শরীর ক্লান্ত, অথচ রাতে ঘুম আসে না? ঘুম ফেরাতে কার্যকর ৭ উপায়

১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০১ PM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত

সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে, চোখে নেমে আসে ঘুমের ভার। কিন্তু বিছানায় যাওয়ার পরই শুরু হয় উল্টো অভিজ্ঞতা। মাথায় ঘুরতে থাকে নানা চিন্তা, কখনো পুরোনো ঘটনা, কখনো পরদিনের কাজের হিসাব। একসময় ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যায়, অথচ ঘুমের দেখা মেলে না। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই পরিচিত।

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে শরীর ও মস্তিষ্কের অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থাকে বলা হয় ‘হাইপারঅ্যারাউজাল’ (Hyperarousal)। এ অবস্থায় শরীর ক্লান্ত থাকলেও মস্তিষ্ক সহজে শান্ত হতে চায় না। ফলে ঘুমানোর চেষ্টা যত বাড়ে, ঘুম না আসার দুশ্চিন্তাও তত বাড়তে পারে।

তবে কিছু নিয়মিত অভ্যাস ঘুমের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন থেকে শুরু করে শরীরচর্চা, ঘুমের পরিবেশ ঠিক রাখা এবং চিন্তা লিখে রাখার মতো সহজ কিছু পদ্ধতি ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।

১. শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণে বক্স ব্রিদিং
মাথায় একের পর এক চিন্তা ঘুরতে থাকলে শরীর ও মনকে শান্ত করতে বক্স ব্রিদিং (Box Breathing) অনুশীলন করা যেতে পারে। এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের একটি সহজ কৌশল, যেখানে নির্দিষ্ট সময় ধরে শ্বাস নেওয়া, ধরে রাখা এবং ছাড়ার অনুশীলন করা হয়।

এ পদ্ধতিতে চার সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিতে হবে, পরের চার সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখতে হবে, এরপর চার সেকেন্ড ধরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে হবে। সবশেষে চার সেকেন্ড বিরতি দিয়ে আবার একইভাবে শ্বাস নিতে হবে। এভাবে চার থেকে পাঁচবার অনুশীলন করা যায়।

ধীর ও নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাস শরীরের উত্তেজনা কমাতে এবং শিথিল হতে সাহায্য করতে পারে। তবে শ্বাস ধরে রাখতে গিয়ে অস্বস্তি, মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট হলে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে হবে। এক্ষেত্রে জোর করে অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

২. নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
শরীরচর্চা শুধু শারীরিক সুস্থতার জন্য নয়, মানসিক চাপ কমানো এবং ঘুমের মান উন্নত করতেও সহায়ক হতে পারে। নিয়মিত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা কিংবা হালকা অ্যারোবিক ব্যায়াম মেজাজ ভালো রাখতে এবং উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে।

শুরুতে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। সম্ভব হলে দিনের আলোয় হাঁটলে শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা বায়োলজিক্যাল ক্লক ঠিক রাখতেও উপকার পাওয়া যায়।

তবে ঘুমানোর ঠিক আগে খুব তীব্র ব্যায়াম না করাই ভালো। দিনের প্রথম ভাগে অথবা সন্ধ্যার আগেই শরীরচর্চা শেষ করার চেষ্টা করা যেতে পারে। নিয়মিত ব্যায়ামের সঙ্গে ঘুমের উন্নতির সম্পর্ক থাকলেও এর উপকার শুধু এন্ডরফিন নামের একটি রাসায়নিকের ওপর নির্ভর করে না; শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন প্রক্রিয়া এতে ভূমিকা রাখে।

৩. ঘুমের সময় ও পরিবেশ ঠিক রাখুন
ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম (Circadian Rhythm) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি শরীরের প্রায় ২৪ ঘণ্টার জৈবিক ছন্দ, যা ঘুম ও জেগে থাকার সময়সহ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

রাতে অন্ধকারের সংকেত পেয়ে শরীরে মেলাটোনিন (Melatonin) হরমোনের নিঃসরণ বাড়তে শুরু করে। এ হরমোন শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। অনিয়মিত ঘুমের সময়, রাতে উজ্জ্বল আলো এবং দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তন এ ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে।

এ সমস্যা কমাতে প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করা উচিত। ছুটির দিনেও এ অভ্যাস বজায় রাখা ভালো। সকালে ২০ থেকে ৩০ মিনিট প্রাকৃতিক আলোয় থাকলে শরীরের জৈবিক ঘড়ি ঠিক রাখতে সহায়তা করতে পারে।

এ ছাড়া ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য উজ্জ্বল পর্দার ব্যবহার কমানো যেতে পারে। শোবার ঘর অন্ধকার, শান্ত ও আরামদায়ক তাপমাত্রায় রাখা জরুরি। সন্ধ্যার পর চা, কফি, এনার্জি ড্রিংকসহ ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা এবং দিনের বেলা দীর্ঘক্ষণ ঘুমানো থেকে বিরত থাকাও উপকারী হতে পারে।

