ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন © সংগৃহীত
ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দেশটির ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও প্রলয়ঙ্কারী জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে জাতিসংঘ। নিখোঁজ ও আটকে পড়া জীবিতদের উদ্ধারে বর্তমানে লাতিন আমেরিকার দেশটিতে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ও বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর মোতায়েন করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, ‘বর্তমানে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ এবং ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশাল এই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এই মুহূর্তে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় ও কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ নিশ্চিত করেছেন যে, উদ্ধার অভিযান চলাকালীন আরও মরদেহ উদ্ধারের পর মোট মৃতের সংখ্যা ৫৮৯ জনে পৌঁছেছে। তবে জাতিসংঘের আশঙ্কা, নিখোঁজদের বিপুল সংখ্যা বিবেচনায় নিলে চূড়ান্ত নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে।
রাজধানী কারাকাসের উত্তরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি খালি হাতেও দিন-রাত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। বিভিন্ন স্থানে হাতুড়ি ও ড্রিল মেশিন দিয়ে কংক্রিট ভেঙে উদ্ধারকাজ চালানোর সময় ভেতর থেকে ভেসে আসা সম্ভাব্য জীবিতদের আর্তনাদ বা ক্ষীণ আওয়াজ শোনার জন্য মাঝেমধ্যেই উদ্ধারকর্মীদের সম্পূর্ণ নীরব থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া নিজের ছেলেকে উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকা আমপারো দেল জিউদিচে নামে এক আকুল মা বলেন, ‘এখানে এত পাথর আর কংক্রিটের স্তূপ জমেছে যে, খালি হাতে বা সাধারণ উপায়ে উদ্ধার করা একেবারেই অসম্ভব।’
উল্লেখ্য, গত বুধবার রাতে এক মিনিটেরও কম ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প উত্তর ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানে, যার ফলে চোখের পলকে শত শত বহুতল আবাসিক ভবন ধসে পড়ে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় সংস্থা (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, ইতিমধ্যে বাংলাদেশসহ অন্তত ১৭টি দেশের বিশেষ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পাঠানো হচ্ছে। স্পেন, এল সালভাদর, সুইজারল্যান্ড, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর উদ্ধারকারী দল ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ত্রাণ কার্যক্রম ও উদ্ধার অভিযান তদারকিতে একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে কারাকাসে পাঠিয়েছে। ওয়াশিংটন দুটি যুদ্ধজাহাজ, বিশেষ পরিবহন বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েনের পাশাপাশি ১৫ কোটি মার্কিন ডলারের বিশাল সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমে যেন কোনো আন্তর্জাতিক বা আইনি বাধা না আসে, সে জন্য ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আগামী চার মাসের জন্য স্থগিত করেছে মার্কিন প্রশাসন।
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভূমিকম্পের আঘাতের আগেই ভেনেজুয়েলার লাখো মানুষ তীব্র খাদ্যসংকট, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক সেবার সংকটে ভুগছিলেন, যা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এবারের ভূমিকম্পে নিহতদের মধ্যে ৯ জন পর্তুগিজ, ৪ জন স্প্যানিশ, ২ জন ব্রাজিলীয়, ২ জন চীনা এবং একজন ইতালীয় নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া ৫৬ জন পর্তুগিজ ও ১২০ জন স্প্যানিশ নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, কারাকাসের উত্তরের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যে একের পর এক আবাসিক ভবন ধসে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। তীব্র সংকটের মুখে গতকাল বৃহস্পতিবার সেখানে একটি সুপারমার্কেটে স্থানীয়দের লুটপাটের ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছেন সাংবাদিকেরা। আরহেনিস মেন্দেজ নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখন লুটপাটের সময় নয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার সময়। কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সেনাবাহিনীর আরও আগে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে এখানে পৌঁছানো উচিত ছিল।’
ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত ভেনেজুয়েলায় ১৯৯৭ সালের পর এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী ভূমিকম্প। গত বুধবারের ৭.৫ মাত্রার এই কম্পনটি ১৯০০ সালের পর দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ভয়াবহ ভূমিকম্পের কম্পন প্রতিবেশী কলম্বিয়া ও ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলেও তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে।