একজন অব্যাহতিপ্রাপ্ত উপাচার্যের সাক্ষাৎকার

২৯ মার্চ ২০২৬, ০৪:৫৭ PM , আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৪:৫৮ PM
চবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার

চবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার © টিডিসি সম্পাদিত

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার। বিগত দেড় বছর দায়িত্ব পালনকালে নানা সংস্কার ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি নিয়োগে বেশকিছু অভিযোগের কারণে আলোচনায় ছিলেন এই উপাচার্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সম্প্রতি তাঁকে অব্যাহতি দেয় বর্তমান সরকার। দায়িত্ব ছাড়ার পর প্রথমবারের মত গণমাধ্যমে মুখ খুলে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, দলীয় রাজনীতি এবং নিজের সময়কালের কাজ ও অভিজ্ঞতা।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে একান্ত এই সাক্ষাৎকারে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ, নিয়োগ প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক প্রভাবসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে খোলামেলা মতামত দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি সুমন বাইজিদ

স্যার, বর্তমানে কেমন আছেন?
ড. আখতার: আলহামদুলিল্লাহ। আমি ভাল আছি।

গণঅভ্যুত্থানের পরপরই আপনাকে হঠাৎ করেই উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আগে থেকে কি এ বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল?
ড. আখতার: না আমি ওই সময়ে এমনটা ভাবিনি। দেখুন, উপাচার্য পদটি অনেক সম্মানের। একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে অন্তবর্তী সরকার আমাকে নিয়োগ দিবে এমনটি চিন্তা করিনি। ২০২৩ সালে অবসরকালীন ছুটি শেষে আমি যুগপৎ কৃষিকাজ এবং লেখালেখিতে ব্যস্ত ছিলাম। অনেক অধ্যাপকদের নাম ওই সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য ভিসি হিসেবে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন, ওই তালিকাগুলোয় আমার নাম ছিল না। থাকবেই বা কেন? আমার ৪০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যতীত অন্য কোনো দায়িত্ব পালন করিনি।

আমরা যতদূর জানি আপনি একজন জনপ্রিয় শিক্ষক। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে প্রশাসনিক পদে না থাকা এটা কি কোনো বৈষম্যের ফল বলে মনে করেন?
ড. আখতার: দেখুন, যে চারটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ বা আইন দ্বারা পরিচালিত, সেখানে পদ-পদবি ও সুযোগ-সুবিধা রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিমাপকে বন্টিত হয়। যেহেতু আমি কোনো ধরণের রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম না সে কারণে হয়তো আমাকে কোনো পদে দায়িত্ব দেয়া হয়নি।

ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি না করলে যদি নেতার সঙ্কট হত, তাহলে পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সংসদে যোগ্য নেতা পাওয়া যেতো না। ওই দেশগুলোর সাংসদরা কি বাংলাদেশের সাংসদদের চেয়ে কম যোগ্য? ওই দেশগুলো ক্যাম্পাসে দলীয় রাচজনীতি চর্চা না করে যদি যোগ্য নেতা তৈরি করতে পারে, তাহলে আমরা কেন দলীয় রাজনীতির নামে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে লেখাপড়ার পরিবেশ বিঘ্নিত করব?

আপনি কি মনে করেন না, একজন জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে আপনার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে?
ড. আখতার: আসলে বিষয়টা ভিন্নভাবে পর্যালোচনা করা যায়। ১৯৭৩ সালের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ শিক্ষকদের রাজনীতি করার অধিকার দিয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোটের মাধ্যমে ডিন নির্বাচিত হয়। সিনেট সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত ৩ সদস্যের প্যানেল থেকে আচার্য কর্তৃক উপাচার্য নিযুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু এ পদে কদাচিৎ এভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সাধারণত, সরকারি দলের গুডবুকে থাকা শিক্ষকদের এ পদগুলোয় নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। বর্ণদলীয় শিক্ষক নেতাগণ তাদের রাজনৈতিক সমর্থকদেরই বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। তারা বর্ণপরিচয়হীন শিক্ষককে এমন পদে নিয়োগে আগ্রহী হন না। এটাই কি স্বাভাবিক নয়? এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক চরিত্র ম্রিয়মান হয়ে এর রাজনৈতিক চরিত্র ক্রমান্বয়ে প্রকট হয়েছে।

যতটুকু জানি নির্বাচিত সরকার হঠাৎ করেই বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে অব্যাহতি দিয়েছে, বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
ড. আখতার: দেখুন, উপাচার্য পদটি চিরস্থায়ী নয়। এখানে পরিবর্তন হওয়া স্বভাবিক প্রক্রিয়া। তবে যে প্রক্রিয়ায় সরকার এ কাজটি করেছে, তা শালীন ছিল না। এর আগেও বিভিন্ন সময় সরকার পরিবর্তনের পর উপাচার্য পরিবর্তন হয়েছে। তবে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর তড়িঘড়ি প্রক্রিয়ায় সংবাদ সম্মেলন করে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে দিয়ে শবে ক্বদরের সময় উপাচার্য পরিবর্তন করা নজিরবিহীন ঘটনা, যা ইতিমধ্যে যুগপৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে সমালোচিত হয়েছে। একজন শিক্ষাবিদ এমন নিয়োগকে 'যাদুকরি রাজনৈতিক নিয়োগ' আখ্যায়িত করে চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

নতুন উপাচার্যের নিয়োগ কেমন হয়েছে?
ড. আখতার: এ ব্যাপারে যাঁরা নিয়োগ দিয়েছেন তাঁরা বলতে পারবেন। আমি যতদুর জানি শিক্ষক বা গবেষক হিসেবে তিনি ভাল। তবে উপাচার্য হিসেবে তিনি কতটা ভাল হবেন তা তাঁর কার্যকলাপ দেখার পর বলা ভাল। সরকার গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তাঁর অতীত কার্যকলাপের ডিএনএ পরীক্ষা করে তাকে নিয়োগ দিয়েছে কিনা আমি জানি না। আমি নতুন উপাচার্যকে শুভেচ্ছা জানিয়েছি। তাঁর সাফল্য কামনা করেছি। তবে আমার নিয়োগ এবং বর্তমান উপাচার্যের নিয়োগের মধ্যে একটি পার্থক্য আছে। কারণ, অন্তবর্তীকালীন সরকার দলনিরপেক্ষ শিক্ষক হিসেবে বাছাই করে আমাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আর বর্তমান সরকার যে ভাবে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছেন তাতে প্রতীয়মান হয়, সরকার অধিকতর দলসক্রিয় শিক্ষকদের উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছেন। এমন নিয়োগ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাকে দলীয়করণের উর্দ্ধে রাখার নির্দেশনার পরিপন্থি।

দলীয় সরকার তো দলীয় শিক্ষককে নিয়োগ দিবেন। এতে অসুবিধা কোথায়?
ড. আখতার: আমার দৃষ্টিতে অসুবিধা আছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক প্রতিষ্ঠান। এটি রাজনৈতিক দলীয় প্রতিষ্ঠান নয়। এমন নিয়োগের ফলে একাডেমিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতির চর্চা বাড়বে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক চরিত্র ম্লান হয়ে এর রাজনৈতিক চরিত্র প্রকট হয়ে উঠবে, যা কাম্য নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতি সীমিত বা বন্ধ করা হলে এতে কি ভবিষ্যতে নেতৃত্ব সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে?
ড. আখতার: না, হবে না। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় নেতা তৈরির ফ্যাক্টরি নয়। এটি যোগ্য গ্রাজুয়েট তৈরির কারখানা। ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি না করলে যদি নেতার সঙ্কট হত, তাহলে পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সংসদে যোগ্য নেতা পাওয়া যেতো না। ওই দেশগুলোর সাংসদরা কি বাংলাদেশের সাংসদদের চেয়ে কম যোগ্য? ওই দেশগুলো ক্যাম্পাসে দলীয় রাচজনীতি চর্চা না করে যদি যোগ্য নেতা তৈরি করতে পারে, তাহলে আমরা কেন দলীয় রাজনীতির নামে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে লেখাপড়ার পরিবেশ বিঘ্নিত করব?