৪. বিছানায় শুয়ে জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা নয়
ঘুম না এলে অনেকেই বারবার ঘড়ি দেখেন। কত ঘণ্টা ঘুমানো যাবে, সকালে উঠতে সমস্যা হবে কি না—এসব চিন্তা বাড়তে থাকে। এতে ঘুম নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যেতে পারে।

এ অবস্থায় বিছানায় দীর্ঘক্ষণ জেগে না থেকে উঠে কম আলোয় শান্ত কোনো কাজ করা যেতে পারে। যেমন হালকা বই পড়া বা নীরবে বসে থাকা। আবার ঘুম ঘুম ভাব এলে বিছানায় ফিরে যেতে হবে।

এ পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো বিছানার সঙ্গে দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতার সম্পর্ক কমিয়ে ঘুমের স্বাভাবিক অভ্যাস তৈরি করা। দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার ক্ষেত্রে এ নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি ফর ইনসমনিয়া (CBT-I) কার্যকর চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৫. মাথায় ঘুরতে থাকা চিন্তা লিখে ফেলুন
রাতে ঘুম না আসার অন্যতম কারণ হতে পারে পরদিনের কাজ, ব্যক্তিগত সমস্যা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা। এসব চিন্তা বারবার মাথায় ঘুরতে থাকলে মন শান্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ সমস্যা মোকাবিলায় ঘুমানোর আগে ১০ মিনিট সময় নিয়ে চিন্তাগুলো কাগজে লিখে রাখা যেতে পারে। পরদিন কী কী কাজ করতে হবে, কোন বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ হচ্ছে এবং কোন সমস্যার সমাধান এখনই সম্ভব—এসব আলাদা করে লিখুন।

পরদিনের কাজের একটি ছোট তালিকা তৈরি করলেও উপকার হতে পারে। এতে সব দুশ্চিন্তা সঙ্গে সঙ্গে দূর হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে একই চিন্তা বারবার মনে করার প্রবণতা কমাতে এবং পরদিনের কাজ সম্পর্কে কিছুটা প্রস্তুত বোধ করতে এটি সাহায্য করতে পারে।

৬. পেশি শিথিল করা ও মনোযোগের অনুশীলন
শরীর ও মনকে শান্ত করতে প্রগ্রেসিভ মাসল রিল্যাক্সেশন (Progressive Muscle Relaxation) এবং মাইন্ডফুলনেস (Mindfulness) অনুশীলন করা যেতে পারে।

প্রগ্রেসিভ মাসল রিল্যাক্সেশনে শরীরের বিভিন্ন পেশি কয়েক সেকেন্ড আলতো করে সংকুচিত করে পরে ছেড়ে দিতে হয়। পায়ের পেশি থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে হাত, কাঁধ ও মুখের পেশিতে এ অনুশীলন করা যায়। এতে শরীরের কোথায় টান জমে আছে, তা বুঝতে এবং পেশি শিথিল করতে সুবিধা হতে পারে।

অন্যদিকে, মাইন্ডফুলনেস অনুশীলনে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়। এ সময় অন্য চিন্তা মাথায় এলে নিজেকে দোষ না দিয়ে আবার শ্বাসের দিকে মন ফেরাতে হবে। এর লক্ষ্য চিন্তাকে জোর করে থামানো নয়, বরং চিন্তা এলেও তার সঙ্গে অতিরিক্ত উদ্বেগে জড়িয়ে না পড়া।

নিয়মিত অনুশীলন মানসিক ও শারীরিক উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি সমান কার্যকর নাও হতে পারে।

৭. কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে, দিনের কাজকর্ম ব্যাহত হলে কিংবা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমভাব দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। ঘুমের সমস্যার পেছনে মানসিক চাপ ছাড়াও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অন্য ঘুমজনিত সমস্যা থাকতে পারে।

নিজে থেকে মেলাটোনিন, ঘুমের ওষুধ বা সেডেটিভ গ্রহণ করা উচিত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক সমস্যার কারণ নির্ণয় করে উপযুক্ত চিকিৎসা দিতে পারেন। দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার ক্ষেত্রে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি ফর ইনসমনিয়া (CBT-I) বিশেষভাবে কার্যকর একটি চিকিৎসাপদ্ধতি।

সবশেষে মনে রাখা জরুরি, ঘুমকে জোর করে আনা যায় না। বরং নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যায়। একেকজনের ক্ষেত্রে একেকটি পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। তাই নিজের জন্য উপযোগী অভ্যাস খুঁজে নিয়ে তা নিয়মিত চর্চা করাই গুরুত্বপূর্ণ।

ট্যাগ: ঘুম
মিয়ানমারে পাচারকালে ৩০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ, আটক ১
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
সারারাত এপাশ-ওপাশ? গভীর রাতে আরামদায়ক ঘুমের জন্য মেনে চলুন …
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
চবিতে ছাত্রদল নেতা মুছাকে স্মরণ, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
গভীর রাতে গুনাহ মাফ ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ আমল 
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে জামায়াতকর্মী নিহত
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950