কোলাজ ছবি © সংগৃহীত
নোবেল শান্তি পুরস্কারের দৌড়ে এবার আলোচনায় আছেন বিশ্ব রাজনীতির পরিচিত কয়েকজন নেতা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস), যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে কাজ করা মানবিক সংগঠন ও আন্তর্জাতিক আদালত। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, ইউক্রেনের শিশু অধিকারকর্মী মাইকোলা কুলেবা, ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’, সুদানের ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’, ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)।
আগামী ৯ অক্টোবর নরওয়ের রাজধানী অসলোতে এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিজয়ীর নাম ঘোষণা করবে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি। এ বছর পুরস্কারের জন্য মোট ২৮৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশের কিছু বেশি প্রার্থী বিভিন্ন সংগঠন।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন
এবার নোবেল শান্তি পুরস্কার মহাকাশে চলে গেলেও খুব একটা অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না বলে মনে করছেন পুরস্কার বিশ্লেষকেরা। তাদের পূর্বাভাসে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে (আইএসএস) অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলো (পিআরআইও)-এর পরিচালক হাকন গ্যেরলভ নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে অন্যতম আলোচিত পূর্বাভাসদাতা। তার মতে, আইএসএস অথবা এর পেছনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি বিরল প্রতীক।
মহাকাশে মানবজাতির যৌথ অনুসন্ধানের এই উদ্যোগ এমন সময়ে চলছে, যখন বহুপক্ষীয় সহযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং বিভিন্ন দেশ নিজেদের জাতীয় স্বার্থের দিকে বেশি ঝুঁকছে। ফলে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে সহযোগিতা ও শান্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প
নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারে নিজের আগ্রহের কথা একাধিকবার জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ বছরও তাকে পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
তবে ট্রাম্পকে পুরস্কার দেওয়া হলে তা বিতর্ক তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, সেটি এখনো চলমান।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ট্রাম্পের নাম থাকলেও তার এই অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে।
মার্ক কার্নি
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও। চলতি বছর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন বিষয়ে তার ভূমিকা আলোচনায় এসেছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থানের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় কার্নি আলোচনায় রয়েছেন।
মাইকোলা কুলেবা ও ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’
ইউক্রেনের শিশু অধিকারকর্মী মাইকোলা কুলেবাও এ বছরের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন। যুদ্ধের মধ্যে শিশুদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে রাখায় তার নাম আলোচনায় এসেছে।
তার সঙ্গে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংগঠন ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’। যুদ্ধ ও সংকটকবলিত অঞ্চলে শিশুদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
সুদানের ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’
সুদানের ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’ও এবারের আলোচিত সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি। এটি স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা একটি ত্রাণ ও জরুরি সেবাদানকারী নেটওয়ার্ক।
সুদানে চলমান সংঘাতের মধ্যে সাধারণ মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে এসব স্থানীয় উদ্যোগ কাজ করছে। যুদ্ধের মধ্যে বেসামরিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে সংগঠনটির নাম নোবেল শান্তি পুরস্কারের আলোচনায় এসেছে।
‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করা ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার প্রায় ৪৫ বছরের মধ্যে গত দুই বছর ছিল সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী সময়। এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা নোবেল শান্তি পুরস্কারের আলোচনায় এসেছে।
আইসিজে ও আইসিসি
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)—এই দুটি আন্তর্জাতিক আদালতকেও যৌথভাবে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বিভিন্ন দেশের ক্ষমতাধর নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে আলোচনায় রয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আইসিসি। এ কারণে আদালতটি যেমন সমালোচনার মুখে পড়েছে, তেমনি অনেকের প্রশংসাও পেয়েছে।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে আইসিসির সমালোচনা করে আসছেন। গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আইসিসি যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য যে হুমকি তৈরি করছে, তা ‘ধ্বংস’ করার একটি অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন।
এরই মধ্যে জুলাইয়ের শেষ দিকে যৌন অসদাচরণের অভিযোগের পর আইসিসির প্রধান কৌঁসুলিকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ট্রাম্পকে ঘিরে বিতর্ক আরও জটিল
ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাবকে ঘিরে এবারের নির্বাচন আরও জটিল হয়ে উঠেছে ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ভেনেজুয়েলার মারিয়া কোরিনা মাচাদোর একটি প্রতীকী পদক্ষেপের কারণে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী অপহরণ করার কয়েক দিন পর মাচাদো তার পাওয়া নোবেল পুরস্কারটি ট্রাম্পকে দেওয়ার প্রতীকী উদ্যোগ নেন।
হাকন গ্যেরলভের মতে, এ কারণে এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারের নির্বাচন আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ-সংঘাতের মধ্যেই এবারের পুরস্কার
এবার নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত চলছে। সুদান, ইউক্রেন, ইয়েমেন, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইউপসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক শন ডেভিস বলেন, ‘আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় পরিবর্তন’ দেখা যাচ্ছে। তার মতে, এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন কার্যকর করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়টিও জড়িত।
তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখন কিছু ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থার লঙ্ঘনকারীতে পরিণত হয়েছে।
ডেভিস বলেন, ‘আমি মনে করি না, ট্রাম্পের নিজের সমর্থকেরাও এখন বিশ্বাস করবেন’ যে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে পারেন। কারণ, ‘ইরানে চলমান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথই যেন নেই’।
নারী প্রার্থীদের মধ্যেও আলোচনায় দুই নাম
এবার নোবেল শান্তি পুরস্কারে নারীদের অংশগ্রহণের ধারাটি অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছেন ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক ভূমিমাইন নিষিদ্ধকরণ অভিযানের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া জোডি উইলিয়ামস।
১২৫ বছরের ইতিহাসে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া ১১২ জন ব্যক্তির মধ্যে মাত্র ২০ জন নারী। তবে গত ১৫ বছরে ব্যক্তিগতভাবে আটজন নারী নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। একই সময়ে পুরস্কার পেয়েছেন ছয়জন পুরুষ।
এবার সম্ভাব্য নারী প্রার্থীদের মধ্যে গাজায় কাজ করা সার্জন সারা আল-সাক্কা এবং রাশিয়ার বিরোধী রাজনীতিক ও প্রয়াত আলেক্সেই নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়ার নামও বিভিন্ন পূর্বাভাসের রয়েছে।
৯ অক্টোবর ঘোষণা
সোমবার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হবে এ বছরের নোবেল সপ্তাহ। মঙ্গলবার পদার্থবিজ্ঞান, বুধবার রসায়ন এবং বৃহস্পতিবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে।
শুক্রবার ঘোষণা করা হবে নোবেল শান্তি পুরস্কার। এরপর ১২ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কারের বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।
এ বছর নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলারের সমান। কোনো একক ব্যক্তি, ছোট একটি দল বা কোনো প্রতিষ্ঠান—যেই পুরস্কার পাক না কেন, অর্থমূল্য একই থাকবে।
তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার, তা জানা যাবে নোবেল কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরই।