ইয়েমেনে পুনরায় তেল রপ্তানি শুরু, তবুও কাটছে না অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে অনিশ্চয়তা

২৪ জুলাই ২০২৬, ১১:২৯ AM , আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১১:৩০ AM
ইয়েমেনের মারিবের সাফার তেলক্ষেত্রের তেল কূপ

ইয়েমেনের মারিবের সাফার তেলক্ষেত্রের তেল কূপ © সংগৃহীত

নিরাপত্তা সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে তেল রপ্তানি পুনরায় শুরু হলেও অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে রয়ে গেছে অনিশ্চয়তা। ইয়েমেনে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর তেল রপ্তানি পুনরায় শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) প্রধান রশাদ আল-আলিমি জানিয়েছেন, ২০ জুলাই থেকে আবারও তেল রপ্তানি শুরু হয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস ফিরে পাওয়ায় অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইয়েমেন সরকারের জন্য এটি নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হবে না। বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তেলক্ষেত্র, পাইপলাইন, বন্দর ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় কার্যকর করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিমা কোম্পানিগুলোর আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

ইয়েমেন সরকারের আশা, তেল থেকে পাওয়া রাজস্ব সরকারি কর্মীদের বেতন পরিশোধ, জনসেবা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে। তবে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ এখনো হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটেনি।

তেলের মজুত ও উৎপাদনের অবস্থা
ইয়েমেনে আনুমানিক তিন বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে। এসব মজুত প্রধানত মাসিলা, মারিব ও শাবওয়া অববাহিকায় কেন্দ্রীভূত। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এখনো তেল উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা রয়েছে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তা কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

২০০০ সালের শুরুতে ইয়েমেনের তেল উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছিল। কিন্তু পুরোনো তেলক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ২০১৪ সালে যুদ্ধ শুরুর পর তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন দ্রুত কমতে থাকে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ ইয়েমেনের তেল উৎপাদন দৈনিক প্রায় ১৯ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে। অন্যদিকে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রপ্তানি বন্ধ থাকার পর ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্রকৃত উৎপাদন দৈনিক ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার ব্যারেলের মধ্যে ছিল, যার বেশিরভাগই দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে চলে গেছে।

ইয়েমেনের তেল ও খনিজমন্ত্রী মোহাম্মদ বামকা জানিয়েছেন, রপ্তানি থেকে অর্জিত অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা করা হবে। তিনি বলেন, রপ্তানির জন্য ১৭ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল প্রস্তুত রয়েছে।

বামকার তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে দৈনিক তেল উৎপাদন প্রায় ৬০ হাজার ব্যারেলে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন বাড়াতে তেল কোম্পানিগুলোকে পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথম মাসেই উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে হাদরামৌত বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অর্থনীতির অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-কাসাদি মনে করেন, দৈনিক ৬০ হাজার ব্যারেল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও পুরোটা রপ্তানি করা সম্ভব হবে না। কারণ শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য স্থানীয় বাজারে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার ব্যারেল তেল ব্যবহৃত হবে। ফলে রপ্তানির জন্য পাওয়া যেতে পারে প্রায় ৪০ হাজার ব্যারেল।

তেল রপ্তানিতে বড় বাধা আস্থা সংকট
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন শুরু করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পৌঁছে দেওয়াই হবে কঠিন পরীক্ষা।

২০২২ সালের শেষ দিকে হাদরামৌত ও শাবওয়ার তেল রপ্তানি বন্দরে হুথিদের হামলার পর আন্তর্জাতিক শিপিং ও বিমা কোম্পানিগুলো ইয়েমেনের তেল পরিবহনে সতর্ক হয়ে যায়। এতে বিমা খরচ বেড়ে যায় এবং ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যায়।

হাদরামৌত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল-কাসাদি বলেন, ‘বন্দরে তেল পৌঁছানো মানেই সফল রপ্তানি নিশ্চিত নয়। জাহাজ কোম্পানি ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথমে নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন করে। বিশেষ করে ইয়েমেন সরকারকে সমর্থনকারী সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চালানের ওপর হুথিদের হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।’

