হারেদি নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক © সংগৃহীত
ইহুদি নববর্ষ রোশ হাশানাহ সামনে রেখে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে হারেদি ইহুদি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এটি শুধু ধর্মীয় সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন নেতা জায়নবাদবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীলদের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ফলে ট্রাম্পের এই বৈঠকের রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সি থেকে আসা রাব্বি ও অন্যান্য প্রতিনিধিরা ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিবেশে বৈঠক করেন। তাঁরা প্রেসিডেন্টের রেজল্যুট ডেস্কের বিপরীতে বসেন। এ সময় ট্রাম্পের ইহুদি জামাতা জ্যারেড কুশনারও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর অংশগ্রহণকারীরা ও তাঁদের সমর্থকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করেন।
প্রতিনিধিদলটি পরে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং নিউইয়র্কের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইক ললারের সঙ্গেও বৈঠক করে। ললার আগামী নভেম্বরে নিউইয়র্কের ১৭তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে আছেন। আসনটি মূলত উদারপন্থীদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
বৈঠকে অংশ নেওয়া নিউইয়র্কভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মী ও কট্টর ইসরায়েলপন্থী কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ইয়োসি গেস্টেটনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের হাসিদিক সম্প্রদায়ের ছয়জন শীর্ষস্থানীয় রাব্বিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের ও সৌভাগ্যের বিষয়।’
তিনি আরও লেখেন, ‘আমি ভাইস প্রেসিডেন্টকে বলেছি, এই কক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান ইহুদি জনগোষ্ঠীর নেতারা উপস্থিত রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা আলোচনা ও মতবিরোধ সত্ত্বেও তাঁর জানা উচিত, এই কক্ষে উপস্থিত সবাই তাঁর ভূমিকার প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।’
এই ছয় রাব্বির মধ্যে ছিলেন সাতমার রেবে অ্যারন টেইটেলবাউম। তিনি অর্থোডক্স ইহুদিদের জায়নবাদবিরোধী গোষ্ঠীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা। নিউইয়র্কের ইহুদি অধ্যুষিত কিরিয়াস জোয়েলে তিনি অতি রক্ষণশীল সাতমার ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন সম্প্রদায়ের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ।
প্রকাশিত ছবিতে অ্যারন টেইটেলবাউমকে ট্রাম্পের ঠিক বিপরীতে বসে থাকতে দেখা যায়। তাঁর হাতে থাকা একটি চিঠি থেকে তিনি পড়ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি-আমেরিকান লেখক ও কর্মী মিকো পেলেড বলেন, ‘আমি বলব, ওই বৈঠকে সাতমার রেবে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা ছিলেন।’
নিউইয়র্কে ইসরায়েল সরকারের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিক্ষোভে প্রায়ই দেখা যায় রাব্বি ইসরায়েল ডোভিদ ওয়েইসকে। তিনি বলেন, জায়নবাদবিরোধী রাজনীতির ক্ষেত্রে সাতমার সম্প্রদায়ের অবস্থান তাঁর নিজের সংগঠন নেতুরেই কার্তা ইন্টারন্যাশনালের তুলনায় ‘আরও ভারসাম্যপূর্ণ, আরও সতর্ক’।
তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, আনুষ্ঠানিকভাবে এটি রাজনৈতিকভাবে সঠিক হবে না যে তারা এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করবে, যারা দ্ব্যর্থহীনভাবে ইসরায়েলের জায়নবাদী রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার আহ্বান জানায়।’
প্রতিনিধিদলের এই সফরের পেছনে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মিকো পেলেড। তিনি বলেন, ‘আমার বোঝাপড়া অনুযায়ী, প্রতিনিধিদলটি দুটি বিষয় স্পষ্ট করতে চেয়েছিল। প্রথমত, তারা জায়নবাদের বিরোধিতা করে এবং তারা জায়নবাদী নয়—এ বিষয়টি পরিষ্কার করা। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েল সরকার এখন তাদের সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কারণ তাদের প্রায় ৮০ হাজার তরুণকে এখন সামরিক বাহিনীতে যোগ না দেওয়ার কারণে সেনাবাহিনীর নিয়োগ এড়িয়ে যাওয়া ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।’
হারেদি ইহুদিরা প্রায়ই ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। এসব বিক্ষোভে অনেক সময় ইসরায়েলি পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষও হয়।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় হারেদি ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি সীমিত ও বিশেষ সুবিধা হিসেবে শুরু হয়েছিল। পরে এই সুবিধা ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে হাজার হাজার হারেদি ইহুদি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া থেকে অব্যাহতি পান। এ নিয়ে ইসরায়েলি সমাজে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।
