পশ্চিমবঙ্গের সাবেক ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় © সংগৃহীত
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) সাবেক বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মরদেহ দলীয় কার্যালয় থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার সকালে বীরভূমের রামপুরহাটে নিজের বাড়ির পাশের ওই কার্যালয়ের ভেতর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে বাংলায় লেখা একটি দীর্ঘ হাতে লেখা চিরকুটও পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করলেও তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও পরিস্থিতি এখনো তদন্তাধীন।
পুলিশ জানায়, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির কাছেই তৃণমূলের ওই দলীয় কার্যালয়টি অবস্থিত। সকালে স্থানীয় কয়েকজন মানুষ কার্যালয়ের ভেতরে তার মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে তারা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
বীরভূম জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কিছু স্থানীয় মানুষ দলীয় কার্যালয়ের ভেতরে মরদেহ ঝুলতে দেখে পুলিশকে খবর দেন। কক্ষটি থেকে বাংলায় লেখা একটি দীর্ঘ হাতে লেখা চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহ বাধ্যতামূলক ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হবে।’
পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘যদিও বিষয়টি তদন্তাধীন, তবে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে বন্দ্যোপাধ্যায় আত্মহত্যা করেছেন। চিরকুটটি তার নিজের লেটারহেডে লেখা বলে মনে হচ্ছে। সেখানে তিনি লিখেছেন, তিনি কখনো কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং তার ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। চিরকুটে তিনি আরও লিখেছেন, তারাপীঠ রামপুরহাট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (টিআরডিএ) দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না।’
বীরভূমের পুলিশ সুপার বিদিত রাজ ভুন্দেশ ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ‘পুলিশ যখন তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে পৌঁছায়, তখন কক্ষটির দুটি দরজাই ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। পুলিশ একটি দরজা ভেঙে কক্ষে প্রবেশ করে। সেখানে দেখা যায়, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় হলুদ নাইলনের দড়ি দিয়ে ঝুলছিলেন। পুরো ঘটনাটি ভিডিওতে ধারণ করা হয়েছে।’
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দলের মুখপাত্র নীলাঞ্জন দাস ঘটনাটিকে দুঃখজনক ও মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা বলে দাবি করা ওই চিরকুটের একটি ছবিও প্রকাশ করেন। সেখানে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে দুর্নীতির মামলায় মিথ্যাভাবে জড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
৭৫ বছর বয়সী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেসের পাঁচবারের বিধায়ক ছিলেন। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। পাশাপাশি তিনি রামপুরহাট কলেজে বাংলার সহযোগী অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০১ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রথমবার রামপুরহাট বিধানসভা আসন থেকে নির্বাচিত হন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর ২০০৬, ২০১১, ২০১৬ ও ২০২১ সালের নির্বাচনেও তিনি ওই আসন থেকে জয়ী হন। টানা পাঁচবার রামপুরহাটের বিধায়ক ছিলেন তিনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় রাজ্যের কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার ছিলেন।
তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রামপুরহাট আসন থেকে বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে পরাজিত হন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। ধ্রুব সাহা তার চেয়ে ২৪ হাজারের বেশি ভোটে জয় পান।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বড় জয় পাওয়ার পর তারাপীঠ রামপুরহাট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা টিআরডিএতে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তোলে দলটি। বিজেপির অভিযোগ ছিল, ওই দুর্নীতির সঙ্গে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়েরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
তবে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবার বলছে, তার আচরণে এমন কোনো পরিবর্তন তারা দেখতে পায়নি, যা থেকে আত্মহত্যার আশঙ্কা করা যায়।
তার ছোট ভাই প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, শনিবার রাতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছিলেন আশিস। তখন তার আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি।
প্রশান্ত বলেন, ‘তার আচরণে অস্বাভাবিক কিছুই ছিল না। আমরা বিশ্বাসই করতে পারছি না যে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।’
রোববার সকালে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মরদেহ খুঁজে পাওয়াদের মধ্যে তার ভাই প্রশান্তও ছিলেন। তিনি জানান, প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হওয়ার পর কিছু সময় দলীয় কার্যালয়ে বসতেন আশিস। মৃত্যুর দিনও তিনি একই নিয়ম অনুসরণ করেছিলেন।
প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘তিনি প্রতিদিন সকালে হাঁটার পর কিছু সময় দলীয় কার্যালয়ে বসতেন। আজও তিনি একই রুটিন অনুসরণ করেছিলেন।’
২০২৬ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করেছিলেন। জুন মাসে তিনি দলের বীরভূম জেলা কোর কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকেও পদত্যাগ করেন। এর কয়েক সপ্তাহ আগে বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল বিজেপির কাছে বড় পরাজয়ের মুখে পড়ে।
প্রায় ২০০০ সাল থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। ২২ জুন তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কদের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকেও তাকে দেখা যায়।
তৃণমূলের বীরভূম জেলা ইউনিটের প্রায় দুই দশকের সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলও আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন এবং তার কোনো শত্রু ছিল না।
অনুব্রত মণ্ডল বলেন, ‘আশিস দা শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তার কোনো শত্রু ছিল না এবং তিনি কখনো কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তিনি আর নেই, এটা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।’
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা বলে দাবি করা ওই চিরকুটে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেওয়াকে নিজের ভুল বলেও উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে পরিবারের কোনো সদস্যকে রাজনীতিতে না আসার পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় একটি পরিকল্পিত অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সাবেক বিধায়ক ও সাবেক ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু হৃদয়বিদারক নয়, যারা মনে করেন রাজনীতি ও সাংবাদিকতার কিছু সীমারেখা থাকা উচিত, তাদের সবার বিবেককে এই ঘটনা নাড়া দেওয়া উচিত।’
তিনি আরও লেখেন, ‘তার শেষ চিরকুটে তিনি যে দীর্ঘদিনের অপপ্রচারের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন, তা গুরুতর ও উদ্বেগজনক প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিজেপি এবং গণমাধ্যমের কিছু অংশকে এমন রাজনীতির পরিণতি নিয়ে ভাবতে হবে, যেখানে অভিযোগকে আরও বড় করে তুলে ধরা হয়, মানুষের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রকাশ্য বিচার চলে এবং সত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই জনমতের আদালতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।’
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, ‘যারা এই অপপ্রচারে অংশ নিয়েছেন, তাদের উচিত নিজেদের কথা ও কাজের মানবিক পরিণতি নিয়ে ভাবা। রাজনৈতিক লড়াই আসবে-যাবে, কিন্তু একবার হারিয়ে যাওয়া জীবন আর কখনো ফিরিয়ে আনা যায় না।’
পুলিশ জানিয়েছে, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হবে। উদ্ধার করা চিরকুট এবং ঘটনাস্থলের অন্যান্য আলামতও তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি তদন্ত শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।