করোনার কারণে দুই বছর ঈদ আনন্দে ভাটা পড়েছিল

করোনার কারণে দুই বছর ঈদ আনন্দে ভাটা পড়েছিল
করোনার কারণে দুই বছর ঈদ আনন্দে ভাটা পড়েছিল  © টিডিসি ফটো

দীর্ঘ একমাস রোজার শেষে ঈদুল ফিতরের দিনটি সকল মুসলমানের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বৈশ্বিক মহামারির জন্য আমাদের চেনা জীবনের সঙ্গে সঙ্গে উৎসব উদযাপনের যেন থমকে গিয়েছিল। যার প্রভাব পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ঈদ আনন্দের ওপর। করোনার জন্য গত বছর তেমন জাঁকজমকপূর্ণ ঈদ হয়নি।

এবারের ঈদকে কেন্দ্র করে সবার মধ্যেই নানান জল্পনা-কল্পনা আলোচনার ঝড় বইছে। কেননা এই উৎসবের মধ্য দিয়েই মুসলমানদের আত্মত্যাগ, সেবাদান এবং মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে। এবারের ঈদল ফিতর উদযাপন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও মতামত তুলে ধরেছেন দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের ঢাবি প্রতিনিধি রিফাত হক

যান্ত্রিক এই নগরী থেকে গ্রামে ঈদ করা অনেক আনন্দের

আমার কাছে ঈদ আনন্দ বলতে শৈশব-কৈশোরে ফেলে আসা সেই স্মৃতিমাখা সময়টাকেই বোঝায়। সময়ের পরিক্রমায় প্রতি বছর ঈদ আসলেও ছোট সময়ের আনন্দ আর ফিরে আসে না। এর মাঝে দুই বছরের করোনা মহামারী পৃথিবীকে অসুস্থ করে দেয়। আশেপাশে এত এত অভাব, অনুযোগ, অসহায়ত্ব, স্বজন হারানোর বেদনা, হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া মানুষের আর্তনাদকে মাড়িয়ে উদযাপিত হয়েছে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-ফিতর।

এবার করোনা প্রকোপ কম হওয়ার পৃথিবীটা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে মানুষ আবার বুক ফুলে শ্বাস নিতে পারবে প্রকৃতিতে। ঈদের আনন্দ আগের মতো না লাগলেও একটা ভালো লাগা কাজ করে। বাড়ি ফেরা, মায়ের হাতের খাবার খাওয়া, যমুনা পানিতে গোসল করা কিংবা বাগান থেকে আম-কাঁঠাল খাওয়া তো আছেই। তবে যান্ত্রিক এই নগরী থেকে গ্রামে ফিরে সবার সাথে ঈদ করা আসলেই অনেক আনন্দের।

নাহিদ হাসান 
নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে উল্লাস, ঈদ মানে মোলাকাত, ঈদ মানেই সুখ ভাগাভাগি

করোনা মহামারীরে জর্জরিত বিশ্ব যখন কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে তখনি সুদীর্ঘ এক মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর পরম পুলকের অফুরান সওগাত নিয়ে আমাদের দ্বারে আজ হাজির হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদ নিতান্তই একটি আবেগপ্রবণ শব্দ। ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই উল্লাস, ঈদ মানেই মোলাকাত, ঈদ মানেই সুখ ভাগাভাগি। এমন অসংখ্য বিশেষণ লুকিয়ে আছে শব্দটির অন্তরালে।

আরও পড়ুন: করোনায় সতর্ক থেকে আনন্দ উপভোগের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

কিন্তু বিগত দুই বছর যাবত করোনার ভয়াল থাবার কারণে ফিকে হয়ে যায় ঈদের আনন্দ। ছোট শিশুদের ঈদের আগের রাতে হাতভর্তি মেহেদী দেওয়ার জন্য বড় ভাই-আপুদের কাছে ঘুরাঘুরি, সকালবেলা নতুন জামা পরে নামাজে যাওয়া, দিনভর ঘোরাঘুরি ও মজার মজার খাবার খাওয়া কিংবা নামাজফেরত বাবা-মুরুব্বীদের কাছ থেকে সালামি নেওয়ার রেওয়াজগুলোতে ভাঁটা পড়েছিলো অনেকাংশে। আশাকরি এই আমেজগুলোর প্রতিচ্ছবি পাব এই বছর।

ছোটবেলায় প্রতি ঈদে সকালে নতুন জামা পরে নামাজে যাওয়ার আগে একটা মহিলা আসত ঘরের সামনে। হাতে শাঁখা, কপালে সিদুর আর লাল টকটকে টিপ পরিহিত এই মহিলা প্রতি বাড়ি থেকে পিঠা আর কাপড় নিয়ে যেত। একদিন আম্মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই হিন্দু মহিলা প্রতি ঈদে আমাদের বাড়ি থেকে পিঠাপুলি নিয়ে যায় কেন? আমাদের ঈদে এই মহিলার কি? আম্মা বলেছিলো, ‘ঈদটা শুধু তোমার আর আমার না, বাবা। ঈদটা সবার। হিন্দু-মুসলমান পরিচয়ের উর্ধ্বে এই মহিলার সবচেয়ে বড় পরিচয় উনি একজন মানুষ।’

