নাজমুল হোসাইন © টিডিসি ফটো
প্রত্যেক মানুষেরই একটি স্বপ্ন থাকে, সেই স্বপ্ন নিয়েই সে বাঁচতে শেখে। এমন একটি স্বপ্ন ছিলো এক গ্রামের সাধারণ একটি ছেলের। তিনি আর কেউ নন নাজমুল হোসাইন, গ্রাম: রাজরাজেশ্বর, উপজেলা: চাঁদপুর সদর, জেলা: চাঁদপুর। বর্তমানে তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের একজন শিক্ষার্থী।
নাজমুল হোসাইনের দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের প্রতিনিধির সাথে আলাপচারিতায় জানান তার এই সাফল্যের গল্প। নাজমুল ছোটবেলা গ্রামে বেড়ে ওঠা ছিলো তার জন্য কষ্টকর, কারণ তার সমাজে শিক্ষার আলো ছিলো খুবই ক্ষীণ। সবাই কৃষিকাজ, জমি, মাছ ধরা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। নাজমুল এর ব্যতিক্রম ছিল না।
নাজমুল বলেন, আমার বয়স যখন ৮, তখন মনে হলো কিছু শেখা দরকার। গ্রামের একটি আলিয়া মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেনীতে ভর্তি হই। কিন্তু শিক্ষা-ব্যবস্থা ছিলো খুবই দুর্বল। ছয়টি বছর পার হয়ে গেলো, কিন্তু তেমন কিছু শিখতে পারিনি। এর মধ্যে দেখতাম, গ্রামের অনেক ছেলেই শহরে পড়াশোনার জন্য যাচ্ছে। আমিও আগ্রহী হয়ে উঠি।
একজন শিক্ষককে বলি ‘স্যার, আমি কি তাদের মতো পড়তে পারবো?’ তিনি দিকনির্দেশনা দিলেন। সেই থেকেই মনে এক ধরনের অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করতে শুরু করল। বাসায় ফিরে মাকে বললাম, ‘আমি পড়াশোনা করবো, কাজ করতে পারবো না।’ মা বললেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিলো, তোকে কুরআনের হাফেজ বানাবো।‘ এরপর থেকে আগ্রহ আরও বেড়ে গেলো।
এক অনুষ্ঠানে বড় ভাইকে বললাম, ‘আমি হাফেজ হতে চাই।’ কিন্তু গ্রামে কোনো হিফজের ব্যবস্থা ছিলো না। কয়েক বছর এভাবেই কেটে যায়।
শেষমেশ আমি ক্লাস ৮-এ পড়াকালীন, কোনো এক কারণে পুরো পরিবার শহরে চলে আসে। শহরে অনেক বাধা পেরিয়ে স্থানীয় এক মাদ্রাসায় ভর্তি হই। তখন আমি আরবি কিছুই জানতাম না আলিফ, বা এসব উচ্চারণও ঠিকমতো পারতাম না। তখন বয়স মাত্র ১৬ বছর। তবুও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে শুরু করলাম, এবং আলহামদুলিল্লাহ মাত্র ১১ মাসে কুরআন হিফজ সম্পন্ন করি।
এরপর ঢাকায় একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হই, যেখানে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি আরবি ভাষা ও বাংলা সাহিত্যও শিখি। এর মাঝে আলিয়া মাদ্রাসায় দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি, যা ছিল করোনাকালীন সময়ে। পরবর্তীতে স্বপ্ন বড় হয় নামকরা মাদ্রাসায় পড়ার।
দারুন্নাজাত ছিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম (ইন্টারমিডিয়েট) পর্যায়ে ভর্তি হই এবং A+ পেয়ে উত্তীর্ণ হই। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা শুনতাম, কিন্তু জানতাম না সেটা আসলে কী। পরে গবেষণা করে বুঝি, এবং জানতে পারি বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগের কথা যা আমার শৈশবের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের হোটেলে আখতারের ওপর ফের হামলার চেষ্টা আ.লীগ নেতাকর্মীদের
ইন্টারমিডিয়েট শেষ করেই বিভিন্ন সমস্যার কারণে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন তখন বাস্তবায়ন হয়নি। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল বড় বাধা। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি আবারও পথ খুঁজে পাই। সিদ্ধান্ত নেই সময় নষ্ট না করে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিই।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৮২তম এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯০তম স্থান অর্জন করি। এ সময় আমি বিদেশ যাওয়ার জন্যও এক বছরের প্রস্তুতি নিই। এরপর হঠাৎ অনলাইনে মিশরের কায়রো শহর থেকে পরিচালিত আধুনিক আরবি ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মারকাযুস সওতুল ইসলাম এর একটি কোর্স দেখি। যোগাযোগ করি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ড. শিহাব উদ্দিন আল-আজহারীর সঙ্গে। তাঁর মাধ্যমেই আমি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করি।
পরে সিদ্ধান্ত নিই, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হবো। এখানেই নিয়মিত ক্লাস করি এবং বিদেশে পড়ার জন্য আবেদন চালিয়ে যাই। বিভিন্ন দেশের স্কলারশিপের জন্য আবেদন করি যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, আমেরিকা, এমনকি অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজেও।
একটি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটারও পাই, কিন্তু খরচের কারণে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর ইরাকসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আল্লাহর অশেষ রহমতে ইরাকের ‘কিরকুক ইউনিভার্সিটি’ থেকে পূর্ণ স্কলারশিপে মনোনীত হই এবং ভর্তি নিশ্চিত হয়।
এই পথচলায় শিখেছি ধৈর্য, কষ্ট, আর হাল না ছাড়া মানুষই সফল হয়। আল্লাহ তায়ালার প্রতিশ্রুতিও তাই। এই পর্যন্ত আসতে অনেক প্রতিকূলতা ও মানুষের কথা সহ্য করতে হয়েছে। তবে শেষমেশ আল্লাহ তায়ালা সফলতা দিয়েছেন।
আমার এই পথচলায় যাঁরা পাশে ছিলেন, সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে আমার মা, যিনি সবসময় সাহস জুগিয়েছেন। আমার বড় ভাই ও মেঝো ভাইয়ের অবদানও অনেক। সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা জানাই ড. শিহাবউদ্দিন আল-আজহারীকে, যিনি সব সময় পরামর্শ ও সহায়তা দিয়েছেন।