ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা
ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা মুখোমুখি © সংগৃহীত
ক্রীড়াজগতের সবচেয়ে বড় দ্বৈরথ কোনটি? এই প্রশ্নে ইয়াঙ্কিস–রেড সক্স কিংবা ওহাইও স্টেট–মিশিগানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতার নাম আসতে পারে। তবে ৬৪ বছরের ইতিহাস, তিক্ততা, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা দ্বৈরথকে অন্য সব প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে আলাদা করে দেখেন অনেকে।
এই দুই দলের লড়াই নিয়মিত দেখা যায় না। ১৫০ বছরেরও বেশি সময়ে তারা মুখোমুখি হয়েছে মাত্র কয়েকবার। তবে প্রতিবারই ম্যাচের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইতিহাসের বড় কোনো অধ্যায়। এবার সেই দ্বৈরথ নতুন উচ্চতায় উঠতে যাচ্ছে। বুধবার রাতে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ম্যাচটির বিজয়ী দল জায়গা করে নেবে ফাইনালে।
দুই দলের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছে সংস্কৃতির সংঘাত। আছে রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈরিতা। আছে সমুদ্রযুদ্ধের স্মৃতি। আর আছে বিশ্বকাপের মঞ্চে তৈরি হওয়া কিছু অবিস্মরণীয় ঘটনা।
ফুটবলের অনেক দ্বৈরথের পেছনে থাকে স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কাছাকাছি থাকা দুই শহর বা অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বিরোধও অনেক সময় ফুটবলের মাঠে প্রকাশ পায়। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতির সংঘাত যখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকে, তখন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভিন্ন মাত্রা পায়।
ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ ঠিক তেমনই। এই লড়াইয়ের শিকড় বহু বছরের তিক্ততায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধ ও সামাজিক–সাংস্কৃতিক বিরোধ। আবার বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুই দলের ম্যাচ উপহার দিয়েছে নাটকীয় ও স্মরণীয় অনেক মুহূর্ত। এই দ্বৈরথের শুরু ১৯৬২ সালে হলেও ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের পর তা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে জয় পেয়েছিল স্বাগতিকেরা। সেটিই ছিল ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়। ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত শারীরিক ও উত্তেজনাপূর্ণ। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিন প্রথমার্ধেই মাঠ ছাড়েন। মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে দুটি অপরাধের কারণে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়।
ম্যাচের উত্তাপ এতটাই বেশি ছিল যে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ‘প্রাণী’ বলে মন্তব্য করেন। ম্যাচ শেষে নিজের খেলোয়াড়দের প্রতিপক্ষের সঙ্গে জার্সি বদলাতেও তিনি নিষেধ করেছিলেন। এই ম্যাচের উত্তেজনা ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড চালুর অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। মাঠের উত্তাপ কমাতে নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়। এর ২০ বছর পর ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দুই দল আবার মুখোমুখি হয়। এবার ম্যাচটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ফকল্যান্ডস যুদ্ধের স্মৃতি।
আর্জেন্টিনার জন্য বিষয়টি ছিল আরও গভীর। ওই যুদ্ধের পর সামরিক সরকারের পতন ঘটে। ১৯৮৩ সালে দেশটিতে নতুন করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের আবহে ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনাল হয়ে ওঠে অন্যরকম এক লড়াই।
ম্যাচটির সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত আসে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে। গোলশূন্য ম্যাচের ৫১তম মিনিটে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনের নাগালের বাইরে হাত দিয়ে বল জালে পাঠান। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা তীব্র প্রতিবাদ করলেও গোলটি দেওয়া হয়। চার মিনিট পর ম্যারাডোনা আরও একটি গোল করেন। সেটি বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হয়।
আরও পড়ুন: ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা মহারণে নজর থাকবে যেসব তারকার ওপর
আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি জেতে। পরে বিশ্বকাপও জিতে নেয়। ম্যারাডোনা স্বীকার করেছিলেন, প্রথম গোলটি তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই হাতে করেছিলেন। তবে আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে সেটি ছিল শুধু একটি গোল নয়। ফকল্যান্ডস যুদ্ধে নিহতদের জন্য প্রতীকী প্রতিশোধের মতোও দেখা হয়েছিল ঘটনাটিকে। এতে ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে আরও বড় নায়ক হয়ে ওঠেন। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডের মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ঘৃণিত প্রতিপক্ষ।
এরপর দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে ফুটবলও আর আগের মতো থাকেনি। এই দ্বৈরথ মাঠের লড়াই ছাড়িয়ে জীবন, মৃত্যু, যুদ্ধ ও জাতীয় আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ১২ বছর পর ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে আবার মুখোমুখি হয় দুই দল। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ছিল আর্জেন্টিনা।
ম্যাচে ইংল্যান্ডের তরুণ তারকা মাইকেল ওয়েন অসাধারণ একটি গোল করেন। কিন্তু ম্যাচের ৪৮তম মিনিটে ডিয়েগো সিমিওনের সঙ্গে সংঘর্ষের পর তাকে লাথি মারেন ডেভিড বেকহাম। ফলে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় ইংল্যান্ডের এই তারকাকে। বেকহামের সেই বহিষ্কার ইংল্যান্ডের সমর্থকদের জন্য ছিল হৃদয়বিদারক মুহূর্ত। অন্যদিকে সিমিওনের কৌশল ও প্রতিক্রিয়াও ম্যাচটির আলোচিত অংশ হয়ে ওঠে।
এভাবেই ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা দ্বৈরথে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধের স্মৃতি, রাজনৈতিক সংঘাত, বিতর্কিত গোল, লাল কার্ড ও বিশ্বকাপের অসংখ্য নাটকীয় মুহূর্ত। এবার বুধবার আবারও মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। আর্জেন্টিনা সুইজারল্যান্ডকে এবং ইংল্যান্ড নরওয়েকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে। আটলান্টায় অনুষ্ঠেয় এই ম্যাচে অতীত ও বর্তমান আবার মুখোমুখি হবে। আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসির এটি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ। তবে এই তথ্যও যেন দুই দলের দীর্ঘ ইতিহাসের তুলনায় গৌণ।