২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ১৬ স্টেডিয়াম © টিডিসি সম্পাদিত
আজ থেকে পর্দা উঠছে ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর, যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ১৬টি বিশ্বমানের স্টেডিয়ামে বসবে এবারের সবচেয়ে বড় আসরের ১০৪টি ম্যাচের মহাযজ্ঞ। দর্শকরা পাচ্ছেন আধুনিক স্থাপত্য, প্রযুক্তি ও বিশাল ধারণক্ষমতার এক অনন্য ভেন্যু অভিজ্ঞতা।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ হবে টুর্নামেন্টের ২৩তম আসর, যেখানে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেবে। ১৬টি শহরের স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচগুলো। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ১১টি, মেক্সিকোতে ৩টি এবং কানাডায় ২টি ভেন্যু রয়েছে।
এই আয়োজন চলবে ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত। সবচেয়ে দূরের দুই ভেন্যু ভ্যানকুভারের বিসি প্লেসএবং মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও অ্যাজটেকা যার মধ্যে দূরত্ব প্রায় ৪,৪০০ কিলোমিটার।
১৬টি ভেন্যু স্টেডিয়াম (দেশভিত্তিক তালিকা) এর মধ্যে মেক্সিকোতে ৩টি স্টেডিয়াম এস্তাদিও অ্যাজটেকা ,এস্তাদিও আকরন, এস্তাদিও বিবিভিএ। কানাডাতে ২টি স্টেডিয়াম বিএমও ফিল্ড, বিসি প্লেস। যুক্তরাষ্ট্রে ১১টি স্টেডিয়াম মেটলাইফ স্টেডিয়াম ,এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়াম, সোফাই স্টেডিয়াম, অ্যারোহেড স্টেডিয়াম, লেভিস স্টেডিয়াম, এনআরজি স্টেডিয়াম, মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়াম, লিংকন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ড, লুমেন ফিল্ড, হার্ড রক স্টেডিয়াম, গিলেট স্টেডিয়াম।
মেক্সিকোর স্টেডিয়াম
এস্তাদিও অ্যাজটেকা (মেক্সিকো সিটি) : বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম ঐতিহাসিক স্টেডিয়াম হলো এস্তাদিও অ্যাজটেকা। যার ধারণক্ষমতা ৮০,৮২৪ জন। এখানে আগেও বিশ্বকাপ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি বিশাল গ্যালারি ও ঐতিহ্যবাহী পরিবেশের জন্য বিখ্যাত। এ স্টেডিয়ামে ১৯৭০ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল আয়োজন করেছে । এস্তাদিও অ্যাজটেকা বিশ্বের একমাত্র স্টেডিয়াম যেখানে ২০২৬ বিশ্বকাপসহ তিনবার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এছাড়াও বিশ্ব ফুটবলের দুই কিংবদন্তি মুহূর্ত এখানে হয়েছে , পেলে–এর ব্রাজিল জয় হয় ১৯৭০ সালে এবং ম্যারাডোনার “Hand of God” ও “Goal of the Century” করে ১৯৮৬ সালে।

এস্তাদিও আকরন (গুয়াদালাহারা) : আধুনিক নকশার এই স্টেডিয়ামটি মেক্সিকোর অন্যতম সুন্দর ভেন্যু হিসেবে পরিচিত। স্টেডিয়ামটি এমনভাবে ডিজাইন করা যেন এটি একটি “সবুজ পাহাড়ের মতো” দেখায়। ভেতরের কাঠামো এমন যে শব্দ প্রতিধ্বনি (acoustics) শক্তিশালী হয়। যেখানে একসাথে বসতে পারে প্রায় ৪৫,৬৬৪ জন। পাহাড়ি পরিবেশে নির্মিত হওয়ায় এর দৃশ্য আরও আকর্ষণীয়। আগ্নেয়গিরি-অনুপ্রাণিত স্থাপত্যশৈলীর এই স্টেডিয়ামটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এবং গ্রুপপর্বের ম্যাচ আয়োজন করবে। আধুনিক মেক্সিকান স্টেডিয়াম ডিজাইনের অন্যতম প্রতীক এ স্টেডিয়াম।

এস্তাদিও বিবিভিএ (মন্টেরে) : মোন্টেরে শহরের এই স্টেডিয়ামটি আধুনিক স্থাপত্য ও উচ্চ প্রযুক্তির সুবিধার জন্য পরিচিত। যার ধারণক্ষমতা ৫১,২৪৩ জন। “Cerro de la Silla” পাহাড় থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এটি ডিজাইন করা। এস্তাদিও বিবিভিএ এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এখানে বৃষ্টির পানি পুনঃব্যবহারের ব্যবস্থা সহ প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপের সাথে সংযুক্ত করে এমন করে ডিজাইন করা। পাহাড়ঘেরা মনোরম পরিবেশে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটি আধুনিক নকশার জন্য পরিচিত এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আয়োজন করবে।

কানাডার স্টেডিয়াম
বিসি প্লেস (ভ্যানকুভার) : ভ্যানকুভারের আইকনিক ইনডোর স্টেডিয়াম। এ স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা প্রায় ৫২,৪৯৭ জন দর্শক। আধুনিক রিট্র্যাকটেবল ছাদযুক্ত এই স্টেডিয়ামটি কানাডার অন্যতম প্রধান ভেন্যু। বিসি প্লেস এর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্টেডিয়ামের ছাদ প্রায় ২০ মিনিটে খোলা বা বন্ধ করা যায়, LED ফ্যাসাড আছে, যা রাতে আলো-শো প্রদর্শন করতে পারে, ইনডোর থেকে আউটডোর স্টেডিয়ামে রূপান্তরযোগ্য। এচাড়াও আধুনিক কুলিং সিস্টেম এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এখানে গ্রুপপর্বসহ নকআউট ম্যাচও অনুষ্ঠিত হবে। 
বিএমও ফিল্ড (টরন্টো) : মাল্টি-স্পোর্টস কনভার্টেবল ডিজাইন করা টরন্টোর এই স্টেডিয়ামটি মূলত ফুটবলের জন্য তৈরি। এর ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৩,০৩৬ জন দর্শক। কানাডার প্রথম “dedicated soccer stadium” এটি। কানাডার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল ভেন্যু হিসেবে এটি পরিচিত। বিশ্বকাপের জন্য অস্থায়ীভাবে ধারণক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং আধুনিকায়ন করা হয়েছে। ফলে এটি কানাডার ম্যাচগুলোর কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেডিয়াম (প্রথম অংশ)
মেটলাইফ স্টেডিয়াম (নিউ জার্সি) : এর ধারণক্ষমতা প্রায় ৮০,৬৬৩ জন দর্শক। বিশ্বকাপ ফাইনালসহ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের ভেন্যু। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ স্টেডিয়াম।

এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়াম (ডালাস) : বিশাল কাচের গম্বুজ ও আধুনিক প্রযুক্তির জন্য বিখ্যাত। এর ধারণক্ষমতা প্রায় ৭০,৬৪৯ জন দর্শক। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশাল স্ক্রিনের জন্য বিখ্যাত এবং সবচেয়ে বেশি ম্যাচ আয়োজন করবে।

সোফাই স্টেডিয়াম (লস অ্যাঞ্জেলেস) : ফিউচারিস্টিক ডিজাইনের এই স্টেডিয়ামটি বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ক্রীড়া ভেন্যুগুলোর একটি। অত্যাধুনিক মিডিয়া ও আর্কিটেকচারের জন্য পরিচিত। এর ধারণক্ষমতা প্রায় ৭০,৪৯২ জন দর্শক।

