ঈদের ছুটিতে শিশুরা নানা ধরনের বিপদে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে © সংগৃহীত
ঈদের ছুটি মানেই আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর এক বিশেষ উপলক্ষ। বিশেষ করে কোরবানির ঈদে গ্রামের বাড়ি ফেরা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিলনমেলা এবং শিশুদের অবাধ আনন্দের সুযোগ তৈরি হয়। তবে উৎসবের এই আনন্দঘন পরিবেশে কিছু ঝুঁকিও লুকিয়ে থাকে, যা সামান্য অসতর্কতায় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা জরুরি।
পানিতে ডুবে যাওয়ার শঙ্কা
গ্রামের খোলামেলা পরিবেশে পুকুর, ডোবা, খাল-বিল ও জলাশয়ের সংখ্যা বেশি থাকে। ঈদের ছুটিতে শিশুরা খেলাধুলা ও ঘোরাঘুরিতে ব্যস্ত থাকে। অনেক সময় তারা অভিভাবকদের চোখ এড়িয়ে জলাশয়ের কাছে চলে যায়। সাঁতার না জানা বা অসতর্কতার কারণে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা প্রায়ই ঘটে। বাড়ির আশপাশে পুকুর বা ডোবা থাকলে শিশুদের কখনো একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। সব সময় একজন প্রাপ্তবয়স্কের তত্ত্বাবধানে রাখা প্রয়োজন।
রাস্তার পাশে বাড়ি হলে বাড়তি সতর্কতা
যেসব পরিবারের বাড়ি ব্যস্ত সড়ক, মহাসড়ক বা বাজারসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত, সেসব পরিবারের শিশুদের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন। ঈদের সময় যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। শিশুরা খেলতে খেলতে বা হঠাৎ দৌড়ে রাস্তার ওপর চলে গেলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই শিশুদের রাস্তার পাশে খেলাধুলা করতে না দেওয়া এবং সব সময় নজরদারিতে রাখা জরুরি।
ভিড়-ভাট্টায় ছোঁয়াচে রোগের ঝুঁকি
ঈদের সময় বিভিন্ন এলাকায় মানুষের ব্যাপক সমাগম হয়। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়ানো, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং শিশুদের অবাধ মেলামেশার ফলে হামসহ বিভিন্ন ছোঁয়াচে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই শিশু কার সঙ্গে মিশছে, কোনো অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে যাচ্ছে কি না, সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন। জ্বর, শরীরে র্যাশ বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ফলের মৌসুমে গলায় বিচি আটকে যাওয়ার ঝুঁকি
এ সময় বাজারে বিভিন্ন মৌসুমি ফলের সমারোহ দেখা যায়। বিশেষ করে লিচু শিশুদের খুবই প্রিয়। তবে ছোট শিশুরা তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে অনেক সময় বিচি গিলে ফেলতে পারে বা গলায় আটকে যেতে পারে। এতে শ্বাসরোধের মতো গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই ছোট শিশুদের নিজের হাতে খোসা ছাড়িয়ে ও বিচি ফেলে ফল খেতে দেওয়া উচিত।
কুকুর ও বিড়ালের কামড়ের ঝুঁকি
ঈদের ছুটিতে শিশুদের বাইরে চলাফেরা ও খেলাধুলা বেড়ে যায়। এ সময় তারা অনেক ক্ষেত্রে পথের কুকুর বা বিড়ালের সংস্পর্শে আসে। প্রাণীদের উত্যক্ত করা বা অসাবধানতাবশত কাছে গেলে কামড় বা আঁচড়ের ঘটনা ঘটতে পারে। এতে জলাতঙ্কের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি থাকে। তাই শিশুদের অপরিচিত প্রাণী থেকে দূরে থাকতে শেখাতে হবে। কামড় বা আঁচড় লাগলে দ্রুত সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে ক্ষতস্থান ধুয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতা
ঈদের সময় বাড়িতে পরিচিত ও অপরিচিত অনেক মানুষের আনাগোনা থাকে। এ সময় শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি অবহেলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ শিশু নির্যাতনের ঘটনা পরিচিত মানুষের মাধ্যমেই ঘটে। তাই শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে খেলছে কিংবা কেউ তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে কি না, সেদিকে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে।
আরও পড়ুন: ঈদের দিন সকালে একসঙ্গে প্রাণ হারালেন ৫ জন
শিশুকে ছোটবেলা থেকেই ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। কেউ জোর করে কিছু করতে চাইলে বা কোনো আচরণে অস্বস্তি বোধ করলে যেন সে নির্ভয়ে পরিবারের সদস্যদের জানাতে পারে, সেই সাহস ও আস্থার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
কোরবানির সময় ধারালো অস্ত্র ব্যবহারে সতর্কতা
কোরবানির ঈদে মাংস কাটার সময় ছুরি, বঁটি ও চাপাতির মতো ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেকেই উৎসাহের বশে এসব কাজে অংশ নিয়ে অসাবধানতাবশত হাত বা শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত পান। শিশুদেরও এসব স্থান থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে। কারণ এক মুহূর্তের অসতর্কতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
কেটে গেলে যা করবেন
দুর্ঘটনাবশত শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে প্রথমেই ক্ষতস্থান পরিষ্কার প্রবাহমান পানিতে ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর পরিষ্কার কাপড় বা গজ দিয়ে কিছুক্ষণ চাপ দিয়ে রক্তপাত বন্ধের চেষ্টা করতে হবে। ক্ষতস্থানে মাটি, হলুদ বা টুথপেস্ট লাগানোর মতো ভুল পদ্ধতি পরিহার করতে হবে, কারণ এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
রক্তপাত বন্ধ হলে অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করে ব্যান্ডেজ করা যেতে পারে। তবে ক্ষত গভীর হলে বা রক্তপাত বন্ধ না হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিটেনাস প্রতিরোধক ইনজেকশন নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
উৎসব আমাদের জীবনে আনন্দ ও সুন্দর স্মৃতি তৈরির জন্য আসে। তাই শিশুদের আনন্দে বাধা না দিয়ে তাদের নিরাপত্তার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অভিভাবকদের সচেতনতা ও সতর্ক নজরদারিই পারে একটি নিরাপদ, আনন্দময় ও দুর্ঘটনামুক্ত ঈদ নিশ্চিত করতে।