো একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ও বনিক বার্তার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মেহেদী মামুন বলেন, ‘যাদের জন্ম ১৯৯০ সালের পর, তাদের বড় একটা অংশ বর্তমানে ভোটার। তারা সুষ্ঠু কোনো নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ভোট দিতে পারেনি। তার উদাহরণ আমি নিজেও। এবারের নির্বাচনে আমার উত্তরবঙ্গে (বাড়িতে) যাওয়া হবে না, ক্যাম্পাসেই পেশাগত দায়িত্বসহ অনেক কাজ রয়েছে। কিন্তু আমি ভোট দিতে চাই। সরকার অন্যদের কথা চিন্তা করলেও আমাদের কথা চিন্তা করেনি।’
তিনি আরও বলেন, ’নির্বাচনে ভোটাধিকার সবার জন্যই মৌলিক অধিকার। এর বাইরে আমরা গণমাধ্যমকর্মী নই। আর এবারের নির্বাচনের বিশেষত্ত্ব রয়েছে। সুতরাং অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো আমাদেরও পোস্টাল ভোটিংয়ের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।’
আরও পড়ুন: ব্যাংকারদের পোস্টাল ব্যালটের অ্যাপে নিবন্ধনের নির্দেশ
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীরা যেহেতু পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, সাংবাদিকদেরও এ সুযোগ দেওয়া উচিৎ। কারণ, নির্বাচনের দিন দায়িত্ব পালনের স্বার্থে নিজ এলাকার বাইরে ঢাকায়, জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে তারা থাকবেন। সে সেক্ষেত্রে তারা ভোটদানের সুযোগ পাবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই সাংবাদিকদেরও ভোটদানের সুযোগ দেওয়া হোক।’ বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের নজরে আনবেন কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি যেহেতু আলোচনায় এসেছে, আমাদের ফোরামে আমরা কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব। বিষয়টি তো এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় নয়।’
মতামত জানিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশেই পোস্টাল ভোটিং সিস্টেম রয়েছে। আমাদের দেশেও অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে গণমাধ্যমকর্মীসহ সব পেশাজীবীদের জন্য এ পদ্ধতি চালু রাখা জরুরি। বিশেষ করে, এবারের নির্বাচন ঘিরে জনগণের একটা উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা কাজ করছে।’
তিনি বলেন, ‘যারা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র জব করেন, সাংবাদিকরা এর বাইরে নন। তারা চাকরির অংশ হিসেবে নির্বাচনের দিনসহ এর আগে এবং পরের সময়টাতে এক্টিভলি রিপোর্টিংয়ের কাজ করতে হয়। বিশেষ করে, নির্বাচনের দিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভোট দিতেই পারেন না। সুতরাং তাদের পোর্টাল ব্যালটে ভোটদানের সুযোগ থাকা উচিৎ। অন্য পেশাজীবীদের সুযোগ থাকলে সাংবাদিকদের কেন থাকবে না?’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বক্তব্য জানতে নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদকে কল দিলে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে ‘পরে’ কথা বলতে চান।