অর্থনৈতিক ও জ্বালানী সংকটের কারণে স্থবির উদ্ধার অভিযান © সংগৃহীত
চলতি বছরের শুরুর দিকে দেশটির প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করে নেওয়ার পর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। মাদক পাচার নিয়ে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, ব্যাপক দুর্নীতির কারণে আগে থেকেই তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকছিল দেশটি। এই সংকটের মধ্যেই দেশটিতে আঘাত হেনেছে স্মরণকালের ভয়াবহ এক ভূমিকম্প। আর এই মহাবিপর্যয়ের পর উদ্ধারকাজেও সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির চলমান চরম অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকট। তেলসমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও জ্বালানির অভাবে উদ্ধারকারী যানবাহন ও ভারী যন্ত্রপাতিগুলোকে পুরোদমে কাজে লাগানো যাচ্ছে না, যা উদ্ধার অভিযানকে প্রায় স্থবির করে দিয়েছে। খবর সিএনএনের
সময় যত গড়াচ্ছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এই পরিস্থিতিতে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই হাত দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে নেমে পড়েছেন।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় খনিজ তেলের মজুত বা রিজার্ভ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। অথচ অর্থনৈতিক দুর্দশা ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের কারণে সেই তেল উত্তোলন ও পরিশোধন করতে পারছে না দেশটি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনেরে এক সরেজমিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যের লা গুইয়ারা শহরে ধসে পড়া বহুতল ভবনের ধ্বংসস্তূপে বাসিন্দারা হন্যে হয়ে তাঁদের আপনজনদের খুঁজছেন। অথচ ঠিক তাদের পাশেই একটি সরকারি এক্সকাভেটর (মাটি কাটার যন্ত্র) অচল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। সিএনএনের সাংবাদিক এর কারণ জানতে চাইলে এক্সকাভেটরের চালক অসহায়ভাবে জানান, গাড়িটি চালানোর মতো কোনো জ্বালানি বা তেল নেই তাদের কাছে।
এদিকে লা গুয়াইরার আর্দ্র বাতাসে এখন ক্রমেই লাশের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো আধুনিক প্রযুক্তি বা উদ্ধারকারী দল না পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা হাতুড়ি ও সাধারণ সরঞ্জাম দিয়ে ধসে পড়া বহুতল ভবনগুলো ভাঙার চেষ্টা করছেন। হ্যাসেল মেন্ডোজা নামের এক স্থানীয় প্রকৌশলী সিএনএনকে বলেন, তার মা, বোন, ভগ্নিপতি এবং ভাগনে একটি নয়তলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন।
সঠিক সরঞ্জাম ছাড়া এই উদ্ধারকাজ চালানো কতটা অসম্ভব, তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গত দুই রাত ধরে আমি এখানেই মাটিতে ঘুমাচ্ছি। আমাদের কাছে ধ্বংসস্তূপ কাটার কোনো ড্রিল মেশিন নেই, ভেতরে কেউ বেঁচে আছে কি না তা জানার কোনো সেন্সরও নেই।’
ভেনেজুয়েলার এই মানবিক বিপর্যয় ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা। দেশটির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ডাটা স্ট্র্যাটেজিয়া’র পরিচালক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কারমেন বিয়াত্রিজ ফার্নান্দেজ বলেন, ‘মানুষের ক্ষোভ এখন আকাশচুম্বী। আমরা এখানে যা দেখছি, তা মূলত আরেকটি বড় ট্র্যাজেডিরই প্রতিফলন। দেশটির সরকার তার সব সক্ষমতা কেবল রাজনৈতিক দমনপীড়ন ও অপপ্রচারের (প্রোপাগান্ডা) পেছনে ব্যয় করেছে। এর ফলে নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর মতো একটি রাষ্ট্রের যে ন্যূনতম ক্ষমতা বা কাঠামো থাকা দরকার, তা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।’