তার মতে, তেলের বাজার মূলত আস্থা ও স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে। ক্রেতাদের নিশ্চিত করতে হবে যে তেলবাহী জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে পারবে এবং রপ্তানি কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাবে না।

ইয়েমেন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হাসান মোহাম্মদ মোগালিস বলেন, ‘তেল রপ্তানি চালু করতে শুধু উৎপাদন শুরু করলেই হবে না। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ক্ষেত্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, পাইপলাইন ও পাম্পিং স্টেশন সচল করা এবং বন্দর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বন্দর বা পাইপলাইনে নতুন কোনো হামলা হলে, বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও, তা আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর আস্থা আবার নষ্ট করতে পারে।’

অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে?
ইয়েমেন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আব্দুল করিম আল-আনসি বলেন, ‘তেল রপ্তানি পুনরায় শুরু হওয়া নিঃসন্দেহে বৈদেশিক মুদ্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস তৈরি করবে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কিছুটা সুবিধা পাবে।’

তবে শুধু তেল রপ্তানি দিয়ে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট সমাধান হবে না বলে মনে করেন তিনি। তিনি জানান, দেশটির অর্থনীতি এখন সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকা ও হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকার বিভাজন, দুর্বল তেল-বহির্ভূত রাজস্ব এবং কমে যাওয়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো বড় সমস্যার মুখোমুখি।

আরও পড়ুন : ইউসিবি ব্যাংকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

আব্দুল করিম আল-আনসি আরও বলেন, ‘তেল রাজস্ব থেকে সাধারণ মানুষ কতটা উপকৃত হবে তা নির্ভর করবে অর্থ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় এবং সরকার তা বেতন ও মৌলিক সেবায় কতটা ব্যবহার করতে পারে তার ওপর।’

তেল রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় ইয়েমেন সরকার শুধু বড় একটি আয়ের উৎস হারায়নি, বরং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটও তীব্র হয়েছে। ডলারের প্রবাহ কমে যাওয়ায় খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ আমদানিতে চাপ বেড়েছে। এর ফলে ইয়েমেনি রিয়ালের মান কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।

এডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সানার হুথি নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থার বিভাজনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। দুটি আলাদা আর্থিক ব্যবস্থা ও বিনিময় হার থাকায় অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হচ্ছে।

অধ্যাপক আল-কাসাদি বলেন, ‘সৌদি আরবের আর্থিক সহায়তা সাম্প্রতিক সময়ে সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকায় মুদ্রার অস্থিরতা কিছুটা কমাতে সাহায্য করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে তেল রাজস্বের স্থিতিশীল প্রবাহই ইয়েমেনের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি জানান, রপ্তানি পুনরায় শুরু হওয়া একটি ইতিবাচক সংকেত হলেও প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এটি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় তার ওপর। সংঘাত আবার তীব্র হলে তেল রপ্তানি কার্যক্রমও আবার থেমে যেতে পারে। তথ্যসূত্র : আল জাজিরা।

চুল পড়া কমাতে লাইট থেরাপি উদ্ভাবন বিজ্ঞানীদের, কার্যকারিতা…
  • ২৪ জুলাই ২০২৬
জেলেদের জালে ধরা পড়ল বিরল ‘সোলজারফিশ’
  • ২৪ জুলাই ২০২৬
স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে রক্ষা করা অগ্রহণযোগ্য: প্রতিমন্ত্রী…
  • ২৪ জুলাই ২০২৬
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি ৩৪ হাজার, এলাহাবাদের ৪ হাজার টাকা…
  • ২৪ জুলাই ২০২৬
ঘুম হচ্ছে না? বিশেষজ্ঞদের ‘৪-৭-৮’ শ্বাস-প্রশ্বাস কৌশলে মিলত…
  • ২৪ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে নতুন শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের
  • ২৪ জুলাই ২০২৬