ক্রিস্টা পাইক © টিডিসি ফটো
প্রেমিককে সঙ্গে নিয়ে কলেজের সহপাঠিনীকে হত্যার দায়ে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিস্টা পাইক। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হলেও দুই দফা বিষাক্ত ইঞ্জেকশন প্রয়োগের পরও থামেনি তার হৃদ্স্পন্দন। পরে শ্বাসকষ্ট ও শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিরল এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা।
ক্রিস্টার শরীরে ৯০ মিনিটের ব্যবধানে দুটি বিষাক্ত ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করা হয়। তবে তাতেও তার মৃত্যু হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পর্দার আড়ালে ক্রিস্টাকে শ্বাস নিতে এবং নড়াচড়া করতে দেখা যায়। পরে তাকে ন্যাশভিলের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
টেনেসির অ্যাটর্নি জেনারেলের দফতর জানিয়েছে, সব নিয়মনীতি মেনেই ক্রিস্টার শরীরে ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করা হয়েছিল। তবে আইন অনুযায়ী, এর পর আর কোনো বিষাক্ত ইঞ্জেকশন তার শরীরে প্রয়োগ করা যাবে না। ঘটনার পর চলতি বছরের জন্য ওই প্রদেশে সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ক্রিস্টার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বিরল। দুইশ বছরের ইতিহাসে ওই প্রদেশে প্রথম কোনো নারী আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা হিসেবে এটি আলোচনায় আসে। দীর্ঘদিন ধরে তার সাজা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র বিতর্কও চলেছে। কেউ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, আবার মানবাধিকার সংগঠনসহ অনেকে এর বিরোধিতা করেছেন। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথই খোলা রাখে।
ঘটনাটি জানতে হলে ফিরতে হবে ১৯৯৫ সালে। ওই বছর নক্সভিলের একটি কলেজে ভর্তি হন ক্রিস্টা। একই কলেজে ভর্তি হয় তার তৎকালীন প্রেমিক ও আরেক বন্ধু। কিছুদিন পর কলেজের এক সহপাঠিনীর প্রতি ক্রিস্টার মনে হিংসা জন্ম নেয়। তার ধারণা ছিল, ওই তরুণী তার প্রেমিককে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এই ক্ষোভ থেকেই প্রেমিক ও বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে সহপাঠিনীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন ক্রিস্টা। কলেজের একটি নির্জন জায়গায় মাদকের প্রলোভন দেখিয়ে ওই তরুণীকে নিয়ে যান তারা। সেখানে শুরু হয় নির্মম নির্যাতন।
ক্রিস্টা ও তার প্রেমিক প্রায় ৩০ মিনিট ধরে ওই তরুণীকে মারধর করেন। আর তাদের বন্ধু দাঁড়িয়ে থেকে পাহারা দেন। একপর্যায়ে জীবিত অবস্থায় ওই তরুণীর বুকে ছুরি দিয়ে পঞ্চভুজ আঁকেন ক্রিস্টা। এরপর তার প্রেমিক পাথর দিয়ে আঘাত করে তরুণীর খুলি থেঁতলে দেন।
এমনকি নিহত তরুণীর খুলির একটি হাড়ের টুকরো সঙ্গে রেখে দিয়েছিলেন ক্রিস্টার প্রেমিক। পরে সেটিকে জয়চিহ্ন হিসেবে সহপাঠীদের দেখাতেন তিনি। তবে হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
হত্যার সময় ক্রিস্টার প্রেমিকের বয়স ছিল ১৭ বছর। কিশোর হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। প্যারোলের সুযোগসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাকে। ২০২৫ সালে তার প্যারোলের আবেদনও নাকচ করে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ক্রিস্টার ওই বন্ধু সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি। তিনি শুধু পাহারা দেওয়ার কাজ করেছিলেন। ঘটনার পর পুলিশকে সব তথ্য জানিয়ে তদন্তে সহায়তা করেন এবং নিজের দোষও স্বীকার করেন। পরে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে প্রতিদিন একজন কর্মকর্তার সামনে হাজিরা দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়।
ক্রিস্টার বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। ১৯৯৬ সালে আদালত তাকে বিষাক্ত ইঞ্জেকশন অথবা বিদ্যুতের ঝটকা দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেন। রায়ের পর নিহত তরুণীর মা জানিয়েছিলেন, তার মেয়ের খুনির মৃত্যুদণ্ডই হওয়া উচিত।
তবে কারাগারে যাওয়ার পরও ক্রিস্টাকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। ২০০১ সালে সংশোধনাগারে থাকা অবস্থায় আরেক আসামিকে প্রাণঘাতীভাবে আক্রমণ ও মারধরের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ ছিল, তিনি ওই আসামির গলায় জুতোর ফিতা পেঁচিয়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন।
এরপরও ক্রিস্টার মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেন অনেকে। এর অন্যতম কারণ ছিল তার শৈশবের কঠিন অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্রিস্টার মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার আবেদন জানিয়ে ২২৬ পাতার একটি আবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল।
ক্রিস্টার আইনজীবী দাবি করেছিলেন, কিশোরী বয়সে একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি তিনি মানসিক অবসাদেও ভুগছিলেন। আইনজীবীর যুক্তি ছিল, ১৮ বছর বয়সে কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বিকাশ পুরোপুরি সম্পন্ন হয় না। ফলে হত্যাকাণ্ডের সময় ক্রিস্টা আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষম ছিলেন।
তবে শেষ পর্যন্ত এসব যুক্তি তার মৃত্যুদণ্ড ঠেকাতে পারেনি। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের পর ৯০ মিনিটের ব্যবধানে ক্রিস্টার শরীরে দুটি বিষাক্ত ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করা হয়।
কিন্তু প্রত্যাশিতভাবে তার হৃদ্স্পন্দন থামেনি। ইঞ্জেকশন প্রয়োগের পর তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। একটি হাতেও সমস্যা দেখা দেয়। পরে চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আপাতত চলতি বছরের জন্য প্রদেশটিতে সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত রাখা হয়েছে।