২০০৯ সালে ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ ছিল হারেদি ইহুদিরা। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যায় তাঁদের অংশ প্রায় ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
হারেদি ইহুদিদের কিছু গোষ্ঠী এখনো কঠোরভাবে জায়নবাদবিরোধী। তারা ইসরায়েল রাষ্ট্রের বৈধতাই স্বীকার করে না। আবার অন্য কিছু গোষ্ঠী ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক জোটগুলোর সঙ্গে কাজ করে নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক স্বায়ত্তশাসন রক্ষার চেষ্টা করে।
বৈঠকটি এমন সময়ে হয়েছে, যখন ইসরায়েলের নির্বাচনের আর ছয় সপ্তাহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আট সপ্তাহ বাকি। উভয় নির্বাচনেই ট্রাম্পের প্রভাব উল্লেখযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
মিকো পেলেড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকটিকে ‘বড় ঘটনা’ এবং ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, বৈঠকটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে প্রতিনিধিদলকে বহনকারী ব্যক্তিগত বিমানগুলো ওয়াশিংটনে পৌঁছাতে দেরি করলেও ট্রাম্প বৈঠকের সময় পিছিয়ে দিতে সম্মত হন।
এর পেছনে রাজনৈতিক কারণও থাকতে পারে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসম্যান মাইক ললারের নির্বাচনী আসনের মধ্যেই কিরিয়াস জোয়েল অবস্থিত। আগামী নভেম্বরে কঠিন নির্বাচনী লড়াইয়ের মুখোমুখি ললার। ফলে ওই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ইহুদি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে জানান, ‘১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম এই রাব্বিদের এই দলটি হোয়াইট হাউসে একসঙ্গে বৈঠক করেছে।’
তবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও বিল ক্লিনটনের সময়ও কিছু হাসিদিক নেতা হোয়াইট হাউসে তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। ফলে বৃহস্পতিবারের বৈঠকটি ১৯৭৯ সালের পর প্রথম কি না, তা নির্ভর করছে কোন নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতাদের বোঝানো হচ্ছে তার ওপর।
হোয়াইট হাউসের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় প্রেসিডেন্টের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ, মধ্যবিত্ত কর সুবিধার মাধ্যমে স্কুল বেছে নেওয়ার সুযোগের পক্ষে তাঁর অবস্থান এবং ধর্মবিশ্বাসী মানুষের অধিকার রক্ষায় তাঁর ভূমিকার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘হোয়াইট হাউসের ধর্মীয় বিশ্বাসবিষয়ক দপ্তর নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ধর্মের আমেরিকানদের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য নিয়ে আসে। ইহুদি সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে তারা গাজায় আটক সাবেক জিম্মিদের পরিবার ও সাবেক জিম্মিদের, হলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের এবং ইহুদি ধর্মের বিভিন্ন শাখার রাব্বিদের হোয়াইট হাউসে নিয়ে এসেছে।’
তবে এই বৈঠককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন কেউ কেউ। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সিনেটর কমলা হ্যারিসের সাবেক নীতিবিষয়ক সহকারী এবং বর্তমানে জিউইশ ডেমোক্রেটিক কাউন্সিল অব আমেরিকার প্রধান হ্যালি সোইফার মনে করেন, বৈঠকটি রিপাবলিকানদের একটি ‘সংকীর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য’ পূরণে সহায়তা করেছে।
তিনি বলেন, ‘শুধু হাসিদিক পুরুষদের একটি গোষ্ঠীকে বেছে নেওয়ার বিষয়টি ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধরন অনুযায়ীই হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিনি ইহুদি নেতাদের একটি খুব ছোট ও প্রতিনিধিত্বহীন অংশকে হোয়াইট হাউসে এনেছেন এবং একই সঙ্গে এমন একজন ঝুঁকিপূর্ণ রিপাবলিকান বর্তমান কংগ্রেস সদস্যকে সেখানে রাখতে নিশ্চিত হয়েছেন, যিনি নভেম্বরে তাঁর আসন হারাতে পারেন।’
সোইফার সাতমার সম্প্রদায়কে একটি প্রান্তিক গোষ্ঠী হিসেবে ইঙ্গিত করে বলেন, ইহুদিরা কোনো একক গোষ্ঠী নয়।
তিনি বলেন, ‘বাইডেন প্রশাসনের সময় হোয়াইট হাউস ও ইহুদি নেতাদের মধ্যে বড় ধর্মীয় উৎসবের আগে যে ধরনের বৈঠক হতো, সেখানে সবসময় কিছু রাব্বি থাকতেন, যার মধ্যে অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও থাকতেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে সেখানে ইহুদি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মতাদর্শ ও ধর্মীয় ধারার বিস্তৃত প্রতিনিধিত্বও থাকত।’