প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সহজ, আধুনিক ও গতিশীল করতে দেশটির ওয়ার্ক পারমিট (কাজের অনুমতি) ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার এনেছে মানবসম্পদ ও আমিরাতীকরণ মন্ত্রণালয়। নতুন এই উদ্যোগের আওতায় আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা দূর এবং ডিজিটাল সেবার পরিধি ব্যাপক হারে বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে নিয়োগকর্তা ও কর্মী—উভয় পক্ষই অত্যন্ত দ্রুত এবং স্বল্প খরচে সেবা নিতে পারবেন।
সোমবার (৮ জুন) জারি করা এক পরিপত্রে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, এই সংস্কার কার্যক্রমকে আরও ফলপ্রসূ ও গ্রাহকবান্ধব করতে আগামী ৩০ জুলাই পর্যন্ত একটি অনলাইন জনপরামর্শ কর্মসূচি (Public Consultation) চালু রাখা হয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশটির সাধারণ নাগরিক, নিয়োগকর্তা ও সেবাগ্রহীতারা বিদ্যমান ওয়ার্ক পারমিট ব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁদের মূল্যবান মতামত ও গঠনমূলক প্রস্তাব দিতে পারবেন। বিশেষ করে পারমিট অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও সহজ করা এবং অপ্রয়োজনীয় শর্তাবলী কমানোর বিষয়ে এই মতামত নেওয়া হবে।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই যুগান্তকারী উদ্যোগটি মূলত আমিরাত সরকারের ‘জিরো গভর্নমেন্ট ব্যুরোক্রেসি’ (আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত প্রশাসন) কর্মসূচির একটি অন্যতম অংশ। নতুন এই সংস্কারের ফলে এখন থেকে আবেদন করার ক্ষেত্রে সহায়ক নথি (Supporting Documents) জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। এমনকি কিছু নির্দিষ্ট পারমিটের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের পরিমাণ ৭৫ থেকে সর্বোচ্চ ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা হয়েছে। পাশাপাশি আবেদন নিষ্পত্তির সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একটি সমন্বিত ও একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এখন ঘরে বসেই অধিকাংশ সেবা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন ব্যবস্থা চালুর ফলে দেশটিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হবে এবং বিশ্ব শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি যুক্ত করতে তা বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে আসা প্রবাসী কর্মীদের জন্যও ওয়ার্ক পারমিট সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের জটিলতা ও ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আমিরাতের বর্তমান শ্রম আইনের নির্বাহী বিধিমালা অনুযায়ী বর্তমানে দেশি-বিদেশি কর্মীদের জন্য মোট ১৩ ধরনের ওয়ার্ক পারমিটের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের পারমিট, যার মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাইরে অবস্থানরত যেকোনো দেশের নাগরিককে সরাসরি নতুন কর্মসংস্থানে নিয়োগ দেওয়া যাবে। ট্রান্সফার ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে আমিরাতে ইতিমধ্যেই অবস্থানরত কোনো কর্মী বর্তমান নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি স্থানান্তরের সুযোগ পাবেন। আবার পরিবারের কোনো সদস্যের স্পন্সরশিপ বা ভিসায় আমিরাতে বসবাসরত বাসিন্দারাও বিশেষ পারমিটের মাধ্যমে বৈধভাবে চাকরিতে যুক্ত হতে পারবেন।
নির্দিষ্ট মেয়াদের কোনো প্রকল্পভিত্তিক বা চুক্তিভিত্তিক কাজের জন্য সাময়িক ওয়ার্ক পারমিট ও ওয়ান-মিশন ওয়ার্ক পারমিটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পার্ট-টাইম ওয়ার্ক পারমিটের আওতায় একজন কর্মী মূল চাকরির পাশাপাশি এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন ভিত্তিতে কাজ করার আইনি সুযোগ পাবেন। এছাড়া ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী তরুণদের নিয়মতান্ত্রিক কর্মসংস্থানের জন্য অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওয়ার্ক পারমিট এবং পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী কাজের প্রশিক্ষণ ও পার্ট-টাইম কর্মসংস্থানের জন্য শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান পারমিট দেওয়া হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং জিসিসি (GCC) ভুক্ত অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জন্য বিশেষ নাগরিক পারমিট এবং দেশটির মর্যাদাপূর্ণ গোল্ডেন ভিসাধারীদের জন্য পৃথক কাজের অনুমতিপত্র বা গোল্ডেন ভিসাধারীদের ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে। স্থানীয় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য ন্যাশনাল ট্রেইনি পারমিট এবং কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অধীনে বা নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা ছাড়া যারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে ইচ্ছুক, তাঁদের জন্য রয়েছে ফ্রিল্যান্স পারমিট। এর বাইরে গৃহকর্মী, ন্যানি, ব্যক্তিগত গাড়িচালকসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি পেশায় নিয়োজিতদের জন্য ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স ওয়ার্ক পারমিট ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। দেশটির মানবসম্পদ ও আমিরাতীকরণ মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে যে, এই ব্যাপক সংস্কারের ফলে আমিরাতের বেসরকারি খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং একটি আধুনিক, বৈশ্বিক ও প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজার গড়ে উঠবে।