আপনার দায়িত্বকালে উল্লেখযোগ্য কাজগুলো কী কী ছিল? আপনার দেড় বছরের শাসনামলে অনেক কাজ হয়েছে জেনেছি।
ড. আখতার: দেখুন, দেড় বছরে আমরা এত বেশি কাজ করেছি, যা সংক্ষেপে বলে শেষ করা যাবে না। তারপরও নমুনা দিতে পারি। উপাচার্য হওয়ার একদিন পরই শিক্ষক সমাবেশে যোগ দিয়ে প্রথম বক্তৃতায় বলেছিলাম, আমি উপাচার্য থাকলে কেউ কেবলমাত্র মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হতে পারবেন না। আমি যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের স্বার্থে তা করেছি। লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশন এবং ডেমো পাঠদান পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছি। ছাত্রাবাসগুলো থেকে দখলদারিত্বের সংস্কৃতি উচ্ছেদ করে মেধার ভিত্তিতে আসন বণ্টনের ব্যবস্থা করেছি।

প্রমাণ করেছি, শিক্ষার্থীদের ভালবাসলে বিনা টাকায় তাদের সেবা দেওয়া যায়। প্রতিটি হলে ওয়াশিং মেশিন, ভেন্ডিং মেশিন, মেয়েদের হলে স্যানিটারি প্যাডের ভেন্ডিং মেশিন, ই-কার ব্যবস্থা চালু করেছি। জো-বাইক ও পাখি স্কুটির সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। এ সব কাজ করতে টাকা লাগেনি। তবে শিক্ষার্থীরা কি এসব কাজ থেকে সেবা পাচ্ছেন না?

সিনেট সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত ৩ সদস্যের প্যানেল থেকে আচার্য কর্তৃক উপাচার্য নিযুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু এ পদে কদাচিৎ এভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সাধারণত, সরকারি দলের গুডবুকে থাকা শিক্ষকদের এ পদগুলোয় নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। বর্ণদলীয় শিক্ষক নেতাগণ তাদের রাজনৈতিক সমর্থকদেরই বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। তারা বর্ণপরিচয়হীন শিক্ষককে এমন পদে নিয়োগে আগ্রহী হন না।

অবশ্যই সেবা পাচ্ছেন। তবে আবাসন সংকট সমাধানে আপনারা কী উদ্যোগ নিয়েছিলেন?
ড. আখতার: দেখুন, আবাসন এমন একটি সমস্যা, যা রাতারাতি সমাধান করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্ন থেকে ৬০ বছরে হল হয়েছে মাত্র ১৪টি। এতে শতকরা ২০ শতাংশেরও কম শিক্ষার্থীর আবাসন হয়। বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণ আবাসিক করতে হলে আরও অনেক হল করা দরকার। আমরা সে দিকেই যাচ্ছিলাম। শিক্ষার্থীদের সুবিধাকে গুরুত্ব দিয়ে দুটো নির্মানাধীন হলে আমরা দ্রুত শিক্ষার্থী উঠিয়েছি। কয়েকটি পুরানো অবকাঠামোকে সংস্কারের আওতায় এনে শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা চলমান রয়েছে। এ ছাড়া আমাদের উদ্যোগে নতুন গৃহীত ডিপিপিতে কয়েকটি হলের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য আবাসন ছাড়াও আমরা আরও অনেক কিছু করেছি।

যেমন? শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য আর কি করেছেন?
ড. আখতার: আমার সব পরিকল্পনাই আমি করেছি শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে। যেমন ধরুন, আমরা তিন যুগ পরে একটি গ্রহণযোগ্য ও অবিতর্কিত চাকসু নির্বাচন করেছি। বহু বছর পরে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কনভোকেশন স্পিকার করে ৫ম সমাবর্তন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছি। রাঙ্গমাটি যাবার রাস্তা থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ১ নম্বর সড়কের দুই পার্শ্বে ৭ ফুট ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ এলজিআরডি অচিরেই শুরু করবে। জিরো পয়েন্টের ছাপড়া মসজিদের বিপরীতে নান্দনিক ভঙ্গিমার মসজিদের কাজের পাইলিং শুরু হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি আমরা আরও ৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেছি।

