রদ্রি এবং আইতানা বোনমাতি © সংগৃহীত ও টিডিসি সম্পাদিত
বিশ্ব ফুটবলে এখন একটাই নাম স্পেন। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে নারী ও পুরুষ দুই বিভাগেই বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়েছে দেশটি। ২০২৩ সালে নারী বিশ্বকাপ জয়ের পর ২০২৬ সালে পুরুষ বিশ্বকাপও নিজেদের করে নিয়েছে লা রোহা। এর মাধ্যমে ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই সময়ে পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগের বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মর্যাদা পেল স্পেন।
শুধু দুটি বিশ্বকাপ নয়, বয়সভিত্তিক ও সিনিয়র পর্যায়ের সাফল্য মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে স্পেন জিতেছে মোট ১৬টি বিশ্ব ও ইউরোপিয়ান শিরোপা। ধারাবাহিক এই সাফল্যের কারণে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো স্পেনকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ফুটবল শক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করছে।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। এর আগে ২০২৩ সালে সিডনিতে অনুষ্ঠিত নারী বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা জিতেছিল স্পেনের মেয়েরা। এর আগে ২০০৮ সালে ইউরো জয়ের পর ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়েছিল স্পেনের পুরুষ দল। এবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ২০২৪ সালে ইউরো জয়ের দুই বছর পর আবার বিশ্বকাপও নিজেদের করে নিয়েছে তারা।
শুধু বিশ্বকাপ নয়, শিরোপার বন্যা
বিশ্বকাপের সাফল্য আসলে স্পেনের দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্যেরই অংশ। ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে নারী ও পুরুষ মিলিয়ে স্পেন জিতেছে ১৬টি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। নারী দলের অর্জনের মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালের বিশ্বকাপ, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের টানা দুই নেশনস লিগ, ২০২২ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, ২০২২ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত টানা পাঁচটি অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং অনূর্ধ্ব-১৭ পর্যায়ে বিশ্বকাপ ও ইউরোপিয়ান শিরোপা।
অন্যদিকে পুরুষ দল জিতেছে ২০২৩ নেশনস লিগ, ২০২৪ ইউরো, ২০২৪ অলিম্পিক স্বর্ণপদক, ২০২৬ অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং সর্বশেষ ২০২৬ বিশ্বকাপ।
সাফল্যের পেছনে দীর্ঘ পরিকল্পনা
স্পেনের এই উত্থান হঠাৎ করে আসেনি। দেশটির ফুটবল ফেডারেশন এক দশকের বেশি সময় ধরে একই দর্শন ও একই খেলার ধারা অনুসরণ করে বয়সভিত্তিক দলগুলো গড়ে তুলেছে। বার্সেলোনার 'লা মাসিয়া'সহ বিভিন্ন একাডেমিকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, বল দখলে রেখে খেলার দর্শন, ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে আক্রমণ গড়ে তোলা এবং প্রতিটি বয়সভিত্তিক দলে একই কৌশল অনুসরণের ফলে খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে মানিয়ে নিতে খুব বেশি সময় লাগে না।
বিশ্বকাপজয়ী কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও এই কাঠামোরই অংশ ছিলেন। জাতীয় দলের দায়িত্ব পাওয়ার আগে তিনি অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ ও অলিম্পিক দলের কোচ ছিলেন। ফলে বর্তমান জাতীয় দলের অধিকাংশ ফুটবলার তার অধীনেই বেড়ে উঠেছেন।
স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার হুয়ান মাতা বলেছেন, ‘দে লা ফুয়েন্তে শুধু একজন কোচ নন, তিনি এই প্রজন্মের খেলোয়াড়দের বিকাশের পুরো যাত্রার অংশ ছিলেন। এ কারণেই সিনিয়র দলে এসে খেলোয়াড়দের মানিয়ে নিতে কোনো সমস্যা হয়নি।’
নারী ফুটবলেও বিপ্লব
একসময় নারী ফুটবলে পিছিয়ে ছিল স্পেন। কিন্তু গত এক দশকে সেখানে আমূল পরিবর্তন এসেছে। দেশজুড়ে মেয়েদের জন্য আলাদা একাডেমি, উন্নত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, পেশাদার লিগ, বয়সভিত্তিক দল এবং অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগের ফল এখন মাঠে মিলছে।
২০২৩ সালের নারী বিশ্বকাপ, টানা দুই নেশনস লিগ এবং বয়সভিত্তিক পর্যায়ে একের পর এক শিরোপা সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
নতুন প্রজন্মও প্রস্তুত
স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের প্রতিভার ধারাবাহিকতা। পুরুষ দলে লামিন ইয়ামাল ও পাউ কুবারসি মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিশ্বকাপজয়ী হয়েছেন। ইয়ামাল বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে খেলেছেন। একই ম্যাচে দুই কিশোরকে শুরুর একাদশে খেলিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসেও নতুন নজির গড়েছে স্পেন।
অন্যদিকে নারী দলে ভিকি লোপেজ, সালমা পারাইয়ুয়েলোর মতো তরুণ তারকারা ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম বোর্ডে ১০ শিক্ষার্থীর ভর্তি ও রেজিস্ট্রেশন বাতিল
কেন স্পেন এখন সবচেয়ে ভয়ংকর?
বর্তমানে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে স্পেন টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত। ২০২৬ বিশ্বকাপে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে প্রতিপক্ষ তাদের পোস্ট লক্ষ্য করে মাত্র ১০টি শট নিতে পেরেছে ,যা দলটির রক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতার বড় প্রমাণ। স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিয়েম বালাগের মতে, এটি শুধু একটি সফল দল নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ফুটবল সংস্কৃতির ফল। তার ভাষায়, 'এটি একটি আধিপত্য। স্পেনের সবাই একই দর্শনে বিশ্বাস করে এবং তারা কখনো থেমে থাকে না।'
ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরিও মনে করেন, স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের পুরো ফুটবল কাঠামো। তার মতে, আগে স্পেন মাঝেমধ্যে শিরোপা জিতত, এখন তারা প্রতিটি স্তরেই জিতছে।
বিশ্বকাপের সর্বশেষ শিরোপা দিয়ে স্পেন শুধু আরেকটি ট্রফি জেতেনি; তারা দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক ফুটবলে টেকসই সাফল্য আসে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী একাডেমি এবং একই ফুটবল দর্শনের ধারাবাহিক প্রয়োগের মাধ্যমে। আর সেই কারণেই বর্তমান সময়ে পুরুষ ও নারী উভয় ফুটবলে স্পেনকে বিশ্বের সবচেয়ে অদম্য শক্তি বলা হচ্ছে।