পাকিস্তানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির কিংবদন্তী ক্রিকেটার ইমরান খান © সংগৃহীত
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া অত্যন্ত গোপন কূটনৈতিক নথি বা ‘সাইফার’ ঘিরে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিনভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘ড্রপসাইটে’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ক্ষমতাচ্যুতির পেছনে সরাসরি বিদেশি প্রভাব ও মার্কিন চাপ ছিল।
কেবল আই-০৬৭৮ নামে পরিচিত এই নথিতে ২০২২ সালের ৭ মার্চ ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আসাদ মাজেদ খান এবং মার্কিন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর মধ্যকার একটি অত্যন্ত গোপন বৈঠকের কথোপকথনের বিবরণ উঠে এসেছে।
ড্রপসাইটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বৈঠকে মার্কিন কর্মকর্তা ডোনাল্ড লু স্পষ্ট ভাষায় পাকিস্তানকে জানিয়েছিলেন, পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরানো হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কের চলমান টানাপোড়েন ‘ক্ষমা করে দেওয়া হবে’। অন্যথায় পাকিস্তানকে কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
ডোনাল্ড লু আরও মন্তব্য করেছিলেন, ‘ইমরান খানের অনড় অবস্থানের কারণে পাকিস্তান ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।’ এই বৈঠকের মাত্র এক মাসের মাথায় ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারান ইমরান খান। পরবর্তীতে তোশাখানা দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস (সাইফার মামলা) এবং জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একাধিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে বর্তমানে তিনি ও তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবি কারাগারে সাজা ভোগ করছেন।
ইমরান খান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছিলেন যে, পাকিস্তানের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর সরকারকে পতনের ষড়যন্ত্র করেছে। তাঁর দাবি ছিল— রাশিয়া ও চীনের বিষয়ে পুরোপুরি মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়ন না করা এবং আফগানিস্তানে সামরিক অভিযানের জন্য পাকিস্তানের বিমানঘাঁটি ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই তিনি ওয়াশিংটনের বিরাগভাজন হন।
ড্রপসাইটের প্রতিবেদনেও এর সত্যতা মিলেছে; সেখানে বলা হয়েছে— ইমরান খানের মস্কো সফর, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান এবং মার্কিন ঘাঁটির অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। একই সময়ে পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও মনে করছিল ইমরান খান দেশকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করছেন, যার ফলে ২০২১ সালেই পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব গোপনে ওয়াশিংটনে নিজেদের আলাদা লবিং কার্যক্রম শুরু করে।
অবশ্য তৎকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তৎকালীন মুখপাত্র নেড প্রাইস বলেছিলেন, ‘এই অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। যুক্তরাষ্ট্র সবসময় পাকিস্তানের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং আইনের শাসনকে সম্মান করে।’
তবে বর্তমান সময়ে এসে মূল কূটনৈতিক বার্তা বা সাইফারের এই সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ্যে আসায় পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন করে ঝড় উঠেছে, যা ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর দাবিকেই আন্তর্জাতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করল।