ওই প্রকল্পগুলো সম্পর্কে বলবেন কি?
ড. আখতার: এ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে: বিএনসিসি ভবন, পরিবহন কমপ্লেক্স, প্রেস ভবন, পুরানো কলা ভবন শিক্ষক লাউঞ্জ নির্মাণ এবং এর সামনের লেকের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ। এক বছরের মধ্যে এ কাজগুলো সম্পন্ন হবে। এর সঙ্গে সেন্ট্রাল লাইব্রেরিকে আধুনিক করার কাজ চলমান রয়েছে। যাদুঘরকে অধিকতর মানসম্পন্ন করা হয়েছে। সেখানে নির্মিত জুলাই বিপ্লব কর্ণারে শহীদদের রক্তমাখা পরিধেয় সংরক্ষণ করা হয়েছে। মেরিন সায়েন্স অনুষদে ফিশ অ্যাকুইরিয়াম এবং হ্যাচারির কাজ শেষ হয়েছে। পুরাতন অডিটরিয়াম ভবন সংস্কার করে যাদুঘরকে ব্যবহার করার জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে। ব্লু ইকোনমি এক্সপ্লোর করার জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চীন সরকারের সহায়তায় ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণের কাজ শেষ করে এটির উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। এটি চালু হলে সমুদ্র গবেষণায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে।

এ ছাড়া চীনের ইউনান মিনজু ইউনিভার্সিটির সঙ্গে আমাদের সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। এর অধীনে আমাদের ক্যাম্পাসে অচিরেই কনফুসিয়াস ইস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্প সময়ে চীনা ভাষা শিখে চীনে গিয়ে যুগপৎ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং কর্সংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।

আপনার বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, অব্যাহতি প্রদানের আগে আপনি শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সেবামূলক কাজ অব্যাহতভাবে করে যাচ্ছিলেন।
ড. আখতার: আপনি ঠিকই বলেছেন। শিক্ষার্থীদের মেডিকেল সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। নতুন একটি অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করা হয়েছে। আরও দুটি অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ পাবার কথা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের হতাশা দূর করতে মেডিকেলে কাউন্সেলিং ইউনিট করা হয়েছে। ফিজিওথেরাপি সেকশনকে দু’বেলা খোলা রেখে রোগীদের সেবা প্রদান করা হচ্ছে। মেডিকেলে নতুন ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সেবা বাড়াবার জন্য ‘ইনোভেশন হাব’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স অফিস’ করা হয়েছে। আমার সময়কালে দুটি ভর্তি পরীক্ষা (২০২৪-২০২৫ এবং ২০২৫-২০২৬) এবং দুটি বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সবার সহযোগিতা নিয়ে পেশাদারত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে।

এককথায় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের সনাতন চর্চার অবসান ঘটিয়েছি।

নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে আপনার বক্তব্য কী? বিশেষ দলের লোকজনকে চাকুরি দেওয়ার অভিযোগ শোনা গেছে বিভিন্ন সময়ে, এ ব্যাপারে কিছু বলবেন কি?
ড. আখতার: দেখুন, দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে দেওয়ায় যারা এ নেটওয়ার্কে জড়িত ছিলেন তারা আমাদের শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। আমাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়েছে। এটা স্বাভাবিক। আমরা যে কোনো নিয়োগের ব্যাপারে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়েছি। দলীয় পরিচয়, আঞ্চলিকতা, ধর্মীয় পরিচয়, বা স্বজনপ্রীতিকে প্রাধান্য দেইনি। শিক্ষার্থীদের কাছে জিজ্ঞেস করে আপনারা সহজেই আমাদের নিয়োগকৃত শিক্ষকদের গুণগত মান যাচাই করে দেখতে পারেন।

আপনারা যে অল্প সময়ে অনেক কাজ করেছেন তা ঠিক। একাডেমিক উন্নয়নে আপনার বিশেষ উদ্যোগ কী ছিল?
ড. আখতার: দেখুন, আমরা সপ্তাহের সাতদিন অবিরাম পরিশ্রম করেছি। তা না হলে এত কাজ এত কম সময়ে করা সম্ভব হতো না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্বীকৃতি পাইয়ে একে নতুন করে ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় ডে কেয়ার সেন্টারকে দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চারুকলা বিভাগকে শহর থেকে ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। ময়লা ফেলার ডাম্পিং গ্রাউন্ড তৈরি করা হয়েছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ করে ক্যাম্পাসকে পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে।

