টেক সিওরা © সংগৃহীত
বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে গণছাঁটাই এখন যেন একটা বার্ষিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। তবে এই ছাঁটাইয়ের পেছনে কর্মকর্তারা আগে যে ধরনের অজুহাত দিতেন, তা এখন বদলে গেছে।
আগে তারা বলতেন 'দক্ষতা বৃদ্ধি', 'বেশি কর্মী নিয়োগ করে ফেলা' কিংবা 'ম্যানেজমেন্টের বাড়তি স্তর কমানো'র কথা। কিন্তু এখন সব ধরনের ছাঁটাইয়ের পেছনে একটাই কারণ দেখানো হচ্ছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
সম্প্রতি গুগল, আমাজন, মেটা-র মতো বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পিন্টারেস্ট ও অ্যাটলাসিয়ানের মতো ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোও কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা বা সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাদের দাবি, এআই-এর অগ্রগতির কারণে এখন অনেক কম কর্মী দিয়েই বেশি কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
মেটা প্রধান মার্ক জাকারবার্গ গত জানুয়ারিতে বলেছিলেন, 'আমি মনে করি ২০২৬ সালটি এমন একটি বছর হতে যাচ্ছে যেখানে এআই আমাদের কাজের ধরন নাটকীয়ভাবে বদলে দিতে শুরু করবে।' এর পর থেকেই তার প্রতিষ্ঠান থেকে শত শত কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। যদিও মেটা এই বছর এআই-এর পেছনে খরচ দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নতুন কর্মী নিচ্ছে, তবুও সামনের দিনগুলোতে আরও ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান 'ব্লক'-এর প্রধান জ্যাক ডরসি এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট কথা বলেছেন। শেয়ারহোল্ডারদের তিনি জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠান প্রায় অর্ধেক কর্মী ছাঁটাই করতে যাচ্ছে।
ডরসি বলেন, 'এআই টুলগুলো একটি কোম্পানি তৈরি এবং চালানোর ধারণাটাই বদলে দিয়েছে। অনেক ছোট একটি দল এই টুলগুলো ব্যবহার করে আরও বড় এবং ভালো কাজ করতে পারে।'
তিনি মনে করেন আগামী বছরের মধ্যে বেশিরভাগ কোম্পানিই এই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে। তাই তিনি একটু আগেভাগেই এই পথে হেঁটেছেন।
তবে অনেক সমালোচক ডরসির এই যুক্তি মানতে নারাজ। তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গত দুই বছরে তিনি অন্তত দুইবার গণছাঁটাই করেছেন এবং তখন এআই-এর কোনো নামগন্ধও নেননি।
প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারী টেরেন্স রোহান বলেন, প্রতিষ্ঠানের খরচ কমানো বা শেয়ারহোল্ডারদের খুশি করার কথা বলার চেয়ে এআই-এর দোহাই দেওয়াটা শুনতে অনেক ভালো শোনায়। এতে অন্তত নিজেকে সেই 'খলনায়ক' মনে হয় না, যে শুধু খরচ বাঁচানোর জন্য মানুষকে চাকরি থেকে বের করে দিচ্ছে।
তবে রোহান এও জানিয়েছেন যে এর পেছনে কিছু বাস্তব সত্যও আছে। তিনি যেসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের অনেকেই এখন ২৫% থেকে ৭৫% কোডিং বা প্রোগ্রামিংয়ের কাজ এআই দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে। এর মানে হলো সফটওয়্যার ডেভেলপার বা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারদের মতো একসময়ের নিরাপদ ও উচ্চ বেতনের চাকরিগুলো এখন সত্যিই হুমকির মুখে।
এআই প্রযুক্তির কারণে চাকরি চলে যাওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ রয়েছে, যার সাথে চ্যাটবট বা কোডিং টুলের কাজের দক্ষতার কোনো সম্পর্ক নেই।
আমাজন, মেটা, গুগল এবং মাইক্রোসফট—এই চার জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান আগামী বছর এআই-এর পেছনে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন ডলার (বা ৪৮৫ বিলিয়ন পাউন্ড) খরচ করার পরিকল্পনা করছে। এই বিশাল খরচের ধাক্কা দেখে শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীরা যাতে ভয় না পান, তাই বড় কর্তারা খরচ কমানোর জন্য কর্মীদের বেতনের ওপর কোপ বসাচ্ছেন। কারণ যেকোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় খরচ হলো তাদের কর্মীদের বেতন।
কোম্পানিগুলো এই যোগসূত্রটি মোটেও লুকাচ্ছে না। আগামী বছর এআই খাতে ২০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করার ঘোষণা দেওয়ার সাথে সাথেই আমাজনের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার জানিয়েছেন, তারা অন্যান্য খাতে খরচ কমিয়ে এর ভারসাম্য বজায় রাখবেন। গত অক্টোবর থেকে আমাজন প্রায় ৩০,০০০ কর্পোরেট কর্মী ছাঁটাই করেছে।
এআই-তে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করার সময় গুগলও বিনিয়োগকারীদের একই ধরনের আশ্বাস দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, কর্মীদের পেছনে খরচ বাঁচিয়ে যে পুঁজি পাওয়া যাবে, তা ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির জন্য এআই-তে বিনিয়োগ করা হবে।
বাইন কনসালটেন্সির প্রযুক্তি শাখার প্রধান অ্যান হোয়েকার বলেন, চাকরি ছাঁটাই করার মাধ্যমে শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীদের এই বার্তা দেওয়া হয় যে কর্তারা চোখ বন্ধ করে যত্রতত্র টাকা ওড়াচ্ছেন না। কর্মী ছাঁটাই হয়তো এআই-এর বিশাল বিলের তুলনায় খুব সামান্য কিছু টাকা বাঁচাবে, কিন্তু এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলো যে একটা নিয়মের মধ্যে চলছে এবং খরচ কমানোর চেষ্টা করছে—সেই শৃঙ্খলাটা প্রকাশ পায়।