মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প © সংগৃহীত
নভেম্বরে মিডটার্ম নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন পারস্য উপসাগরে মার খাওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশে দেশে চলমান মার্কিন যুদ্ধ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দেশে মূল্যস্ফীতির কারণে ভোটারদের আস্থা হারিয়েছেন ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মিডটার্ম নির্বাচন জিততে এবার আর্থিক প্রলোভন দেখাচ্ছেন তিনি। নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি জিতলে প্রত্যেক ভোটারকে ৫০০০ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তবে ঠিক কীভাবে তা পরিশোধ করবেন তিনি? অর্থ কোথায় পাবেন? আর সে দেশের আইনই বা কি বলে?
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে টেক্সাসে রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। তার বক্তব্যে সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও ডেমোক্র্যাটরা এটিকে ‘ফাঁকা প্রতিশ্রুতি’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই খরচ করতে হবে। তবে কীভাবে এই অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করা হবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দিয়েছেন, শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্ব দিয়ে এই অর্থের ব্যবস্থা করা হতে পারে। তবে ধনী মার্কিন নাগরিকরা এই অর্থ পাবেন না বলেও তিনি জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনে ভোটারদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি বেআইনি। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবকে কর কমানোর প্রতিশ্রুতির মতো একটি নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা আইনসম্মত।
সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রভাষক ড. জোয়ান মাহোনি জানান, তিনি মনে করেন ট্রাম্পের প্রস্তাবটি আইনসম্মত হতে পারে। তবে রাজনীতিকরা সাধারণত এত সরাসরি এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেন না।
তিনি বলেন, ‘একদিকে এটি কিছুটা ঘুষের মতো শোনায়—রিপাবলিকানদের ভোট দিন, তাহলে আপনি অর্থ পাবেন। এটি স্পষ্টতই বেআইনি হবে। কিন্তু অন্যদিকে, ভোটার কীভাবে ভোট দিয়েছেন তা বিবেচনা না করেই যদি সবাই এই অর্থ পান, তাহলে এটিকে সেই অর্থে ঘুষ বলা যায় না।’
তবে চ্যাথাম হাউসের যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর আমেরিকা কর্মসূচির পরিচালক লরেল র্যাপ মনে করেন, ট্রাম্পের প্রস্তাব সাধারণ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির চেয়ে ‘খুব ভিন্ন ও সরাসরি লেনদেনভিত্তিক’।
৫ হাজার ডলার দিতে খরচ হবে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রস্তাবটির আইনগত দিকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ২৭ কোটি। প্রত্যেককে ৫ হাজার ডলার করে দিতে হলে সরকারের প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হবে।
তবে এই অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প কোনো বিস্তারিত পরিকল্পনা দেননি। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেয় কংগ্রেস। কিন্তু এই অর্থ বিতরণের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়েও ট্রাম্প কিছু বলেননি।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এত বড় অঙ্কের অর্থ বিতরণ করা সম্ভব হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ওয়াশিংটনভিত্তিক ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ এরিকা ইয়র্ক বলেন, কংগ্রেস এমন কোনো প্রস্তাব অনুমোদন করলে তিনি ‘অত্যন্ত বিস্মিত’ হবেন।
তার ভাষায়, ‘১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যবহারের এটি সবচেয়ে খারাপ উপায়গুলোর একটি। আমাদের অর্থনীতি এমন একটি পথে রয়েছে যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দেন, শুল্ক থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে এই অর্থ দেওয়া হতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত শুল্ক ও আবগারি কর থেকে পাওয়া রাজস্ব ট্রাম্পের ঘোষিত অর্থের তুলনায় অনেক কম। দ্বিদলীয় নীতি কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক ও আবগারি কর থেকে প্রায় ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এর মধ্যে চলতি বছরের শুরুতে সুপ্রিম কোর্ট অনেক শুল্ক বাতিল করার পর ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের ঘোষিত অর্থ কীভাবে দেওয়া হবে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস বিবিসিকে এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘হতাশাবাদী ও সমালোচকেরা ধারাবাহিকভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।’ হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গল বলেন, ‘আমেরিকান জনগণের অব্যাহত সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বাস্তব ফলাফল দিতে থাকবেন।’
সাবেক রিপাবলিকান কৌশলবিদ ও জনমত জরিপকারী রবার্ট মরান মনে করেন, নভেম্বরের নির্বাচন সামনে রেখেই ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে দেখতে হবে। তিনি বলেন, ‘এটি অসাধারণ একটি প্রতিশ্রুতি। এই অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই—তবে এখন নির্বাচনি মৌসুম চলছে।’
চ্যাথাম হাউসের লরেল র্যাপ বলেন, ক্ষমতার মেয়াদের শেষ দুই বছরে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ট্রাম্প স্বল্পমেয়াদি কৌশল হিসেবে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি সামনে আনছেন। তার মতে, ‘রিপাবলিকানদের জনমত ভালো দেখাচ্ছে না এবং ট্রাম্পের অবস্থাও ভালো নয়। এ কারণেই এখন তিনি অর্থের বিষয়টি সামনে আনছেন।’
এর আগে শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্ব দিয়ে ২ হাজার ডলারের চেক দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে সেই অর্থ এখনো বিতরণ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে ভোটের আগে ভোটারদের নজর কাড়তে এমন জনতুষ্টিমুলক অঙ্গীকার দেওয়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে জর্জিয়ার সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২ হাজার ডলারের কোভিড প্রণোদনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ নিয়ে তাকে ভোট কেনার অভিযোগের মুখেও পড়তে হয়েছিল। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগেও একই ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সে সময় ট্রাম্পের সমর্থক ধনকুবের ইলন মাস্ক সাতটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে নিবন্ধিত ভোটারদের একটি নির্দিষ্ট পিটিশনে স্বাক্ষর করার বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।