ইরানের ওপর ট্রাম্পের হামলা: তার পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় জুয়া

০১ মার্চ ২০২৬, ০৩:৫২ AM
ডোনাল্ড ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প © সংগৃহীত

ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলার মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সামরিক শক্তির নগ্ন প্রদর্শনী করার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত বেছে নিয়েছেন। তবে এর মাধ্যমে তিনি তার প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনৈতিক ঝুঁকিটিও নিলেন, যা চরম বিপদ এবং অনিশ্চয়তায় ঘেরা।

গত শনিবার ট্রাম্প ইসরায়েলের সাথে একাত্ম হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের পর এটিই হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান, অথচ আমেরিকান জনগণের কাছে এর কারণ সম্পর্কে তিনি খুব সামান্যই ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

কৌশলগত পরিবর্তন ও আঞ্চলিক ঝুঁকির আশঙ্কা

গত মাসে ভেনেজুয়েলায় চালানো ঝটিকা অভিযানের মতো সীমিত গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে ট্রাম্প এখন এক দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের দিকে পা বাড়িয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ভয়াবহ দাবানল সৃষ্টি করতে পারে, যা তেলসমৃদ্ধ এই অঞ্চলকে বিপর্যস্ত করে তুলবে।

যে প্রেসিডেন্ট "বোকামিপূর্ণ যুদ্ধ" (stupid wars) এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তিনিই এখন তেহরানে 'ক্ষমতা পরিবর্তনের' (regime change) মতো কঠিন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। তার ধারণা, বিমান হামলার মাধ্যমেই ইরানি জনগণকে তাদের শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উসকে দেওয়া সম্ভব। তবে বিশ্লেষকরা সন্দেহ প্রকাশ করে বলছেন যে, স্থলসেনার সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া কেবল আকাশপথের শক্তি ব্যবহার করে কোনো দেশে সরকার পরিবর্তন করার নজির ইতিহাসে নেই।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বনাম যুদ্ধংদেহী মনোভাব

সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা এবং ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শাপিরো বলেন, "শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে অধিকাংশ আমেরিকানই অবাক হয়ে ভাববেন—কেন আমরা ইরানের সাথে যুদ্ধে জড়ালাম, আমাদের লক্ষ্য কী, আর কেনই বা মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের ঘাঁটিগুলো হামলার শিকার হচ্ছে?"

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১৩ মাসে দেখা যাচ্ছে যে, তার অভ্যন্তরীণ এজেন্ডা বা জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো সাধারণ মানুষের প্রধান সমস্যাগুলোকে ছাপিয়ে ইরান ইস্যু এবং সামরিক শক্তির ব্যবহারই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এমনকি তার নিজের উপদেষ্টারাও তাকে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক দিকে নজর দিতে অনুরোধ করছেন, কারণ সেখানে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের আশঙ্কা রয়েছে।

'অপারেশন এপিক ফিউরি' ও কূটনীতির অবসান
নিজের 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করা এক ভিডিওতে ট্রাম্প এই অভিযানের নাম দিয়েছেন “অপারেশন এপিক ফিউরি”। তিনি দাবি করেছেন, তেহরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল হুমকি বন্ধ করতে এবং ইরানি জনগণকে তাদের শাসকদের উৎখাত করার সুযোগ দিতেই এই যুদ্ধ। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়।

ট্রাম্পের এই আকস্মিক সামরিক পদক্ষেপ ইরানের সাথে কূটনীতির দরজা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় পরমাণু সংক্রান্ত আলোচনা কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হয়েছে। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেছিলেন যে, বোমাবর্ষণ করে ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করা যাবে, কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। ইরান শনিবার পাল্টা জবাবে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল পথ 'হরমুজ প্রণালী' বন্ধের হুমকি দিয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক ঝুঁকি
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের আগে জর্জ ডব্লিউ বুশ যেমন ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করেছিলেন, ট্রাম্পের বক্তব্যেও তেমন সুর পাওয়া যাচ্ছে। গত মঙ্গলবারের স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন যে, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে যা যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত করতে সক্ষম—যা মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো সমর্থন করে না।

ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের নেশা তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকেই বাড়ছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরার অভিযান সফল হওয়ার পর তিনি আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরান ভেনেজুয়েলার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং সুসজ্জিত শত্রু।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর নিকোল গ্রাজেউস্কি বলেন, "ইরান অনেক বেশি শক্তিশালী সামরিক শক্তি। তারা এখন এমন সব সীমা অতিক্রম করতে প্রস্তুত যা আগে তারা কখনোই করেনি।"

তবে ফাউণ্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিসের সিইও মার্ক ডুবোভিটস মনে করেন, ইরান বর্তমানে এতটাই দুর্বল অবস্থায় আছে যে ট্রাম্পের এই ঝুঁকি নেওয়াটা সার্থক। তার মতে, সরকার পরিবর্তন হোক বা না হোক, ইরানের পরমাণু এবং ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে পারলেই ট্রাম্পের জন্য এটি বড় জয় হবে।

সংবাদসূত্রঃ রয়র্টাস 

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি: ইরানের প্রতিরোধ শক্তির রূপকার
  • ০১ মার্চ ২০২৬
ট্রাম্পের ঘোষণা: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত
  • ০১ মার্চ ২০২৬
ইরানের ওপর ট্রাম্পের হামলা: তার পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় জু…
  • ০১ মার্চ ২০২৬
খামেনিকে হত্যার দাবি ইসরায়েলের, ইরানের দাবি জীবিত আছেন; দৃঢ়…
  • ০১ মার্চ ২০২৬
চরফ্যাশনে দায়িত্বরত অবস্থায় পুলিশ কর্মকর্তার আকস্মিক মৃত্যু
  • ০১ মার্চ ২০২৬
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ‘বেঁচে নেই': নেত…
  • ০১ মার্চ ২০২৬