বালিগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় © সংগৃহীত
ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, অফিস সহকারীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গাফিলতিতে ৯২ শিক্ষার্থীর মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তবে পরীক্ষার আগেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে আশ্বস্ত করছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯২ শিক্ষার্থী এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তাদের পরীক্ষার বোর্ড ফি বাবদ ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা পরিশোধের জন্য ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে স্কুলের অফিস সহকারী মিহির চন্দ্র শীলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মিহির ওই টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন। কয়েক মাস পরও ওই টাকা বোর্ডে জমা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখেননি প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি ফেনীর অন্যান্য বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র এলেও বালিগাঁও উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপত্র না আসায় বিষয়টি জানাজানি হয়।
বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানায়, চলতি মাসের ২১ তারিখ থেকে অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি পরীক্ষায় বালিগাঁও উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ১৪ জন, মানবিক থেকে ১৬ জন, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ২৫ জন ও ৩৭ জন অনিয়মিত শিক্ষার্থীসহ মোট ৯২ জন অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। কয়েক দিন আগেই ফেনীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র হাতে তুলে দেয়। কিন্তু বালিগাঁও উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র না আসার কারণ খুঁজতে গিয়ে বোর্ড ফি পরিশোধ না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড। বিষয়টি জানার পর বৃহস্পতিবার সকালে বিদ্যালয়ে জরুরি সভায় বসেন শিক্ষকরা। তারা স্কুলের কোচিংয়ের টাকা থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা প্রধান শিক্ষকের হাতে দিয়ে দ্রুত বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তারপর বিষয়টি সমাধান করতে প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম ও সহকারী প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন সেদিন দুপুরের মধ্যেই শিক্ষা বোর্ডে পৌঁছেন। সেখানে তারা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করে প্রবেশপত্র পাওয়ার আশ্বাস পেলেও নিশ্চিত সমাধান পাননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন, অফিস সহকারী মিহির চন্দ্র শীল বহু মানুষের কাছে দেনা রয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী পাওনাদারদের এড়িয়ে চলতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন মিহির। বিদ্যালয়ে নিজ দায়িত্বেও ছিলেন অনিয়মিত। এসব বিষয়গুলো অবগত হওয়ার পরেও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাকে নিয়মিত বেতন-ভাতা দিয়েছেন। পরীক্ষার্থীদের বোর্ডের ফি বাবদ তার হাতে দেওয়া ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা জমা হয়েছে কি না, সেটিও প্রধান শিক্ষক এত দিন যাচাই করেননি। এমন কাণ্ডে প্রধান শিক্ষক কোনোভাবে দায় এড়াতে পারেন না।
বালিগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বোর্ড ফি জমা দেওয়ার দায়িত্ব অফিস সহকারীর ওপর অর্পিত ছিল। কিন্তু তিনি নির্ধারিত টাকা বোর্ডে জমা দেয়নি এবং বিষয়টি আমাদের জানাননি। পরে যাচাই-বাছাই করে সেই টাকাগুলো জমা দেওয়া হয়নি বলে নিশ্চিত হয়েছি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকে অফিস সহকারীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে আমি এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক বৃহস্পতিবার কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্রের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র সংগ্রহ ও মিলাদ মাহফিল আয়োজনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।’
অফিস সহকারীর বিষয়ে তিনি বলেন, যেহেতু বোর্ড ফি জমা দেওয়ার দায়িত্ব তার ওপরই ছিল, তাই তার এমন গাফিলতির জন্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মিহির চন্দ্র শীলকে একাধিকবার কল দিলেও সাড়া মেলেনি।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা নাসরিন কান্তা বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষার বোর্ড ফি জমা না হওয়ার বিষয়টি প্রধান শিক্ষক অবহিত করেননি। বিষয়টি জানার পর প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে একাডেমিক সুপারভাইজারের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়। শিক্ষকরা বৃহস্পতিবার বোর্ডে গিয়েছেন এবং সেখানে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। রবিবার (১২ এপ্রিল) তারা আবার বোর্ডে যাবেন। শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র দ্রুত হাতে পেতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনার জন্য প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে।’
এ ব্যাপারে ফেনী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফী উল্লাহ বলেন, প্রবেশপত্র-সংক্রান্ত বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানকেই সরাসরি যোগাযোগ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়টি অবগত হয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।