কিভাবে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আমূল পরিবর্তন করে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যায় তা দেখিয়ে দিয়েছেন নীলফামারির সৈয়দপুর উপজেলার ডাংগারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শিবলি বেগম। তার দুই বছরের প্রচেষ্টায় ওই বিদ্যালয়ে বেড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি বদলে গেছে বিদ্যালয়টির পরিবেশ। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়া রোধে ও পড়াশুনায় মনোযোগ ধরে রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
বিদ্যালয়টি ১৯৭২ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০১৩ সালে জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে সেখানে ১২৮ জন শিক্ষার্থীর পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন চার শিক্ষক। গত দুই বছরে বিভিন্ন উদ্যোগে বদলে গেছে বিদ্যালয়টি।
শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও মেধার পরিসর বৃদ্ধিতে এখানে রয়েছে ১০ জনের ক্ষুদে চিকিত্সক দল এবং ১০ জনের কাব স্কাউট। বিদ্যালয়টিতে অভিভাবক সমাবেশ, ব্যবস্থাপনা কমিটির মিটিং এবং অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হোম ভিজিট নিয়মিতই হচ্ছে। এখানে চালু রয়েছে মিড ডে মিল।
.png)
বিদ্যালয়টির ৫ টি শ্রেণিকক্ষের নামকরণ করা হয়েছে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত, কবি সুফিয়া কালাম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ও পল্লীকবি জসিমউদ্দিনের নামে। নামাজের জন্য রয়েছে একটি কক্ষ।
জাতীয় পতাকায় আচ্ছ্বাদিত বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করলেই দৃষ্টি কাড়বে সদ্য নির্মিত শহীদ মিনার। বিদ্যালয়ের দেয়ালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ রয়েছে ভাষা শহীদের প্রতিকৃতি। চিত্রিত হয়েছে জাতীয় ফুল, জাতীয় ফল, জাতীয় পাখি, বাংলা বর্ণের সমাহার প্রভৃতি। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের মাঝে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে লাইব্রেরি, সত্ মানসিকতা তৈরিতে সততা স্টোর, ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে স্টুডেন্ট কাউন্সিল এবং স্থাপন করা হয়েছে অভিযোগ বাক্স। সর্বশেষ স্থাপন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কর্ণার। গত ১৪ নভেম্বর এটির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান চৌধুরী।
.png)
ওই বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলোও যেন শিক্ষক। সাজসজ্জা আর পরিপাটি সম্পন্ন দেয়ালে স্থান পেয়েছে শিক্ষাবিষয়ক দর্শনীয় উপকরণ। কর্ণারে দেশবিভাগ, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা, লাহোর প্রস্তাব, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, অস্থায়ী সরকার গঠন, ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ, বীরাঙ্গনা, সেক্টর কমান্ডার, জাতীয় ৪ নেতা, ভাষা শহীদ, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসর্মপণ, সৈয়দপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার চিত্র।
প্রধান শিক্ষিকা শিবলি বেগম বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা শিক্ষা অফিস, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং শিক্ষকদের সহায়তায় এটি করতে পেরেছি। সর্বশেষ আমি শিক্ষার্থীদের মাঝে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছড়িয়ে দিতে এবং মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত আমাদের যে অর্জন সেগুলো উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। স্লিপ এবং ক্ষুদ্র মেরামত বরাদ্দের টাকা আমি বিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহার করেছি। যাতে শিক্ষার্থীদের এবং প্রতিষ্ঠানের কাজে আসে। কাজের শেষ নেই, তবে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নান্দনিক একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে পারবো।’
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আমিরুজ্জামান বকুল বলেন, ‘আমরা প্রতিমাসে বৈঠকে মিলিত হই। ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করি। আর এটি সম্ভব হয়েছে বর্তমান প্রধান শিক্ষকের কারণে। একজন মানুষ বিদ্যালয়টি ঘুরে দেখলে শিক্ষা গ্রহণের জন্য যে পরিবেশ দরকার সেটি উপলব্ধি করতে পারবেন। কী নেই এখানে! অভিভাবক এবং মা সমাবেশ প্রায়ই হয়ে থাকে। শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়টি একটি উদাহরণ হতে পারে।’
জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘নিঃসন্দেহে ডাংগারহাট বিদ্যালয়টি আমাদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। একজন মানুষের ইচ্ছে থাকলেই যে করা যায় সেটি করে দেখিয়েছেন এখানকার প্রধান শিক্ষিকা। শিক্ষার্থীরা এখান থেকে উপলব্ধি করতে পারবে, শিখবে ও জানবে।’