ঢাবির টিএসসি পরিচালকের কেনাকাটা

৪ বছর আগে বন্ধ হওয়া দোকান থেকে আলমারি ক্রয়, পৌনে এক লাখ টাকার আসবাবপত্রের দেখা মিলল না একটিরও

১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৯ PM , আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০০ PM
টিএসসি পরিচালক ফারজানা বাসার

টিএসসি পরিচালক ফারজানা বাসার © টিডিসি সম্পাদিত

তিনটি খাতে বরাদ্দের অর্থ তুলেও কাজ করেননি ‎ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ফারজানা বাসার। কাজ সম্পন্নের হিসাব সমন্বয়ে তিনটি ক্যাশ মেমো জমা দিয়েছেন তিনি। তবে এর একটির ঠিকানায় গিয়ে প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অন্য দুটি মেমো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজেদের দেয়া নয় বলে নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা। ভৌতিক এসব দোকান ও ভাউচার দিয়েই প্রায় পৌনে এক লক্ষ টাকা তুলে নিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

‎বরাদ্দকৃত অর্থের তিনটি খাত হলো—পরিচালকের টিএসসি অফিসের জন্য স্টিলের ফাইল কেবিনেট ও আলমারি, কলাভবন ক্যাফেটেরিয়ার অফিসের জন্য একটি রিভলভিং চেয়ার ও তিনটি হাতলওয়ালা কুশন চেয়ার, টিএসসি মিলনায়তনের দুটি এসির জন্য গ্যাস। কিন্তু এই তিনটি খাতের বিপরীতে যে অর্থ বরাদ্দ ও উত্তোলন করা হয়েছে, সরেজমিনে খাতের কাজগুলোর কোনোটিরই দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোথাও নতুন আসবাবপত্র নেই, টিএসসি অডিটোরিয়ামে যে দুটি এসির জন্য গ্যাস কেনার কথা বলা হয়েছে সেই এসিগুলোও দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট।

তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, ‎২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব কাজের জন্য বরাদ্দ নেওয়া হয়। পরে সংশ্লিষ্ট খাতগুলো থেকে অর্থ উত্তোলন করে হিসাব সমন্বয়ের জন্য নথি জমা দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নথিপত্রের তথ্যের সঙ্গে সরেজমিন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।

রেজিষ্ট্রার ভবন থেকে প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, টিএসসি পরিচালকের কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণের জন্য একটি স্টিলের ফাইল কেবিনেট ও একটি স্টিলের আলমারি কেনার আবেদন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৩০ নভেম্বর ‘আসবাবপত্র ক্রয় (অফিসসমূহ)’ খাত থেকে ভ্যাটসহ ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে ২৩ ডিসেম্বর ভ্যাট কর্তনের পর ২১ হাজার ২৫০ টাকা উত্তোলন করা হয়।

আমাদের পক্ষে প্রতিটি ভাউচার নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যাচাই করা সম্ভব না। আমরা সাধারণত দেখি ভাউচারটি ঠিক আছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট অফিস প্রধান সেটিতে সই-সিল দিয়েছেন কি না। একজন অফিস প্রধান যখন একটি ভাউচার ঠিক আছে বলে সই করেন, তখন আমরা সেটি ঠিক আছে ধরেই নিই— মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, পরিচালক (হিসাব), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

‎বরাদ্দের বিপরীতে আলমারি কেনা হয়েছে কিনা, তা দেখতে সম্প্রতি পরিচালকের টিএসসি অফিসে যাওয়া হলে সেখানে নতুন কোনো স্টিলের আলমারি বা ফাইল কেবিনেট পাওয়া যায়নি। পরে হিসাব সমন্বয়ের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই অর্থের বিপরীতে কামরাঙ্গীরচরের ‘তানজিলা স্টিল কিং’-এর নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ক্যাশমেমো জমা দেওয়া হয়েছে।

এমএস রিফ্রিজারেশন ও ত্রিশা ফার্নিচারের মালিক বলেছেন বিল দুটি ভুয়া, তানজিলা স্টিল কিংয়ের অস্তিত্ব নেই

মেমোতে দেওয়া মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে উল্লেখ থাকা ঠিকানা ধরে কামরাঙ্গীরচরের দক্ষিণ রসুলপুরে গিয়ে এই নামের কোনো দোকানের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ সময় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক তিন থেকে চার বছর আগে দেশের বাইরে চলে গেছেন। এরপর থেকেই দোকানটি বন্ধ রয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত তিন থেকে চার বছর ধরে সেখানে ‘তানজিলা স্টিল কিং’-এর দোকানটি নেই।

নথি অনুযায়ী, পরিচালকের কলাভবন ক্যাফেটেরিয়ার অফিসে একটি রিভলভিং চেয়ার ও তিনটি হাতলওয়ালা কুশন চেয়ার থাকার কথা। তবে সরেজমিনে গিয়ে এসব আসবাবপত্র পাওয়া যায়নি। নথি অনুযায়ী, এসব আসবাব কেনার জন্য ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয়। হিসাব সমন্বয়ের সময় কামরাঙ্গীরচরের ‘ত্রিশা ফার্নিচার’-এর নামে একটি ক্যাশ মেমো জমা দেওয়া হয়। এতে একটি রিভলভিং চেয়ার ও তিনটি হাতলওয়ালা কুশন চেয়ার কেনার কথা উল্লেখ রয়েছে।

