ছত্রগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয় © টিডিসি সম্পাদিত
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিখোঁজের ৮ ঘণ্টা পর উদ্ধার হওয়া ছাত্রীর শারিরীক অবস্থা সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ‘ভ্যাজাইনাল সোয়াব’ সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন ডাক্তার। এ ঘটনায় শুক্রবার ভিকটিম ছাত্রীর মায়ের দায়ের করা মামলায় ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ের পিয়নকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবদুল মন্নান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্যই আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি সন্দেহজনক মনে হলে ভ্যাজাইনাল সোয়াব সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি। যদি সেখানে স্পার্মের উপস্থিতি পাওয়া যায়, তবেই আমরা বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারব।’
প্রাথমিক আলামত পাওয়ার বিষয়ে তিনি আরও জানান, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা বিষয়টিকে কেবল ‘সন্দেহজনক’ হিসেবেই দেখছি। ল্যাব পরীক্ষার ফলাফল হাতে এলে তবেই এটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে যে আসলে কী ঘটেছিল।’
পরীক্ষার ফলাফলের সময়সীমা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রিপোর্ট আসতে কিছুটা সময় লাগবে।’
এদিকে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ছাত্রীর সাথে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ খাইরুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা স্কুল কর্তৃপক্ষ, এলাকাবাসী এবং ভিকটিমের পরিবারসহ বিদ্যালয়ের সভাপতি ব্যারিস্টার সাহেবের বাড়িতে একটি বৈঠকে বসেছি। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছি এবং এর একটি সুষ্ঠু সমাধান চাচ্ছি।’
চিকিৎসকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধর্ষণের আলামত পাওয়ার তথ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মেডিকেল রিপোর্ট এখনো আমাদের হাতে আসেনি। যতক্ষণ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক রিপোর্ট না পাচ্ছি, ততক্ষণ প্রধান শিক্ষক হিসেবে আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারি না। ডাক্তারের কাছে কী আলামত পাওয়া গেছে বা তারা কী বলেছেন, তা রিপোর্টের মাধ্যমেই চূড়ান্ত হবে।’
বিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, ‘ফুটেজে দুপুর ১টা ৭ মিনিটে মেয়েটিকে দোতলার একটি রুমে ঢুকতে এবং ১টা ৮ মিনিটে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা গেছে। এরপর তাকে আর ক্যামেরায় পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তিনতলার ওপরের ছাদ থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। তিনতলায় মূলত কোনো ক্লাস হয় না, সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকে। সেখানে সাধারণত কেউ যায় না। মেয়েটির ব্যাগ ও স্যান্ডেল যেখানে পাওয়া গেছে, সেই জায়গাটি সিঁড়ির পাশের একটি অংশ ছিল।’
আরও পড়ুন: ৮ ঘণ্টা নিখোঁজ ছাত্রী, খোঁজ মিলল স্কুলের তৃতীয় তলার তালাবদ্ধ কক্ষে
প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা এবং নিরাপত্তার ঘাটতি প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের কোনো অবহেলা বা দুর্বলতা ছিল কি না, তা প্রশাসন খতিয়ে দেখবে। বিশেষ করে স্কুলের কর্মচারীদের দায়িত্বে যদি কোনো অবহেলা থেকে থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল আজিজ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘স্কুলছাত্রীর ওপর নির্যাতনের ঘটনার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে মিরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল আজিজ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এই ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভিকটিমের মা বাদী হয়ে স্কুলের পিয়নের বিরুদ্ধে এই মামলাটি করেছেন। নির্যাতিতা ছাত্রী বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আমাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের তিনতলার সিঁড়ির কাছে গেটের দ্বিতীয় তলার ছোট ছাদটিতে কোনো তালা ছিল না, সেখানেই সেই ছাত্রী ছিল।’
মামলা হওয়ার পর প্রধান শিক্ষকের সামাজিক বৈঠকের উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক সামাজিকভাবে বসার কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি না, তা আমাদের জানা নেই। তবে যেহেতু বিষয়টি এখন আইনি প্রক্রিয়ায় চলে এসেছে এবং মামলা হয়ে গেছে, তাই এখন আর সামাজিক বৈঠকের কোনো সুযোগ নেই। মামলার আগে এমন কিছু করলে সেটি ভিন্ন বিষয় ছিল, কিন্তু এখন এটি সম্পূর্ণ আইনি বিষয়।’
