মার্কিন সিনেট © সংগৃহীত
ইরানে সামরিক হামলা চালানোর ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধ ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাবে মার্কিন সিনেটে ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেই প্রস্তাব পাস হয়নি। ১০০ সদস্যের সিনেটে ভোটাভুটিতে ৫২ জন প্রস্তাবটির বিপক্ষে এবং ৪৭ জন পক্ষে ভোট দেন। ফলে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার এই ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজুলেশন’ কার্যত আটকে যায়।
এর আগে গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) পরমাণু ইস্যুতে পরোক্ষ আলোচনার মধ্যেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। মার্কিন কংগ্রেসের সম্মতি ছাড়া এই যুদ্ধ শুরু করায় বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন।
চলমান যুদ্ধ বন্ধ করা এবং ভবিষ্যতে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপের দাবিতে বিরোধী আইনপ্রণেতারা একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যুদ্ধের পঞ্চম দিনে, গত বুধবার (৪ মার্চ) সেই প্রস্তাব সিনেটে ভোটাভুটির জন্য তোলা হয়।
সিনেটে দিনভর এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে। সমর্থকরা দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। মার্কিন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট কেবল আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক হুমকির জবাব হিসেবে সামরিক হামলা চালাতে পারেন। অন্যথায় যুদ্ধ ঘোষণা করার একমাত্র ক্ষমতা কংগ্রেসের।
সিনেটের অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ডেমোক্র্যাট সিনেটর টিমোথি মাইকেল কেইন বলেন, এমনকি গোপন বৈঠকেও ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের তাৎক্ষণিক হামলার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। তার ভাষায়, ‘আপনি বলতে পারেন না যে এটি তুচ্ছ একটি আঘাত, যা যুদ্ধের পর্যায়ে পড়ে না। আবার এটিও বলতে পারেন না যে এটি একবারের আঘাত এবং এর পরে আর কোনো সংঘাত হবে না।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানোর জন্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে।
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো আন্তোনিও রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ইসরাইল ইরানে হামলার পরিকল্পনা করছিল এবং তা হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন স্বার্থের ওপর পাল্টা হামলা হতে পারত। তবে পরে ট্রাম্প নিজেই বলেন, আসলে ইরানই ইসরাইলের ওপর আসন্ন হামলার পরিকল্পনা করছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন আরও দাবি করেছে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে বিবেচিত।
আরও পড়ুন: টানা তিন দিন বায়ুদূষণে শীর্ষে ঢাকা, গুলশানসহ ৭ স্থানের পরিস্থিতি অতি ঝুঁকিপূর্ণ
প্রস্তাবটির বিরোধিতাকারী রিপাবলিকান সিনেটরদের অনেকেই বলেন, গত ৪৭ বছর ধরে ইরানের হুমকি ও উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থান প্রেসিডেন্টের সামরিক পদক্ষেপকে যৌক্তিক করেছে। রিপাবলিকান সিনেটর জেমস ই. রিশ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রেসিডেন্টকে কেবল অধিকারই দেয় না, বরং দেশের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্বও দেয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত বছরের জুনে ইসরাইল নেতৃত্বাধীন ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস হওয়ার পরও তেহরান আবার তা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছিল এবং মাঝারি ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়াচ্ছিল। তার মতে, এই পরিস্থিতিই হামলার কারণ।
তবে যুদ্ধের আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনাও চলছিল। কিন্তু সেই আলোচনা ফলপ্রসূ হবে না বলে মনে করেন রিশ। তার দাবি, আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছিল।
সিনেটে ভোটাভুটির ফলাফল মূলত দলীয় লাইনে বিভক্ত হলেও একজন রিপাবলিকান ও একজন ডেমোক্র্যাট দলীয় অবস্থান থেকে সরে গিয়ে বিপরীত ভোট দেন। গত ২১ জুনের হামলার পর থেকে কংগ্রেসে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক অভিযান ঠেকাতে একাধিক যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব আনা হলেও সেগুলোর কোনোটিই পাস হয়নি।
মার্কিন আইনে ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যদি সেনা মোতায়েন করে সামরিক অভিযান শুরু করেন, তবে ৬০ দিনের বেশি তা চালিয়ে যেতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়।
এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। যুদ্ধের পঞ্চম দিনে বুধবার ইরানের পাশাপাশি লেবাননেও হামলা জোরদার করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। ইরানে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এর মধ্যে আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এছাড়া দুবাই মার্কিন কনস্যুলেটে ইরানের একটি ড্রোন বিস্ফোরিত হয়েছে।
বর্তমানে এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি এবং সামগ্রিক অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
যুদ্ধ এখন নৌ ও স্থলপথেও বিস্তৃত হয়েছে। বুধবার ইসরাইলি সেনাবাহিনী লেবাননের আরও ভেতরে অগ্রসর হয়। একই দিনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কা উপকূলে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজে মার্কিন সাবমেরিন থেকে হামলা চালানো হয়, এতে অন্তত ৮৭ জন নিহত হন এবং অনেকেই এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা, দুটি বিমানবাহী রণতরি এবং বোমারু বিমান অংশ নিয়েছে। তবে ইরানের পাল্টা হামলার ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনকে নতুন করে যুদ্ধ কৌশল নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।
এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সংঘাত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে। তবে রিপাবলিকান সিনেটর রিশ আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, এই যুদ্ধ খুব দ্রুতই শেষ হবে এবং এটি কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হবে না।
এদিকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদেও বৃহস্পতিবার একই ধরনের একটি প্রস্তাবে ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে, যদিও সেটিও পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন প্রস্তাব পাস না হলেও কংগ্রেসের সদস্যদের প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হয় এবং জনমতের ওপর তার প্রভাব পড়ে।