বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কারের পদক © গুগল
বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর কথা উঠলে সবার আগে আসে নোবেল পুরস্কারের নাম। বিজ্ঞান, সাহিত্য কিংবা বিশ্বশান্তিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয় এই পুরস্কার। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, গবেষক ও শান্তিকর্মীদের মধ্যে যাঁরা মানুষের কল্যাণে অনন্য অবদান রাখেন, তাঁদের কাজকে স্বীকৃতি জানায় নোবেল কমিটি। তবে এ পুরস্কারের পেছনে রয়েছে এক বিচিত্র ইতিহাস।
যেভাবে পুরস্কারের সূচনা
ডিনামাইটের আবিষ্কারক সুইডিস বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেল। তাঁর নামে ৩৫৫টি পেটেন্ট ছিল। জীবনের শেষভাগে ১৮৯৫ সালে প্যারিসে নিজের শেষ উইলে তিনি অর্জিত বিপুল সম্পদে ট্রাস্ট গঠন করে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে অবদানের জন্য পুরস্কার রেখে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর পর আইনি জটিলতা কাটিয়ে ১৯০১ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো এই নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা শুরু হবে আগামীকাল সোমবার (৫ অক্টোবর)। আগামী ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ঘোষণা চলবে। সোমবার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে।
মূল উইলের বাইরে অর্থনীতি
শুরু থেকে নোবেল পাঁচটি বিভাগে দেওয়া হতো। অর্থনীতিতে পুরস্কার যুক্ত হয় অনেক পরে। ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সেরিজেস রিক্সব্যাংক’ তাদের ৩০০ বছর পূর্তিতে আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে অর্থনীতিতে একটি স্মৃতি পুরস্কার প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৬৯ সাল থেকে এটি অন্য বিভাগগুলোর সমমর্যাদায় নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে।
ডিনামাইটের আবিষ্কারক সুইডিস বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেল। তাঁর নামে ৩৫৫টি পেটেন্ট ছিল। জীবনের শেষভাগে ১৮৯৫ সালে প্যারিসে নিজের শেষ উইলে তিনি অর্জিত বিপুল সম্পদে ট্রাস্ট গঠন করে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে অবদানের জন্য পুরস্কার রেখে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর পর আইনি জটিলতা কাটিয়ে ১৯০১ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো এই নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
একাধিকবার নোবেল বিজয়ী
প্রথম নারী নোবেলজয়ী মেরি কুরি ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এবং ১৯১১ সালে রসায়নে নোবেল পান। দুই ভিন্ন বিজ্ঞানের শাখায় নোবেল পাওয়া প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তি তিনি। এছাড়া জন বারডিন, ফ্রেডরিক স্যাঙ্গার ও ব্যারি শার্পলেস দুবার করে নোবেল পেয়েছেন। তবে লিনাস পলিং একমাত্র ব্যক্তি, যিনি ১৯৫৪ সালে রসায়নে এবং ১৯৬২ সালে শান্তিতে দুটি নোবেলই এককভাবে লাভ করেন।
সর্বকনিষ্ঠ, প্রবীণ ও নারীদের প্রতিনিধিত্ব
২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ নোবেলজয়ী হিসেবে শান্তিতে নোবেল পেয়ে বিশ্বকে তাক লাগান পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই। তাঁর আগে ১৯১৫ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান অস্ট্রেলিয়ার লরেন্স ব্র্যাগ, যিনি মাত্র ২১ বছর বয়সে মূল গবেষণাটি করেছিলেন। এ ছাড়া ২০১৮ সালে ২৫ বছর বয়সে শান্তিতে নোবেল পান ইয়েজিদির নাদিয়া মুরাদ।
