নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের দেওয়া আসল সিলযুক্ত রসিদ (বাঁয়ে সবুজ রং), কর্মচারীর দেওয়া নকল সিলযুক্ত রসিদ (ডানে লাল রং) © টিডিসি সম্পাদিত
ব্যাংকের সিল ও স্বাক্ষর জালিয়াতি করে শিক্ষার্থীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত মোহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের ‘কাম কম্পিউটার টাইপিস্ট’ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এ অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযুক্ত শাহাদাত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ব্যাংকে ফি জমা দেওয়ার কথা বলে নগদ অর্থ নিতেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যাংকে টাকা জমা না দিয়ে নিজের কাছে রাখা একটি নকল সিল শিক্ষার্থীদের রসিদে ব্যবহার করতেন। শিক্ষার্থীরা ব্যাংকের সিল ও স্বাক্ষর দেখে আশ্বস্ত হলেও প্রকৃতপক্ষে ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে না গিয়ে জমা হতো তার পকেটে।
অত্যন্ত সুকৌশলে এ জালিয়াতি চললেও গত ১৪ এপ্রিল একটি সামান্য বানানের অসংগতিতে ফাঁস হয়ে যায় সব রহস্য। অগ্রণী ব্যাংক নোবিপ্রবি শাখার আসল সিলে ইংরেজি অক্ষরে ‘Cash Receive’ লেখা থাকলেও, শাহাদাতের তৈরিকৃত নকল সিলে লেখা ছিল ‘Cash Received’। রসিদে ইংরেজি শব্দের এক বর্ণের সামান্য অসংগতি একই দপ্তরের অন্য কর্মকর্তাদের নজরে এলে বেরিয়ে আসে অর্থ আত্মসাতের তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ জালিয়াতিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৪টি রসিদ শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে নকল সিল ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, অল্প সময়ে তার এ জালিয়াতি ধরা পড়ায় টাকার অঙ্ক বড় হয়নি। এছাড়া কেবল শাহাদাতের একার পক্ষে এত বড় জালিয়াতি করা সম্ভব নয়। এর পেছনে দপ্তরের ভেতরে বা বাইরে কোনো প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশও থাকতে পারে।
আসল সিলে ইংরেজি অক্ষরে ‘Cash Receive’ লেখা থাকলেও, শাহাদাতের তৈরিকৃত নকল সিলে লেখা ছিল ‘Cash Received’। রসিদে ইংরেজি শব্দের এক বর্ণের সামান্য অসংগতি একই দপ্তরের অন্য কর্মকর্তাদের নজরে এলে বেরিয়ে আসে অর্থ আত্মসাতের তথ্য।
ঘটনার পর অভিযুক্ত ঐ কর্মচারীকে বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগ অফিসে বদলি করা হয়েছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের ডেপুটি কন্ট্রোলার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট আসার পর প্রশাসন পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
অগ্রণী ব্যাংকের নোবিপ্রবি শাখার ম্যানেজার জুলফিকার হায়দার বলেন, ‘এক কর্মকর্তা আমাদের ব্যাংকের অফিসারকে মোবাইলে কয়েকটি রসিদের ছবি দেখাতে এসেছিলেন। তখন আমরা সেটি আমাদের সিল নয় বলে শনাক্ত করেছি। ব্যাংকের সিল অত্যন্ত নিরাপত্তার সাথে করা, কেউ সেটি নকল করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে স্বাক্ষরগুলো চেক করলে জালিয়াতি করা হয়েছে কিনা, সেটি সহজেই ধরা যায়। আমরা প্রশাসনের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ রাখছি।’
জানা গেছে, গত ৩০ এপ্রিল ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। এতে আহবায়ক করা হয়েছে রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল আলমকে। এছাড়াও সদস্য সচিব হিসেবে রেজিস্ট্রার দপ্তরের কাউন্সিল শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং হিসাব পরিচালক দপ্তরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. হুমায়ুন কবিরকে সদস্য করা হয়।
আরও পড়ুন: ফল প্রকাশের পর খাতা দেখা ও পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ চান মাভাবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ তামজিদ হোছাইন চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনাটি সম্পর্কে আমরা অবগত। ইতিমধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তদন্ত কমিটির আহবায়ক ও রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল আলম বলেন, ‘এই মুহূর্তে পুরো ঘটনা সম্পর্কে বলতে পারছি না। তবে গতকালই তদন্ত কমিটির সদস্যরা বসেছি। তদন্তের জন্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের কাছে বিভিন্ন ডকুমেন্টস চাওয়া হয়েছে। সেগুলো পর্যালোচনা করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাক্ষাৎকার শেষে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে।’
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে একজনের নাম এসেছে। এখন শাহাদাত কতটুকু দোষী বা আর কেউ জড়িত আছে কি না, সেটা তদন্ত পুরোপুরি শেষ হলে জানা যাবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত কর্মচারী শাহাদাতকে কয়েকবার ফোন করে পাওয়া যায়নি। অনলাইনে মেসেজ দিয়েও কোন ধরনের সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘ঘটনার সুষ্ঠু বিচারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সুপারিশের আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’