এপস্টিন নথি
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প © টিডিসি সম্পাদিত
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সংবলিত একাধিক এফবিআই সাক্ষাৎকারের নথি প্রকাশ করেছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এসব নথিতে এক নারীর অভিযোগের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে। ওই নারী দাবি করেছেন—কৈশোর বয়সে ট্রাম্পের কাছে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি।
বিচার বিভাগ প্রকাশিত তিনটি এফবিআই সাক্ষাৎকারের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ওই নারী অভিযোগ করেছেন যে অভিযুক্ত যৌন পাচারকারী জেফরি এপস্টেইনের মাধ্যমে তার সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিচয় হয়েছিল। ওই সময় তিনি অল্পবয়সী কিশোরী ছিলেন।
এফবিআই তদন্তকারীদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎকারের সারসংক্ষেপ, ‘এফবিআই ৩০২’ নামে ফাইলে বলা হয়েছে—‘ট্রাম্প তাকে জোর করে যৌন নির্যাতনে বাধ্য করার চেষ্টা করলে তিনি আত্মরক্ষার্থে ট্রাম্পের ‘বিশেষ অঙ্গে’ কামড় দেন। এর পর ট্রাম্প তাকে আঘাত করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।’
তবে ট্রাম্প এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জেফরি এপস্টেইন সম্পর্কিত অভিযোগের বিষয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ আনাও হয়নি। এপস্টেইনের যৌন পাচার চক্রে ট্রাম্পের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি। বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত অনেক নথিতেই পর্যাপ্ত প্রমাণ বা প্রেক্ষাপটের ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এসব অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ, যার পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই। অভিযোগকারী একজন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নারী, যার দীর্ঘ অপরাধমূলক অতীত রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই অভিযোগগুলো যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, তার প্রমাণ হলো জো বাইডেনের বিচার বিভাগ চার বছর ধরে এসব তথ্য জানার পরও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কারণ তারা জানত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো ভুল করেননি। আমরা বহুবার বলেছি, এপস্টেইন ফাইল প্রকাশের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্পূর্ণভাবে দায়মুক্ত হয়েছেন।’
আরও পড়ুন: ইরানকে গণতান্ত্রিক হতে হবে না : ট্রাম্প
প্রকাশিত নথিগুলো ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে নাম প্রকাশ না করা ওই নারী দাবি করেছেন, যখন তার বয়স ১৩ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে, তখন জেফরি এপস্টেইন তাকে নিউইয়র্ক বা নিউ জার্সিতে নিয়ে যান। একটি খুব উঁচু ভবনের বড় কক্ষে এপস্টেইন তার সঙ্গে ট্রাম্পের পরিচয় করিয়ে দেন।
নারীটি বলেন, ট্রাম্প “পছন্দ করেননি যে আমি ‘বয়-গার্ল’ ছিলাম”, এটি সাক্ষাৎকারের নোটে ‘টমবয়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এফবিআই ২০১৯ সালে জেফরি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগ তদন্তের অংশ হিসেবে ওই নারীর সঙ্গে চারবার সাক্ষাৎকার নেয়। এর আগে বিচার বিভাগ একটি নথিতে নিশ্চিত করেছিল সাক্ষাৎকারগুলো বিষয়ে, তবে তখন চারটির মধ্যে কেবল একটি সাক্ষাৎকারের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই সাক্ষাৎকারে নারীটি অভিযোগ করেছিলেন, কিশোরী বয়সে এপস্টেইন তাকে যৌন নিপীড়ন করেছিলেন।
বৃহস্পতিবার বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নতুন নথিতে দেখা যায়, তিনি আরও দাবি করেছেন—১৯৮০-এর দশকে নিউইয়র্ক বা নিউ জার্সিতে এপস্টেইনের মাধ্যমে পরিচয়ের পর ট্রাম্প তাকে ওরাল সেক্সে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন।
এই প্রকাশনার বিষয়ে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে প্রথমে এ তথ্য প্রকাশ করা সংবাদমাধ্যম পলিটিকো জানায়, হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এসব অভিযোগকে ‘শূন্য বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসমর্থিত সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বিচার বিভাগ সতর্ক করে জানিয়েছে, প্রকাশিত কিছু নথিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘অসত্য ও চাঞ্চল্যকর দাবি’ থাকতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, অভিযোগগুলোর সত্যতা তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। এফবিআইয়ের নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ২০১৯ সালের পর তদন্তকারীরা ওই নারীর সঙ্গে আর যোগাযোগ করেননি।
বিচার বিভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ এক পোস্টে জানায়, বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা নথিগুলো ১৫টি নথির অংশ ছিল, যেগুলোকে ভুলবশত ‘ডুপ্লিকেট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং সে কারণে আগে প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে এপস্টেইন তদন্তসংক্রান্ত নথি প্রকাশের বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসে বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প-সম্পর্কিত কিছু নথি গোপন করা হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের একটি কমিটি অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডিকে তলব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে আইনপ্রণেতারা জানতে পারেন সরকার কীভাবে এসব নথি প্রকাশের বিষয়টি পরিচালনা করছে।
ট্রাম্প এর আগে বলেছেন, জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ২০০০ সালের মাঝামাঝি সময়েই শেষ হয়ে যায় এবং ওই অর্থলগ্নিকারীর যৌন নির্যাতনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি কখনোই অবগত ছিলেন না।
বিচার বিভাগের আগে প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ১৯৯০-এর দশকে ট্রাম্প কয়েকবার এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন যদিও ট্রাম্প এ তথ্য অস্বীকার করেছেন।
আরও একটি এফবিআই সাক্ষাৎকারের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এপস্টেইনের বিরুদ্ধে প্রথম যৌন অসদাচরণের অভিযোগ ওঠার পর ট্রাম্প পাম বিচের পুলিশ প্রধানকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘সবাই জানত সে এসব করছিল।’
২০১৯ সালের অক্টোবরে নেওয়া ওই নারীর শেষ সাক্ষাৎকারের প্রতিবেদনে দেখা যায়, তখন ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদকাল চলছিল। সেই সাক্ষাৎকারে এফবিআই এজেন্টরা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ট্রাম্প সম্পর্কে আরও তথ্য দিতে তিনি আগ্রহী কি না।
এর উত্তরে ওই নারী বলেন, ‘আমার জীবনের এই পর্যায়ে আরও তথ্য দিয়ে লাভ কী, যখন খুব সম্ভবত এ বিষয়ে আর কিছুই করা যাবে না।’
তথ্যসূত্র: পলিটিকো