অন্যদিকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির উন্নয়নে অবদানের জন্য ২০১৯ সালে ৯৭ বছর বয়সে রসায়নে নোবেল পেয়ে প্রবীণতম বিজয়ী হন জন বি গুডএনাফ। তাঁর আগের বছর ২০১৮ সালে ৯৬ বছর বয়সে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছিলেন আর্থার আশকিন। নোবেলের ইতিহাসে মোট ৬৩৩টি নোবেল পুরস্কারের মধ্যে ৬৭ জন নারী সর্বমোট ৬৮ বার (মেরি কুরি দুবার) এই সম্মাননা পেয়েছেন, যা মোট পুরস্কারের প্রায় ১০ শতাংশ।
কারাবন্দী নোবেলজয়ী ও প্রত্যাখ্যান
কারাবন্দী অবস্থায় শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন পাঁচজন বিজয়ী। জার্মানির গোপন সামরিক পুনরুত্থানের তথ্য ফাঁসের অপরাধে নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী থাকা অবস্থায় ১৯৩৫ সালে নোবেল পান কার্ল ফন অসিয়েটস্কি। মিয়ানমারে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করায় নিজ বাড়িতে দীর্ঘ বছর গৃহবন্দী থাকা অবস্থায় ১৯৯১ সালে এই পুরস্কার জেতেন অং সান সু চি।
চীনে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতার দাবিতে ইশতেহার প্রকাশের কারণে ১১ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করার সময় ২০১০ সালে নোবেল পান লিউ শিয়াওবো। বেলারুশের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে মানবাধিকার রক্ষা ও আন্দোলনকারীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার সাজানো অভিযোগে কারাবন্দী থাকা অবস্থায় ২০২২ সালে পুরস্কার পান আলেস বিয়ালিয়াতস্কি।
আরও খবর: বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপনে সরকারের বড় উদ্যোগ, কীভাবে এলো দিনটি
সর্বশেষ ২০২৩ সালে, ইরানের নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন ও বাধ্যতামূলক হিজাব আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করার অপরাধে কুখ্যাত এভিন কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় পঞ্চম ব্যক্তি হিসেবে এই সম্মাননা লাভ করেন নার্গিস মোহাম্মদি। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক খেতাব বর্জনের নীতিতে ১৯৬৪ সালে সাহিত্যে নোবেল প্রত্যাখ্যান করেন ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ-পল সার্ত্র। আর ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি জানিয়ে শান্তিতে নোবেল গ্রহণ করেননি লে ডাক থো।
মরণোত্তর নোবেল ও কবিদের স্বীকৃতি
নোবেল ইতিহাসে মাত্র তিনজন মরণোত্তর নোবেল পেয়েছেন- ১৯৩১ সালে এরিক অ্যাক্সেল কার্লফেল্ট, ১৯৬১ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব ড্যাগ হ্যামারশোল্ড এবং ২০১১ সালে র্যালফ স্টেইনম্যান। স্টেইনম্যানের ক্ষেত্রে বিজয়ী ঘোষণার সময় নোবেল কমিটি জানত না যে, তিনি তিনদিন আগে মারা গেছেন। ১৯৭৪ সাল থেকে নোবেলে মরণোত্তর নাম মনোনয়নের সুযোগ বন্ধ করা হয়।
সাহিত্যে নোবেল কেবল উপন্যাসের জন্য নয়, কবিতার জন্যও দেওয়া হয়। ১৯১৩ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘গীতাঞ্জলি’ কবিতার জন্য প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে সাহিত্যে নোবেল অর্জন করেন।
স্থগিত ও পুরস্কার বিতরণী
প্রতিবছর অক্টোবর মাসে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয় এবং আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী ১০ ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয় নরওয়ের অসলোতে এবং বাকি পাঁচটি ক্যাটাগরির পুরস্কার প্রদান করা হয় সুইডেনের স্টকহোমে। তবে বিশ্বযুদ্ধসহ নানা কারণে নোবেলের ইতিহাসজুড়ে বিভিন্ন শাখায় সব মিলিয়ে ৪৯ বার এ পুরস্কার দেওয়া স্থগিত ছিল।