অ্যারোহেড স্টেডিয়াম (কানসাস সিটি) : বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চশব্দপূর্ণ স্টেডিয়ামগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। যার ধারণক্ষমতা প্রায় ৬৯,০৪৫ জন দর্শক। তীব্র দর্শক পরিবেশের জন্য পরিচিত, বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় ভেন্যু।

আরও পড়ুন : বিশ্বকাপের জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আজ, দেখবেন যেভাবে
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেডিয়াম (দ্বিতীয় অংশ)
লেভিস স্টেডিয়াম (সান ফ্রান্সিসকো): সবুজ প্রযুক্তি ও আধুনিক অবকাঠামোর জন্য পরিচিত। এর ধারণক্ষমতা প্রায় ৬৮,৮২৭ জন দর্শক। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক স্টেডিয়াম, বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের ভেন্যু।

এনআরজি স্টেডিয়াম (হিউস্টন) : রিট্র্যাকটেবল ছাদযুক্ত স্টেডিয়াম, যেখানে গ্রুপপর্ব ও নকআউট ম্যাচ হবে। এখানে একযোগে বসতে পারবে প্রায় ৬৮,৭৭৭ জন দর্শক।

মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম (আটলান্টা) : রিট্র্যাকটেবল ছাদ ও উন্নত স্কোরবোর্ডসহ একটি আধুনিক ভেন্যু। ঘূর্ণায়মান ছাদ ও শক্তি-সাশ্রয়ী ডিজাইনের জন্য বিখ্যাত। এর ধারণক্ষমতা প্রায় ৬৮,২৩৯ জন দর্শক।

লিংকন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ড (ফিলাডেলফিয়া): ফুটবল ও আমেরিকান ফুটবলের জনপ্রিয় ভেন্যু। ফুটবলের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত জনপ্রিয় এ ভেন্যুর ধারণক্ষমতা প্রায়৬৮,৩২৪ জন দর্শক ।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেডিয়াম (তৃতীয় অংশ)
লুমেন ফিল্ড (সিয়াটল): সমুদ্রের কাছাকাছি অবস্থিত, দর্শকদের উচ্ছ্বাসের জন্য বিখ্যাত এ স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা প্রায় ৬৬,৯২৫ জন দর্শক ।

হার্ড রক স্টেডিয়াম (মায়ামি): মিয়ামির আধুনিক ও বহুমুখী ক্রীড়া ভেন্যু। সমুদ্রতীরবর্তী পরিবেশে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটি দর্শকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। এর ধারণক্ষমতা প্রায় ৬৪,৪৭৮ জন দর্শক।

গিলেট স্টেডিয়াম (বস্টন): নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের অন্যতম প্রধান স্টেডিয়াম। ঐতিহাসিক এ ক্রীড়া ভেন্যু, গুরুত্বপূর্ণ নকআউট ম্যাচ আয়োজন করবে।এর ধারণক্ষমতা প্রায় ৬৪,১৪৬ জন দর্শক।

এবারের বিশ্বকাপকে ফিফা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও বিস্তৃত টুর্নামেন্ট বলা হচ্ছে। মোট ৪৮ দলকে ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। গ্রুপপর্ব থেকে নকআউট পর্যন্ত মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।
মাঠের বাইরেও রয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি—আধুনিক প্রযুক্তি, রিট্র্যাকটেবল ছাদ, উন্নত কুলিং ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম টার্ফ বদলে প্রাকৃতিক ঘাস স্থাপনসহ নানা পরিবর্তন আনা হয়েছে বিভিন্ন স্টেডিয়ামে।
ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে অবস্থিত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, যেখানে ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন নির্ধারিত হবে।
ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বিশ্বকাপ ২০২৬ কেবল একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়, বরং তিন দেশের মিলিত এক বিশাল উৎসব। আধুনিক স্থাপত্য, বিশাল দর্শক ধারণক্ষমতা এবং বৈচিত্র্যময় ভেন্যুগুলো এবারের বিশ্বকাপকে ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আসরগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।