খেলার মাঠে স্কোয়াশ কোর্ট সংস্কারের কাজ অচিরেই সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। আইসিটি সেল অটোমেশনের কাজে গতিশীলতা আনছে। অনেকগুলো অনুষদের বিভিন্ন বিভাগে গবেষণা ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এভাবে আমাদের সব কাজের কথা স্বল্প পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না।

একাডেমিক ব্যাপারে কিছু বলবেন কি?
ড. আখতার: এটি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ। অধিকাংশ শিক্ষক একাডেমিক দায়িত্বপালনে যত্নবান হলেও কিছু কিছু শিক্ষক এ কাজে একই মাত্রায় নিবেদিতপ্রাণ নন। তারা যাতে ক্লাসে অধিকতর মনোযোগী হন সেজন্য আমি একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করেছি। এর নাম দিয়েছি 'সাডেন ভিজিট' প্রোগ্রাম। এ প্রোগ্রামের আওতায় সময় পেলে হঠাৎ কোনো অনুষদে যাই এবং দেখি বিভাগগুলোতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন কিনা। যদি কোনো শেণিকক্ষে দেখি, শিক্ষার্থী আছেন, কিন্তু শিক্ষক নেই, তাহলে আমি সে ক্লাসে প্রবেশ করে খোঁজ নেই যে কেন শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন না। সভাপতিকে ডেকে তাকে কারণ দর্শাতে বলি। এতে কম দায়িত্বপরায়ন শিক্ষকদের মধ্যে ক্লাস নেবার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া যে সব বিভাগে সেশনজট আছে সেখানে তা কমাবার জন্য জোরালো চেষ্টা নিয়ে উন্নতি ঘটিয়েছি।

দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে দেওয়ায় যারা এ নেটওয়ার্কে জড়িত ছিলেন তারা আমাদের শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। আমাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়েছে। এটা স্বাভাবিক। আমরা যে কোনো নিয়োগের ব্যাপারে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়েছি। দলীয় পরিচয়, আঞ্চলিকতা, ধর্মীয় পরিচয়, বা স্বজনপ্রীতিকে প্রাধান্য দেইনি।

নতুন উপাচার্যের প্রতি আপনার প্রত্যাশা কী?
ড. আখতার: দেখুন, রাজনৈতিক মনোযোগ কমিয়ে শিক্ষার্থীদের ভালোবাসতে পারলে নতুন ভিসির পক্ষে ভালো কাজ করা সম্ভব। আমার বিশ্বাস, আন্তরিকতায় ঘাটতি না থাকলে নতুন ভিসি আমাদের প্রতিষ্ঠিত ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও সুশাসনের গতিকে ধরে রাখতে পারবেন। আমি চাই, আঞ্চলিকতা ও স্বজনপ্রীতির উর্দ্ধে উঠে বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় একটি অনুকরণীয়, অনুসরণীয় একাডেমিক বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করুক এটাই আমার প্রত্যাশা।

আমরা আপনার স্বপ্নের সফলতা কামনা করি। সময় দেওয়ার জন্য দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. আখতার: আপনাকে ও দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে ধন্যবাদ।

পুলিশ হেফাজতে আর এস ফাহিম, যেভাবে আটক করেন ছাত্র-জনতা
  • ২৯ মার্চ ২০২৬
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক নিয়োগ দেবে অ্যাসোসিয়েট, আবেদন শেষ …
  • ২৯ মার্চ ২০২৬
আর এস ফাহিমকে মিরপুর চিড়িয়াখানার সামনে আটকে রেখেছেন ছাত্র-জ…
  • ২৯ মার্চ ২০২৬
চবির দুই সহকারী প্রক্টরের পদত্যাগ
  • ২৯ মার্চ ২০২৬
ইরানে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সৈন্য বৃ…
  • ২৯ মার্চ ২০২৬
শূন্য পদের তথ্য সংগ্রহের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, দেখুন এখানে
  • ২৯ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence