বুটেক্স
বুটেক্সের সমাবর্তন মঞ্চে মো. ফারুক আহমেদ ও লামিয়া আক্তার © টিডিসি
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, অনেকের জীবনে এটি স্মৃতি, সংগ্রাম ও স্বপ্নের এক অনন্য ঠিকানা। তেমনই এক অনুপ্রেরণাদায়ী গল্পের সাক্ষী হলো বুটেক্সের প্রথম সমাবর্তন। ক্লাসরুমের বন্ধুত্ব থেকে জীবনসঙ্গী হয়ে ওঠা এক দম্পতি একই দিনে একই মঞ্চে গ্র্যাজুয়েশনের ডিগ্রি গ্রহণ করলেন। তারা উভয়েই বুটেক্সের ৪১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।
ওই দম্পতি হলেন ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ফারুক আহমেদ ও লামিয়া আক্তার।
ফারুক ও লামিয়ার পরিচয়ের শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। ফার্মগেট থেকে মিরপুরগামী বাসে প্রথম দেখা। পরবর্তী সময়ে ওরিয়েন্টেশনে আবার দেখা। সেখান থেকেই জানা যায়, দুজনই একই বিভাগের শিক্ষার্থী। ধীরে ধীরে সেই পরিচয় গড়ায় বন্ধুত্বে, আর বন্ধুত্ব থেকেই তৈরি হয় গভীর বোঝাপড়া।
ক্যাম্পাসে কাটানো স্মরণীয় দিন
বুটেক্সে কাটানো শিক্ষাজীবন তাদের দুজনের কাছেই জীবনের সেরা সময়গুলোর একটি। একই বিভাগে ও ল্যাবে পড়াশোনার কারণে বেশির ভাগ সময় কেটেছে ক্যাম্পাসে। পড়াশোনার ধরনে দুজনের মধ্যে ছিল পার্থক্য একজন দ্রুত সমাধানে বিশ্বাসী, অন্যজন বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে বুঝতে আগ্রহী। এই ভিন্নতাই শেষ পর্যন্ত পড়াশোনায় এনে দিত ইতিবাচক ফলাফল।
ক্লাস শেষে বাসস্টপ পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়া, একসঙ্গে পড়ালেখা, পরীক্ষার আগের চাপ সব মিলিয়ে ক্যাম্পাস লাইফে তৈরি হয় অসংখ্য স্মৃতি। বন্ধুত্বের জায়গাটিও ছিল দৃঢ়, ভালো সময়ের পাশাপাশি কঠিন সময়েও ছিলেন একে অপরের পাশে।
বৃষ্টি, পরীক্ষা আর দায়িত্ববোধ
একটি বিশেষ স্মৃতি আজও তাদের মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। ওয়েট প্রসেসিং পরীক্ষার দিন প্রবল বৃষ্টির কারণে বাস রাস্তায় আটকে গেলে ক্যাম্পাসে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেই পরিস্থিতিতে দ্রুত বাইকের ব্যবস্থা করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেন মো. ফারুক আহমেদ। দেরিতে পৌঁছালেও দুজনই পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। এই ছোট ছোট দায়িত্ববোধই তাদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তোলে।
বন্ধুত্ব থেকে জীবনসঙ্গী
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ফারুক ও লামিয়া উপলব্ধি করেন একে অপরের প্রতি দায়িত্ব, বিশ্বাস ও মানসিক সাপোর্টই তাদের সম্পর্কের ভিত্তি। সমস্যা বা বিপদের সময় নিজের কথা না ভেবে একে অপরকে পাশে পাওয়া—এই অভ্যাস থেকেই আসে জীবনের বড় সিদ্ধান্ত। প্রায় তিন বছরের বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়ার পর তারা একসঙ্গে জীবনপথে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের পক্ষ থেকেও পেয়েছেন পূর্ণ সমর্থন। শুরু থেকেই দুজনের বন্ধুত্ব সম্পর্কে পরিবার অবগত ছিল। পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত জানালে কোনো আপত্তি ছাড়াই পরিবার তাঁদের পাশে দাঁড়ায়।
একই দিনে, একই মঞ্চে
বুটেক্সের সমাবর্তন মানেই আলাদা এক আবেগ। তবে এ সমাবর্তন তাদের জন্য ছিল আরও বিশেষ। লামিয়া আক্তার বলেন, একই দিনে, একই মঞ্চে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ডিগ্রি গ্রহণ এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সমাবর্তনের ঠিক আগে একটি ছোট অস্ত্রোপচার ও হঠাৎ জরুরি পরিস্থিতির কারণে কিছুটা দেরিতে পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত তারা সমাবর্তনে অংশ নিতে পেরেছেন।
যেখানে সমাবর্তনে অতিথি আনার সুযোগ ছিল না, সেখানে ফারুক ও লামিয়া ছিলেন একে অপরের ‘চিফ গেস্ট’। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, ছবি তোলা আর ক্যাম্পাসের স্মৃতি রোমন্থন—সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে আজীবনের স্মৃতি।
ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
দুজনই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়েছেন একই সেক্টরে। লামিয়া আক্তার বর্তমানে জার্মান মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠান হাহেনস্টাইন ল্যাবরেটরিজ বাংলাদেশ লিমিটেডে সিনিয়র ল্যাব টেকনোলজিস্ট হিসেবে কর্মরত এবং এটি তার প্রথম কর্মস্থল। অন্যদিকে মো. ফারুক আহমেদ বর্তমানে রুডলফ বাংলাদেশ লিমিটেডে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এই দম্পতি জানান, ভবিষ্যতে দুজনেরই লক্ষ্য নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষতা আরও বাড়িয়ে নেতৃত্ব পর্যায়ে পৌঁছানো এবং টেক্সটাইল সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা।
বুটেক্স একটি অনুভূতির নাম
এই দম্পতির জীবনে বুটেক্স শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং একটি আবেগ। ক্যাম্পাস লাইফ, হল জীবন, খেলাধুলা সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য স্মৃতি। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই বুটেক্সই তাঁদের একে অপরের সঙ্গে পরিচিত করেছে, দিয়েছে জীবনের সঙ্গী।
বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তা
বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এই দম্পতি পরামর্শ দেন, সম্পর্ক ও ক্যারিয়ার দুটোকেই গুরুত্ব দিতে হবে। তবে ভারসাম্য বজায় রাখাটাই সবচেয়ে জরুরি। খোলামেলা যোগাযোগ, একে অপরকে বোঝার মানসিকতা এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের মতে, একটি ভালো ক্যারিয়ার যেমন একটি সম্পর্ককে শক্ত ভিত্তি দেয়, তেমনি একটি ভালো সম্পর্কও ক্যারিয়ারকে আরও দৃঢ় করে তোলে।