আহমেদ নাফিস হাসান © সংগৃহীত
বিসিএসের পড়াশোনায় ভাটা পড়বে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এডি পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও যোগ দেননি আহমেদ নাফিস হাসান। কাঙ্ক্ষিত ক্যাডার পদ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছেন ৫ বছর। অবশেষে তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ৪৬তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
জানা গেছে, নাফিস হাসান রাজধানীর মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হন মিলিটারি ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)-তে। পুলিশ ক্যাডার হওয়ার খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেই নিশ্চিত করেছেন নাফিস। তার পোস্টটি (ঈষৎ পরিমার্জিত) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
নটরডেমে পড়ার সময় থেকেই স্বপ্ন দেখতাম—পুলিশ হব, পুলিশ হব। বিএসসি জীবনে ঠিকমতো পড়াশোনা করিনি, কারণ মাথায় একটাই চিন্তা ছিল—পাস করলেই হবে, বিসিএসের জন্য পড়ব। আলহামদুলিল্লাহ, পাশ করলাম। শুরু করলাম বিসিএস দেওয়া। প্রথমবার প্রিলি ফেল করলাম। এরপর এলজিইডিতে একটা চাকরি নিলাম। চাকরি করে পড়াশোনা করা যে কতটা কঠিন, তখন বুঝলাম। অফিস থেকে এসে বই নিয়ে বসতাম। দিন–রাত এক করে পড়তাম। অফিসের ফাঁকে পড়ি, অফিস শেষে পড়ি—যতটুকু সময় পাওয়া যায়, সবটাই পড়াশোনায়।
এই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে এডি হলাম—কিন্তু গেলাম না। কারণ মনের ভেতর একটাই আশা—পুলিশ হব। কিন্তু ৪৩তম বিসিএসে পুলিশ পেলাম না। সেদিন হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম। দিনের পর দিন কাঁদলাম। টুয়েলভ ফেল সিনেমা দেখে কাঁদতে কাঁদতে রাত–দিন এক করে ফেলেছি। রাস্তায় পুলিশের গাড়ি দেখলে চোখ ভিজে যেত। ফ্যামিলির কেউ পুলিশ ক্যাডার, বন্ধুবান্ধব পুলিশ ক্যাডার—দেখলেই বুকটা ফেটে যেত।
৪৪তম বিসিএসে নন-ক্যাডার পেলাম। ভাইভা বোর্ডে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করল—৪৩তম তে জয়েন করিনি কেন। ভালোই ধুয়ে দিল। ৪৫তম বিসিএসে তো প্রিলিই পাশ করিনি।
৪৩তম তে ধাক্কা খাওয়ার পর ধীরে ধীরে পুলিশের প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা জন্মাল। মনে মনে ঠিক করলাম—পুলিশ আর কোনোদিন চয়েজেই দেব না। ৪৬তম বিসিএসে চারটা চয়েজ দিলাম। পুলিশ রাখলাম একেবারে নিচে। রাখতামও না—কী মনে করে যেন রাখলাম।
এই বিসিএসটা দিয়েছি পুরো কমেডির মতো। মানুষ যেখানে ২২–২৩ ঘণ্টা পরীক্ষা দিয়ে পাগল হয়ে যায়, সেখানে আমি রাত ১০টা পর্যন্ত অফিস করে সকালে চোখ কচলাতে কচলাতে পরীক্ষার হলে গেছি। তিনটা পরীক্ষা দিয়েছি দৌড়ে দৌড়ে হলে ঢুকে।
এর মাঝেই বাসা চেঞ্জ করলাম। বিসিএসের সব বই–খাতা আল্লাহর নাম নিয়ে ফেলে দিয়ে এলাম। ফেলার সময় দেখি—বাসাভর্তি বিসিএসের বই। প্রিলি, রিটেন, ভাইভা—এক সাবজেক্টের ৪–৫টা করে বই। এত বই, এত নোট, এত খাতা—কোনো সীমা নেই। তিন দফায় বই ফেলেছি। আম্মু অনেকগুলো কেজি দরে বিক্রি করে দিয়েছেন। কিছুই না পড়ে ভাইভা দিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, ভাইভাটা খুব ভালো হয়েছিল।
এরপর বিসিএস একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি। ৪৭তম থেকে আর কোনো বিসিএসে অ্যাপ্লাই করিনি। আমার কাছে বিসিএস একটা খুব বাজে প্রসেস। এই প্রসেসে ঢুকে জীবনটা প্রায় শেষ করে ফেলেছিলাম। সারাক্ষণ টেনশন। যেদিন সিদ্ধান্ত নিলাম বিসিএস আর দেব না, সেদিন থেকে কী যে শান্তি পেয়েছি!
এই বিসিএসের জন্য কোথাও যাইনি—বন্ধুদের বিয়েতে যাইনি, ফ্যামিলি প্রোগ্রামে যাইনি। বউকে সময় দিইনি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস দেখা করিনি। তবুও মেয়েটা দিনের পর দিন আমাকে সাপোর্ট দিয়েছে, ভালোবেসে গেছে।
কী ভয়ংকর একটা বিসিএস জার্নি ছিল! ৪৩তম বিসিএসের পর পুলিশের নামই সহ্য করতে পারতাম না। কোনো বিসিএসেই আর পুলিশ প্রথম চয়েজ দিইনি। আর শেষ পর্যন্ত—৪৬তম বিসিএসে এসে, একেবারে উদাসীনভাবে দেওয়া একটা পরীক্ষায় পেয়ে গেলাম পুলিশ। তখন আর পুলিশের প্রতি আগের সেই ফ্যাসিনেশনও নেই। কারণ পুলিশ না হওয়ায় আমি এত কষ্ট পেয়েছি, এত দুঃখ পেয়েছি।
যাই হোক আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ মনের আশা পূরণ করেছেন। আমার পাঁচ বছরের পরিশ্রমের পূর্ণতা দিয়েছেন।