এ ঘটনার প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আরাফাত আমান আজিজ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস-কে বলেন, ‘আমি গতকাল দুপুরে বিষয়টি সম্পর্কে প্রথম অবহিত হয়েছি। ধর্ষণের আলামত পাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে চূড়ান্ত মেডিকেল রিপোর্ট এখনো হাতে আসেনি। চিকিৎসকরা বিভিন্ন পরীক্ষা দিয়েছেন, রিপোর্ট পাওয়া গেলে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে পুরো ঘটনাটি আমি শুরু থেকেই পর্যবেক্ষণ করছি।’
প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। আমাদের ওসি সাহেব নিজেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা আছে কি না তা খতিয়ে দেখছেন। তবে বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরও এমন একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা কীভাবে ঘটলো এবং সেখানে কর্তৃপক্ষের কী ভূমিকা ছিল, তা জানতে আমরা আজই প্রধান শিক্ষককে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) প্রদান করব। তাদের কোনো অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না, তা এই নোটিশের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হবে।’
প্রধান শিক্ষকের সামাজিক মীমাংসার উদ্যোগ প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, ‘বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কোনো সামাজিক মীমাংসার চেষ্টা করছেন কি না, তা আমার জানা নেই। তবে এ ধরনের স্পর্শকাতর ঘটনায় সামাজিকভাবে মীমাংসা করার কোনো সুযোগ নেই। এটি সম্পূর্ণ আইনি বিষয় এবং আমরা আইনের মাধ্যমেই বিষয়টি সমাধান করব। যদি কোনো অপরাধ ঘটে থাকে, তবে অপরাধীকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনা হবে। আমি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।’
এর আগে, বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকাল ৯টায় স্কুলে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর রাত ৮টার দিকে বিদ্যালয়ের তিন তলার একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করা হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সকালে বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে স্কুলে যায় ওই ছাত্রী। অনুষ্ঠান শেষ হলেও সে বাড়িতে না ফেরায় স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কোথাও না পেয়ে রাত ৮টার দিকে তারা বিদ্যালয়ের পিয়ন হামিদুলের কাছে চাবি চাইলে তিনি চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং বিদ্যালয়ে কেউ নেই বলে দাবি করেন। এ সময় ছাত্রীর মামা মো. নাজিমের সঙ্গে পিয়ানের বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে চাবি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে বিদ্যালয়ের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে মেয়েটিকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন গ্রামবাসী।
নিখোঁজ ছাত্রীর মামা মো. নাজিম ঘটনাটি সম্পর্কে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আহত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ছাত্রী আমার বড় বোনের মেয়ে। ঘটনার দিন মেয়েটি স্কুলে গেলেও পরে আর বাড়িতে ফিরে আসেনি। বিষয়টি জানতে পেরে পরিবারের সদস্যরা আত্মীয়স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পায়নি।
পরবর্তীতে আমরা বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, বিদ্যালয়ের চাবি দপ্তরী হামিদুল ইসলামের কাছে থাকে। এরপর আমি নিজে দপ্তরীর কাছে গিয়ে চাবি চাইলে দপ্তরী চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় দপ্তরির সাথে বাকবিতণ্ডা হয় এবং দপ্তরি আমাকে ধাক্কাধাক্কি করে বলেন, ‘তুমি কি আমার বাড়িতে মদ খেয়ে ঢুকেছো? পরবর্তীতে স্কুল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কক্ষ খোলা হলে দেখা যায়, মেয়েটি স্কুলের ভেতরেই ছিল এবং সেখান থেকেই তাকে উদ্ধার করা হয়।
মেয়েটির মুখ বাঁধা ছিল কিনা এ বিষয়ে তিনি বলেন, উদ্ধারের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না, তাই এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারি না। তবে যারা মেয়েটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে, তাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তখন মেয়েটি অচেতন অবস্থায় ছিল এবং কথা বলতে পারছিল না। বর্তমানে সে চিকিৎসাধীন রয়েছে।