মেমোতে দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী কামরাঙ্গীরচরের খলিফা ঘাট চৌরাস্তায় গিয়ে সেখানে যোগাযোগ করা হয় ত্রিশা ফার্নিচারের মালিকের সঙ্গে। তবে মেমোটি দেখার পর তিনি তার প্রতিষ্ঠান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির জন্য ওই আসবাবপত্র কেনার তথ্য অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ওই ক্যাশ মেমো তাদের প্রতিষ্ঠানের লেখা নয়। মেমোতে থাকা হাতের লেখাও তার নয়। এমনকি তার প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মীর হাতের লেখার সঙ্গেও এর মিল নেই বলে দাবি করেন তিনি।

যদি তার বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসে এবং কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে— অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

‎তৃতীয় খাতটি টিএসসি মিলনায়তনের দুটি এসির জন্য গ্যাস কেনা। নথি অনুযায়ী, দুটি এয়ার কন্ডিশনারের জন্য দুই সিলিন্ডার ‘আর-১৩৪এ’ রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস কেনার আবেদন করেন ফারজানা বাসার। এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘বৈদ্যুতিক স্থাপনা ও বিদ্যুৎ সারাই’ খাত থেকে ২৪ হাজার ৩১৪ টাকা আগাম বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর আগাম অর্থ উত্তোলনের আবেদন করা হয়। পরে ১৭ ডিসেম্বর ভ্যাট কর্তনের পর ২২ হাজার ১০৪ টাকা পরিশোধের আদেশ দেয় হিসাব পরিচালকের দপ্তর।

তবে গ্যাস কেনা ও ব্যবহার করা হয়েছিল কিনা, তা যাচাই করতে টিএসসি মিলনায়তনের এসির বর্তমান অবস্থা দেখতে গেলে সেখানে টিএসসির এসি অপারেটর সাদ্দাম জানান, মিলনায়তনের এসি গত শীত (ডিসেম্বর- জানুয়ারি) থেকেই বিকল। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না পাওয়ায় সেটি মেরামত করা সম্ভব হয়নি। গ্যাসের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত জানুয়ারি থেকে মিলনায়তনের এসিতে কোনো গ্যাস সিলিন্ডার লাগানো হয়নি।

‎অন্যদিকে, হিসাব সমন্বয়ের নথিতে থাকা ক্যাশ মেমোতে ‘এম এস রেফ্রিজারেশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২২ হাজার ১০৪ টাকার গ্যাস কেনার কথা উল্লেখ রয়েছে। মেমোতে থাকা প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহাম্মদ মাইমুদ্দিনের সঙ্গে সরাসরি দেখা করে তাকে মেমোটি দেখানো হলে মেমোটি তার প্রতিষ্ঠানের দেওয়া নয় বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, কোনো মালামাল বিক্রি করলে আমরা আলাদা ক্যাশ মেমো দিয়ে থাকি। কিন্তু এটি ক্যাশ মেমো নয় বরং এটি ‘রোড চালান’। এটিতে থাকা বিক্রেতার স্বাক্ষরটিও আমাদের প্রতিষ্ঠানের কারো নয়। এছাড়া চালানে গ্যাসের যে দাম দেখানো হয়েছে সেই দামে তাদের দোকানো কোনো গ্যাস বিক্রি হয়নি বলেও তিনি জানান।
‎
সমন্বয় বিলে জমা দেওয়া ক্যাশ মেমো হিসাব দপ্তর থেকে যাচাই করা হয় কিনা—জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (হিসাব) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের পক্ষে প্রতিটি ভাউচার নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যাচাই করা সম্ভব না। আমরা সাধারণত দেখি ভাউচারটি ঠিক আছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট অফিস প্রধান সেটিতে সই-সিল দিয়েছেন কি না। একজন অফিস প্রধান যখন একটি ভাউচার ঠিক আছে বলে সই করেন, তখন আমরা সেটি ঠিক আছে ধরেই নিই।

তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মেমোর সত্যতা যাচাই করা সাধারণ প্রক্রিয়ার অংশ নয়। তবে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন বা অভিযোগ উঠলে বিষয়টি আলাদাভাবে দেখা যেতে পারে।

বরাদ্দের অর্থ অনুমোদন ও ব্যয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, কোনো অফিস প্রধানের চাহিদার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিলে হিসাব দপ্তর অর্থ বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এরপর অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হলো এবং কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অফিসের।

তিনি বলেন, অথরিটি অনুমোদন করার পরে টাকাটা অ্যাকাউন্টে অথবা চেকে যায়। এরপর তারা কী করল, ব্যয় করবে কে- অফিস। আর অফিস এটা দেখার দায়িত্ব কার- অফিস প্রধানের।
‎
‎অভিযোগের বিষয়ে জানতে টিএসসি পরিচালক ফারজানা বাসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। আসন ছেড়ে উঠে গিয়ে ‘এ বিষয়ে আপনারা যা ইচ্ছা তাই করেন’ বলে কক্ষ ত্যাগ করেন।
‎
‎সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীর কাছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, যদি তার বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আসে এবং কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সরেজমিনে ক্যাশ মেমোর জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার বিষয়টি তাকে জানানো হলে উপ-উপাচার্য আরও বলেন, এ ধরনের বিষয়ের প্রমাণ যখন আমাদের হাতে আসবে, তখন অবশ্যই আমরা তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।

জাহাজের পতাকা জাল করে ইরানকে সহায়তা, ভারতীয় দম্পতির বিরুদ্ধ…
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা রোনালদোর
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
বিএমইউর ল্যাবরেটরি সার্ভিস সেন্টারকে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স…
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি: লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার কৌশল
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে জনবল নিয়োগ, আবেদন অনলাইনে 
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
হৃদরোগীদের পুনর্বাসনে দেশে যুক্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মডেল
  • ০৫ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950