বইভর্তি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে একদল শিশু
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতেই বেসরকারি নামিদামি স্কুলগুলো সরকার এবং আদালতের আদেশের পরও শিক্ষার্থীদের বইয়ের সংখ্যা কমাচ্ছে না। এ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মনে করেন, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে যদি বাড়তি কিছু না থাকে তাহলে অভিভাবকরা তাদের প্রতিষ্ঠানে সন্তান ভর্তি করাবেন না। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতেই বইয়ের বোঝা কমছে না কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পিঠ থেকে।
রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর নামকরা স্কুলগুলোর বেশিরভাগই বেসরকারি। এ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো পড়াশোনা হয় বলে খ্যাতি আছে। তবে এর মূলে রয়েছে শিক্ষার্থীদের বাড়তি বই পড়ানোর বিষয়টি। এ স্কুলগুলোর পক্ষ থেকে অভিভাবকদের ধারণা দেয়া হয়, সরকারি বিদ্যালয়গুলো যে বই পড়ায় তা পর্যাপ্ত নয়। বর্তমান সময়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাড়তি বই পড়া প্রয়োজন। এ টোপে পড়েই বিত্তশালী অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এ সব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করান।
তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশের নামকরা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই গ্রাম থেকে উঠে আসে। এবং তাদের প্রায় সবাই সরকারের বেঁধে দেয়া সিলেবাস অনুসরণ করেই পড়াশোনা করে থাকে। যদি সরকারি সিলেবাস প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য পর্যাপ্ত না হতো তাহলে এ সব বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একচেটিয়াভাবে চান্স পেত।
কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, দেশ-বিদেশের নামকরা সব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অধিকাংশই সরকারিভাবে নির্ধারিত সিলেবাসে পড়াশোনা করে আসছেন। অন্যদিকে বেসরকারি বিদ্যালয়ে সরকারি সিলেবাসের কয়েকগুণ বেশি বই পড়া শিক্ষার্থীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়। এ অবস্থায় বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর বাড়তি এ পড়াশোনার আয়োজনকে নেহাতই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষাবিদরা আরও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, সরকারি সিলেবাস বা বইয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয় শিশুর বয়স, অবস্থানসহ সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে। বয়সের চেয়ে বেশি প্রেসার দিলে তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিতে বিপরীত হয় বলেও সতর্ক করছেন তারা। এরই ফল হিসেবে অল্প বয়সে এত বেশি বই পড়েও শিক্ষার উচ্চস্তরে বা কর্মজীবনে গিয়ে প্রতিযোগিতায় এ শিক্ষার্থীরা টিকতে পারছে না বলে মনে করেন তারা।
বর্তমান সরকার প্রধান শেখ হাসিনা একাধিকবার বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি বইয়ের বোঝা না চাপাতে আহ্বান করেছেন। আদালতও এ বিষয়ে আদেশ প্রদান করেছেন। তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ সব বিদ্যালয়ের ওপর নিজেদের সীমিত নিয়ন্ত্রণের কথা স্বীকার করেছেন। তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, মন্ত্রণালয় যেহেতু এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার বৈধ এখতিয়ার রাখে সেহেতু ব্যবস্থা গ্রহণ না করাটা হতাশার। এ ছাড়া যেখানে খোদ আদালতের আদেশ এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে সেখানে ব্যবস্থা না নিয়ে দায় স্বীকার কোনো সমাধান হতে পারে না।
এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম-আল-হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রকাশিত বইয়ের আকার ও ওজন খুবই কম। সরকারি কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এনসিটিবি প্রকাশিত বইয়ের অতিরিক্ত পড়ানো হয় না। এর সঙ্গে খাতা থাকে। সব মিলিয়ে প্রথম শ্রেণির বইয়ের ওজন হয়তো এক কেজিও হবে না। তবে এটা ঠিক, কিছু কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি স্কুল অযাচিত বই পাঠ্যভুক্ত করে। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ওই সব প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ মানে না।’
রাজধানীর কয়েকটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের নার্সারি ও কেজি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বই ঘেঁটে দেখা যায়, এ সব শ্রেণিতে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫টি পর্যন্ত বই রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি বইয়ের জন্য একটি করে খাতা, টিফিন, পানির পট মিলে চার থেকে পাঁচ বছরের একটি শিশুর ব্যাগের ওজন পাঁচ থেকে আট কেজি পর্যন্ত। অথচ প্রথম শ্রেণিতে সরকারিভাবে রয়েছে মাত্র তিনটি বই। যেখানে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম শ্রেণির আগেই প্রায় তিন ডজন বই শেষ করতে হচ্ছে শিশুদের।
রাজধানীর এজি চার্চ স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, অভিভাবকরা তাদের ছোট্ট শিশুদের ক্লাসে নিয়ে এসেছেন। এমনই একজন শিশু শিক্ষার্থী আয়ান রহমান। তার বয়স পাঁচ বছর। পড়ে কেজি ওয়ানে। তার কাছে জানতে চাইলে এ শিশু প্রতিবেদককে জানায়, তার মোট ১২টি বই আছে। প্রতিদিনই এ সব বইয়ের পড়া দেয়া হয়। সঙ্গে রয়েছে বিপুলসংখ্যক খাতা, টিফিন বাটি এবং পানির পট। আয়ানের পিঠে থাকা ব্যাগটি হাতে নিয়ে দেখা যায় এর ওজন প্রায় পাঁচ কেজি হবে।
আয়ানের মা শিমু নাহার প্রতিবেদককে বলেন, ‘এটি অনেক নাম করা বিদ্যালয়। এ কারণেই এখানে ভর্তি করেছি। এখানকার শিক্ষকরা জানিয়েছেন, সরকারি বইয়ের বাইরেও অনেক বই তারা পড়িয়ে থাকেন। এর ফলে এখান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি জ্ঞান অর্জন করে। যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করে।’
বিদ্যালয়টির কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও তারা সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলবেন না বলে জানান। তবে একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যে শিক্ষার্থী ক্লাস ওয়ানে মাত্র দুই থেকে তিনটি বই পড়ে আর যে শিক্ষার্থী এত বই পড়ে তাদের মধ্যে তো একটি পার্থক্য থাকেই। তবে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন কম চান্স পায় সেটি আমি বলতে পারব না। আমি নিজে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়েছি। ফলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রামের সাধারণ স্কুল থেকে কতজন আর শহরের নাম করা স্কুল থেকে কতজন পড়ে সেটি আমার জানা নেই।’
এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অনেক পিতা-মাতা হয়তো মনে করতে পারেন ছোট শিক্ষার্থীরা বেশি পড়লে তাদের জ্ঞান বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অতিরিক্ত চাপ দিলে বরং এর উল্টোটিই হয়ে থাকে। দেশের নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ শিক্ষার্থীই সরকারের বেঁধে দেয়া সিলেবাসে পড়াশোনা করে আসে। কিন্তু যারা অনেক টাকা খরচা করে নামকরা স্কুলে বেশি বেশি বই পড়ে তাদের মধ্যে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার প্রবণতা কম। কর্মক্ষেত্রের চিত্রও একই রকম। ফলে তুলনামূলক বিচার করলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারের বেঁধে দেয়া সিলেবাসই যথেষ্ট। শিক্ষার পাশাপাশি এ বয়সের শিশুদের খেলাধুলা, বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে মেলামেশাটিও গুরুত্বপূর্ণ। না হলে তাদের সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বইয়ের ভেতরেই একমাত্র জ্ঞান আছে এ ধারণা থেকেই অভিভাবকরা এমনটি ভেবে থাকেন। কিন্তু বইয়ের চেয়ে পারিপার্শ্বিক পরিবেশেই জ্ঞান বেশি থাকে। সেটি থেকে সন্তানকে বঞ্চিত করলে পরে তারা বাস্তব জীবনের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।’