অসাম্প্রদায়িক দেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ভাবাদর্শ নিয়ে পালিত হোক পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। সব শ্রেণী, সম্প্রদায়, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ ভেদাভেদ ভুলে ঈদের আনন্দে নিজেদের রাঙিয়ে তুলুক।

আসাদুল্লাহ আল মাহমুদ 
শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঈদের নামাজ পরবর্তী কোলাকুলির মুহূর্ত পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর দৃশ্য

ঈদ মুসলিম জাতির কাছে একাধারে উৎসব ও ইবাদতের দিন। সমগ্র জাতির কাছে দিনটি সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক সম্প্রীতির আনন্দময় একটি দিন। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ ঈদকে তার নিজস্ব আঙ্গিকে আনন্দের সাথে উদযাপন করে। ঈদের নামাজ পরবর্তী কোলাকুলির মুহূর্ত পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর দৃশ্য।

করোনা মহামারি বিগত দুই বছর ধরে আমাদের জীবনযাত্রাকে সীমিত করে ঈদ উদযাপন থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত করেছে। সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় স্বাভাবিক হচ্ছে আমাদের জীবনযাত্রা। শিশু-কিশোর, আবালবৃদ্ধবনিতা সকলের আকাশে উঁকি দেবে শাওয়ালের বাঁকা চাঁদ এমনই প্রত্যাশা। 

মানুষের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া; বিভেদ-বৈষম্য, বিদ্বেষ ভুলে ঈদ আনন্দ বিনিময়ের মাধ্যমে চির নতুনরূপে পবিত্রতার সাথে ঈদ উদযাপন করব। জীবনের প্রতিটি ঈদ যেন স্মৃতিবিধুর হয় এটিই আমার ঈদ ভাবনা।

রেজোয়ান পারভেজ আকাশ 
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অন্যের খুশির কারণ হওয়ার মাঝেই আপনার ঈদের প্রকৃত সার্থকতা

ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ। এই আনন্দ সবার। এটি একটি ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। ঈদ মানুষের মনে সুখ-শান্তি আর কল্যানের বাণী নিয়ে আসে। মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা অন্যতম। ত্রিশটা রমজানে রোজা পালনের পরেই আসে সেই আকাঙ্খিত ঈদ উৎসব। 

রমজান মাস অন্য সব মাসের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদার। এই মাসে মানুষ সিয়াম সাধনার ইবাদত করে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে নেয়। এই সিয়াম সাধনার মধ্যে দিয়ে একজন মানুষ দরিদ্র অসহায় মানুষের কষ্টকে উপলব্ধি করতে পারে। ধনী মানুষ না খেয়ে থাকা মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে। তাই আমার কাছে ঈদ মানেই প্রতিটি বঞ্চিত-অসহায় মানুষের পাশে দাড়ানো।

ঈদ মানেই ক্রোধ, হিংসা, বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলা। ঈদ মানেই দীর্ঘদিন পরে পরিবারের সবাই এক হওয়ায় আনন্দ। ঈদের দিনকে উদ্দেশ্য করে মানুষ অনুভব করে তার আত্মীয় স্বজনের বাসায় গিয়ে কুশলাদি বিনিময়ের আনন্দ। আমার কাছে ঈদ মানে দামি পোশাক কিংবা ভালো জুতা পরিধান করে বের হওয়া নয়। ঈদের আনন্দ শুধু একা উপভোগ করলে হবে না। সেটা সবার সাথে ভাগ করে নিতে হবে। 

আমাদের আশেপাশে অনেকেই আছে, যারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শুধু টাকার অভাবে তার পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে না। হয়তো পরিবারের সদস্যের জন্য পোশাক কিনতে পারেনি অথবা পোশাক কিনতে পারলেও বাড়িতে আসার খরচ তার কাছে নেই। তাই যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল আছেন, আপনি চাইলে দেশের সবার খোঁজ নিতে পারবেন না। কিন্তু আপনি চাইলে আপনার কাছের আত্মীয় স্বজনের খোঁজ নিতে পারেন। 

এভাবে সবাই যদি তার কাছের মানুষের খোঁজ নেয়, তাইলে সবাই ঈদের আনন্দ উপভোগ পারবে। আর অন্যের খুশির কারণ হওয়ার মাঝেই আপনার ঈদের প্রকৃত সার্থকতা।

মো. শাকিল আহমেদ 
আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


x

সর্বশেষ সংবাদ